পাটের মণপ্রতি সর্বনিম্ন মূল্য ৩,০০০/- নির্ধারণ ও বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলগুলো চালু ও আধুনিকায়নের দাবিতে স্মারকলিপি

0
305

বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির প থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন, বর্তমান করোনা ভাইরাস মহামারীজনিত পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। আক্রান্ত, মৃত্যু, চিকিৎসাহীনতা, কর্মহীনতাসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্মে নেতিবাচক ছাপ পড়েছে। ভয়াবহ এই সঙ্কটের কারণে আগামীতে ুধা, দারিদ্রতা এমনকি দূর্ভিাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রায় সকল ব্যক্তিমালিকানাধীন ও প্রাইভেট সেক্টরে শ্রমিক ছাঁটাই, শ্রমিকের অর্জিত অধিকার কর্তন চলছে। মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত, ছোট ব্যবসায়ীসহ প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে দিশেহারা। আর প্রবাসে প্রায় ১ কোটি শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়েছে। অর্ধকোটিরও বেশি শ্রমিককে দেশে ফিরতে বাধ্য হতে হচ্ছে বলে পত্রিকান্তে জানা যাচ্ছে। ভূমিহীন-গরীব কৃষকের সাথে উক্ত কর্মহীনরা যুক্ত হয়ে গ্রামাঞ্চলে কর্মহীন মানুষের তালিকা বৃদ্ধি করছে। সামগ্রিক য়তি অপরিসীম। এই পরিস্থিতিতে আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে কৃষক, কৃষি ও কৃষি নির্ভর শিল্পসহ ব্যবসা-বাণিজ্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় আমাদের দাবিকে আমলে না নিয়ে যখন মাঠভরা পাট, বিশ্বব্যাপি পাটের সুদিন সে সময় সরকার রাষ্টায়ত্ব পাটকলগুলি বন্ধ করা হয়েছে। যার ফলে চলতি মৌসুমে কৃষক পাটের ন্যায্যমূল্য পায়নি। রাষ্ট্রীয়ভাবেও পাটের মূল্য এবার নির্ধারণ করা হয়নি। কাঁচাপাট ব্যবসায়ি ও পাটকল মালিকদের পাটের মূল্য নির্ধারণে কারসাজির বিষয়টিও প্রকাশ্যে এসেছে। এমনিতেই করোনা মহামারী, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান, বন্যা, পাটবীজসহ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকের যেমন ব্যাপক য়-তি হয়েছে তেমনি উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। সঙ্গত কারণে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে কৃষক তার দায়-দেনা পরিশোধ করতে পারেনি। এমনকি ভর্তুকির ঋণের টাকাও কৃষকের হাতে পৌঁছেনি। সে কারণে সরকারী-বেসরকারী খাত থেকে কৃষকের নেওয়া প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণ কৃষক পরিশোধ করতে পারেনি। বাংলাদেশে ২০১৭ সালে প্রণীত জুট অ্যাক্ট এবং পরে প্রস্তুতকৃত পাট নীতিতে পাটের সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণের নীতিমালা অনুযায়ি পাটের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করলে ও রাষ্ট্রায়াত্ব পাটকলগুলি চালু থাকলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকতো। আপনি জানেন, পাটশিল্পের সাথে শ্রমিকদের পাশাপশি কৃষকের জীবিকা সরাসরি জড়িত। পাটজাতপণ্যের সম্ভাবনা দেশে-বিদেশে বাড়ছে। পাট এমন একটি পণ্য যার কোনো কিছুই ফেলনা নয়। পাটের পাতা, আঁশ, পাটখড়ি সবই কাজে লাগে। যে জমিতে পাট চাষ করা হয় তার উর্বরতা বৃদ্ধিসহ পরিবেশ রায় পাটের অবদান কম নয়। জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারে ২৩৫ ধরনের পাটপণ্যের এক প্রদর্শনী হয়েছিল। পাটকাঠি দিয়ে চারকোল উৎপাদন করলে তা জ্বালানি সমস্যা সমাধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চাল, গম, আটা, চিনিসহ ১৮টি পণ্যের মোড়ক ব্যবহারে পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার আদেশ জারি হয়েছিল। ম্যানডেটরি প্যাকেজিং অ্যাক্ট ২০১০ বাস্তবায়ন হলে দেশের বাজারে পাটের বিপুল চাহিদার সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি করোনা পরবর্তী পরিবেশ সচেতনতার কারণে পাটের সম্ভাবনা বিশ্বব্যাপীই বাড়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হচ্ছে পাটের নতুন বাজার। গাড়ি ও বিমানের আভ্যন্তরিণ সাজ-সজ্জা এবং সৌন্দর্য বর্ধনে পাট দ্বারা তৈরি পণ্যের ব্যবহার হচ্ছে। বিএমডাব্লিউ, ভক্সওয়াগন, টয়োটা, নিশান গাড়ির বহু যন্ত্রাংশ তৈরিতেও পাটের ব্যবহার বাড়ছে। ইউরোপের ২৮টি দেশে একযোগে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেখানে পাট হতে পারে সবচেয়ে ভালো প্রাকৃতিক বিকল্প। এক হিসেবে দেখা যায়, সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৫০০ বিলিয়ন পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা আছে। এর ২/৩ শতাংশও যদি পাট দ্বারা পূরণ করা যায় তাহলেও পাট খাতের চেহারা পালটে যাবে। সুতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বাংলাদেশে ভিসকস ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ১২০০ কোটি টাকার ভিসকস আমদানি করা হয় চীন থেকে। দেশের ৫০/৬০টি স্পিনিং মিলে ভিসকস ব্যবহৃত হয়। এই ভিসকস তৈরি করা সম্ভব পাটের আঁশ থেকে। দেশে পাট চাষের জমির পরিমাণ ১৪ লাখ ৭৫ হাজার একর। পাট উৎপাদন ১৫ লাখ ৬০ হাজার টন যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ১১ লাখ টনেরও বেশি। কাঁচা পাট গড়ে প্রতি বছর রপ্তানি হয় ২.৫ লাখ টন যার মূল্য প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা। পাটপণ্যের গড় উৎপাদন ১০ লাখ ৫০ হাজার টন যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ১ লাখ ৫০ হাজার টনের মতো। আর বাকি প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার টন পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি হয় যার মূল্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। একটা সাধারণ হিসাবে দেখা যায়, পাটজাত দ্রব্যের রপ্তানি প্রতি বছরই বাড়ছে। ৪৪ বছরে লোকসান হয়েছে ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণ মাফ করা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। কিন্তু কৃষিখাতের লোকসানকে বড় করে দেখানো হচ্ছে। অথচ এখানে এর সাথে জাতীয় স্বার্থ জড়িত। তারপরও কেন লোকসান, কাদের কারণে লোকসান, কী করলে লোকসানকে লাভে পরিণত করা যেত সেসব নিয়ে যত প্রশ্ন এবং প্রস্তাবনা কোনোটিরই উত্তর দেননি কর্তৃপ। একটি হিসাবে দেখানো হয়েছিল ৪০/৫০ বছরের পুরনো যন্ত্রপাতির বদলে আধুনিক মেশিন স্থাপন করলে খরচ হবে ১,২০০ কোটি টাকা সেখানে ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পাটকলগুলি বন্ধ করা হচ্ছে। পাট নিয়ে সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন, দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ, গবেষণাকাজে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, পাট বীজের চাহিদা শতভাগ পূরণ করাসহ প্রয়োজনীয় ভূমিকা গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমাদের ৯০ শতাংশ বীজের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কাটানো দরকার। পাটকলগুলিকে পাট কেনার জন্য সময় মতো টাকা বরাদ্দ করা হয় না। যখন কৃষকের ঘরে পাট থাকে তখন টাকা বরাদ্দ হয় না। যখন মহাজনের ঘরে পাট যায় তখন টাকা বরাদ্দ হয়। কৃষক ন্যায্য দাম পায় না, মিলগুলির খরচ বাড়ে আর লাববান হয় মহাজনেরা। এর দায় কার শ্রমিকের না নীতিনির্ধারকদের? আবার প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ না করায় পাট ক্রয়ের ল্যমাত্রা পূরণ হয় না। গত মৌসুমেও ২২টি পাটকলের জন্য ২২ লাখ কুইন্টাল কাঁচা পাট কেনার ল্যমাত্রা ছিল কিন্তু কেনা হয় ১৫ লাখ ৬৫ হাজার কুইন্টাল পাট। চাহিদার ৭১ শতাংশ পাট কিনেছিল বিজেএমসি। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল না দেওয়ার দায়িত্ব শ্রমিকের নয়। উল্লেখ্য বর্তমান বিশ্বের দেশে দেশে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় কোম্পানী বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান অধিক হারে গড়ে উঠছে। বিশ্বব্যাপি মহামন্দাজনিত পরিস্থিতিতে উক্ত সরকারগুলি রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানকে ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জাতীয় প্রয়োজন মিটাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে তার ন্যূনতম সুযোগ রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করা হয় না। দূর্নীতি-অনিয়ম-লুটপাটসহ নানা কারণে রাষ্টায়ত্ব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে শ্রমিক-কৃষক-জনগণ তিগ্রস্থ হচ্ছে, যার দায় রাষ্ট্র ও সরকারের। সঙ্গত কারণেই রাষ্টায়ত্ব পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দায়িদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিÍ প্রদান পূর্বক পাটকলগুলি আধুনিকায়ন করে শ্রমিক-কৃষক তথা জাতীয় স্বার্থ প্রাধান্য দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here