চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার স্ট্যান্ড রিলিজ স্থগিত, খুশি কৃষকরা

0
377

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি : যশোরের চৌগাছায় সরকার নির্ধারিত মূল্যে ডিলারদের সার বিক্রি করতে কড়াকড়ি আরোপ করার পর সার ডিলারদের ব্যাপক তদবিরর মুখে স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিনের বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়েছে। ১৭ নভেম্বর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে উপ পরিচালক (প্রশাসন) মোঃ ফখরুল হাছান এই আদেশে স্বাক্ষর করেন। আদেশে বলা হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিসিএস (কৃষি) ক্যাডার কর্মকর্তা জনাব কেএম শাহাবুদ্দিন আহমেদ (২৪২৫), উপজেলা কৃষি অফিসার, গাংনী, মেহেরপুর ও ২। জনাব মোঃ রইচ উদ্দিন (২৫৪৯), উপজেলা কৃষি অফিসার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চৌগাছা, যশোরকে অত্র দপ্তরের স্মারক নং-১২.০১.০০০০.০০০.৮১.০০৩.১৯.২৯০/১(২১), তারিখ- ০৯/১১/২০২০ খ্রিঃ মূলে যথাক্রমে উপজেলা কৃষি অফিসার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চৌগাছা, যশোর ও উপজেলা কৃষি অফিসার, দৌলতপুর, কুষ্টিয়া বদলী/পদায়নের আদেশটি অনিবার্য কারণ বসতঃ স্থগিত করা হলো। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। এর আগে গত ৯ নভেম্বর এক আদেশে সার ডিলারদের অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে আলোচিত চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে করা হয়। তার বদলি আদেশ প্রত্যাহার এবং মুনাফাখোর সার ডিলারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে চৌগাছা শহরের ভাস্কর্য মোড়ে মানববন্ধনও করেন কৃষকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে ধারাবাহিক অনিয়মের অভিযোগে ও কৃষি বিভাগের নির্দেশনা না মেনে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রিসহ নানা অভিযোগে উপজেলা ফার্টিলাইজারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও উপজোলা বিএনপির ১নং যুগ্ম-আহবায়ক ও সাবেক সেক্রেটারী ইউনূচ আলী দফাদারের মালিকানাধীন মেসার্স ইউনূচ আলীসহ উপজেলার তিন ডিলারের ডিলারশিপ বাতিলের সুপারিশ করে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি। ওয়ান ইলেভেনের সময়ে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির অভিযোগে উপজেলার এই বিএনপি নেতা ইউনূচ আলী দফাদার গ্রেফতার হয়ে জেল খাটেন। বাতিলের সুপারিশকৃত অন্য দুই ডিলার হলেন পাতিবিলা ইউনিয়নের সার ডিলার ফরিদুল ইসলামের মালিকানাধীন মেসার্স ফরিদুল ইসলাম এবং বিএনপি নেতা আতিকুর রহমান লেন্টুর মালিকানাধীন মেসার্স শয়ন ট্রেডার্স। এদের মধ্যে শয়ন ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে উত্তোলনকৃত সার গুদামে না এনে উপজেলার বাইরে বিক্রি করে দেয়া, অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রি, মূল্য তালিকা না টাঙানোসহ ধারাবাহিকভাবে কৃষি বিভাগের নির্দেশনা না মানার অভিযোগ রয়েছে। গত ২০ আগস্ট ১৭ মেট্রিকটন ডিএপি সার উত্তোলন করার আগমনি বার্তা দিয়েও সার গুদামে না তোলায় তার বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির অভিযোগে ভ্রাম্যমান আদালত জরিমানা করলেও তিনি নিবৃত হননি। এছাড়া ইউনূচ আলী ও ফরিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সার ধারণমতা সম্পন্ন (৫০ মেট্রিকটন) গুদাম না থাাকা, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র না থাকা, উত্তোলনকৃত সার গুদামে না এনে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়া, ধারাবাহিকভাবে কৃষি বিভাগের নির্দেশনা না মানাসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
ব্যবস্থা নেয়ার আগে কৃত্রিম সার সংকট দেখিয়ে উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের সার সরকারি মূল্যের চেয়ে কেজিপ্রতি ৮/১০ টাকা বেশি মূল্যে সার বিক্রি করছেন ডিলাররা শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হলে অভিযানে নামে কৃষি বিভাগ। তখন বিসিআইসি সার ডিলার মেসার্স শয়ন ট্রেডার্সসহ কয়েকজন খুচরা বিক্রেতাকে ভ্রাম্যমান আদালত চালিয়ে জরিমানা আদায় করা হয়। গত ১৩ অক্টোবর উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির মিটিংয়ে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পরপরই মোটা অংকের টাকা নিয়ে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলে তদবির করতে থাকেন অভিযুক্ত সার ডিলাররা। এরপর তিন ডিলারের ডিলারশীপ বাতিলের সুপারিশের বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করা হবে বলে যশোর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়। চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিনও সেই কমিটির একজন সদস্য। ডিলারদের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় এই কর্মকর্তাকে নানাভাবে হুমকী দিতে থাকেন ডিলাররা। এ বিষয়ে তিনি জীবনের নিরাপত্ত চেয়ে চৌগাছা থানায় একটি জিডিও করেন। সার ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে আলোচিত উপজেলা কৃষি অফিসার রইচ উদ্দিনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করায় চৌগাছার কৃষক সমাজের মধ্যে হতাশা নেমে আসে। মঙ্গলবার কৃষকরা এর বিরুদ্ধে চৌগাছা শহরে মানববন্ধনও করেন।
এদিকে বুধবার উপজেলা কৃষি অফিসার রইচ উদ্দিনের স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ স্থগিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন কৃষকরা। এ বিষয়ে জিওলগাড়ী গ্রামের কৃষক আকবর আলী, সিংহঝুলী গ্রামের টনিরাজ, শামছুল হুদা দফাদার, সাবের আলী সরর্দার, সাইফুল ইসলাম, হুদা ফতেপুর গ্রামের মাওলানা আলী আকবর, মাঝালী গ্রামের শহিদুল ইসলাম, নারায়নপুর গ্রামের তুহিনুর রহমান, আমিনুর রহমান, মোবারক আলী মুন্সী, তোফাজ্জেল হোসেন, রামকৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক লাভলুসহ বেশ কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা বললে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা বলেন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া কৃষি অফিসারকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে শুনে আমরা মর্মাহত হয়েছিলাম। তার স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ প্রত্যাহার হওয়ায় আমরা সন্তষ্ট। আশা করি তিনি আগের মত দূর্নীতিবাজ সার ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া অব্যাহত রাখবেন। উপজেলা দূর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য আসাদুজ্জামান মুক্ত বলেন ‘‘চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিন একজন সৎ কর্মকর্তা। তিনি সরকার নির্ধারিত মূল্যে যাতে সার কৃষকের হাতে পৌছায় সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ায় দূর্নীতিবাজ সার ডিলাররা তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকেন। কৃষি কর্মকর্তা যে সৎ অফিসার সেটা ডিলাররা বারবার দাবি করেও তারাই তদবির করে তাকে অনৈতিক ভাবে স্ট্যান্ড রিলিজ করিয়েছিলেন। সে আদেশ প্রত্যাহার হওয়ায় আমরা সন্তষ্ট। ব্যক্তিগতভাবে সৎ এবং সরকারের ভাবমূর্তি উন্নয়নকারী কর্মকর্তাদের ভালকাজের জন্য পুরস্কৃত করতে হবে। তাহলে তারা ভালো কাজে আরো উৎসাহ পাবেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার পথে দেশকে এগিয়ে নিতে উৎসাহিত হবেন।’’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here