গদখালী ও পানিসারায় ফুল উৎসব শুরু

0
445

মালেকুজ্জামান কাকা, যশোর : ১লা ফাল্গুন ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষ্যে বেজায় ব্যস্ত যশোরের ফুলের রাজ্য গদখালী ও পানিসারার কৃষক। সেখানে শুরু হয়েছে ফুল উৎসব। ভোর থেকেই তারা ফুল তুলতে নেমে পড়ছেন মাঠে। অনেকে জমি থেকেই বিক্রি করছেন ফুল। কেউবা আবার বাজারে তুলে বিক্রি করছেন। সাইকেল, মোটরসাইকেল, ভ্যান, রিক্সা, ঈজিবাইক, পিকআপ ও মিনি ট্রাকে করে দেদারছে ফুল লোড হচ্ছে ঐ এলাকা থেকে। লাখো মানুষের ভারে সরগরম এখন এলাকাটি। প্রায় ১৫০ দোকানে দিন থেকে সন্ধ্যা রাত পর্যন্ত ফুল বেঁচা-কেনা হচ্ছে। দোকান গুলোতে জারবেরা, গ্যালাডিয়াস, কয়েক প্রকার গোলাপ, ঝাউ, গাঁদা, রজনীগন্ধ্যাসহ নানা ফুল সাজানো। একের পর এক খরিদ্দার আসছে সেখানে। শুক্রবার জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ফুল বাজারে বেজায় ব্যস্ততা দেখা গেছে সারাদিন ধরে। মাত্র এক দিন পরে ফাল্গুন শুরু। তার সাথে থাকছে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। একের পর এক সাইকেল, মোটর সাইকেল, ইজিবাইক, রিক্সা-ভ্যান ও পিকআপে ফুল লোড হয়েছে এবং বাইরে চলে গেছে। একইভাবে গদখালী বাজারেও বিভিন্ন গ্রামের মাঠ থেকে ফুল আসতে দেখা গেছে। গদখালীকে বলা হয় বাংলাদেশের ফুলের রাজধানী। ফুল ব্যবসায়িরা জানান, ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে বহিরাগত ফুল পার্টি ব্যাপক হারে আসা শুরু করেছে। ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। তবে গদখালী ও পানিসারা, হাড়িয়া ও বাইশায় প্রতিদিনই বহিরাগতরা ফুল কিনতে আসে। এখন সেখানে ফুল উৎসব চলছে। গদখালী যদি বাংলাদেশের ফুলের রাজধানী হয়। তাহলে পানিসারা হাড়িয়া হচ্ছে ফুলের হিমালয় পর্বতমালা। সেখানে চলছে ফুল উৎসব। আগামি মার্চ পর্যন্ত এই ফুল উৎসব চলবে। পানিসারা হাড়িয়া মোড়ে রাস্তার পাশে শতাধিক ফুলের দোকান ফুল বিক্রি শুরু করেছে আরো আগেই। মাঠেও অস্থায়ী দোকান করে বিক্রি হচ্ছে ফুল। ঝাঁকে ঝাঁকে নারী পুরুষ ও শিশুর দল আসছে আর ফুল কিনছে। মেয়েদের মাথায় ফুলের মালা। হাতে ফুল পুরুষদের। মোড়ে শুক্রবার ভোর থেকেই বহিরাগতরা আসতে শুরু করে। সারা দিন মানুষের ঢল অব্যাহত ছিল। গদখালির ফুলের প্রবাদ পুরুষ শের আলী (৭২) বলেন, একসময় বাঘ-খোগ ও বাজে মানুষের ভয়ে কেউ পানিসারা হাড়িয়া মোড়ে আসতে চাইতো না। আর এখন দিন রাত যেন সমান। এদিন এখানে লাখো মানুষের সমাগম হয়েছে। মাঠে ও মোড়ের তিন রাস্তায় লোক আর লোক। পানিসারা হাড়িয়া মোড় জামে মসজিদ মাঠে আগতদের বাস, জিপ, প্রাইভেট, মাইক্রো, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল জমে আছে। বাধ্য হয়ে কেউ কেউ তার যানবাহন বাইরে রেখেছেন। হাড়িয়ার ফুলচাষী কমলা (৩৫) বলেন, পুত্র কবীর কে সাথে নিয়ে তিনি এবছর এক বিঘা গোলাপ চাষ করেছেন। ১০ কাঠা আয়তনের দুইটি জমিতে তার পৃথক দুই প্রজাতির গোলাপ রয়েছে। এদিন ৪০০পিচ বড় গোলাপ বিক্রি করেছেন প্রতিটি ১০ টাকা করে। বিগত ১৫/১৬ বছর ধরে তিনি ফুল চাষ করেন। তার স্বামী ছলেমান সৌদি আরবে থাকেন। একারনে মাঠ ও বেঁচা কেনা তাকেই সারতে হয়। হাড়িয়া গ্রামের মৃত মোকছেদ মোড়লের পুত্র মহর আলী (৩০) আমেরিকান হেরী প্রজাতির গোলাপ চাষ করেছেন। ২০১৬ সালে তিনি ফুল চাষ শুরু করেন। এবছর তার ১২ কাঠা জমিতে গোলাপ রয়েছে। ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি ৫০০ পিচ ১৫ টাকা হারে ফুল বিক্রি করেছেন। শুক্রবার তিনি ২০০ পিচ একই দরে বিক্রি করেছেন। পার্টি তার জমি থেকে গোলাপ নিয়ে গেছে। তার ১৫ কাঠা গ্যালাডিয়াস ছিল। এখন শেষ হয়েছে বেঁচা-বিক্রি। গাঁদা ফুল রয়েছে। আরো আছে সাত কাঠা ঝাউ গাছ। ঝাউ গাছ ১০ থেকে ১০০ টাকা দরে প্রতি পিচ বিক্রি হচ্ছে। বাইশা চানপুরের আব্দুল মালেক এক বিঘা জমিতে জারবারা চাষ করেছেন। এদিন চার টাকা পিচ হারে ১০০০ জারবারা বিক্রি করেছেন। পাঁচবছর আগে তিনি ফুল চাষ শুরু করেন। সপ্তাহে দুই দিন তিনি জারবারা বিক্রি করছেন।
যশোরে ফুল চাষের পথিকৃৎ পানিসারা শের আলী বলেন, তার শেডে জারবেরা ফুল, ক্যাপসিক্যাম সালাদ ঝাল ও বারি-৪ টমাটো রয়েছে। পানিসারা-হাড়িয়া মোড়ে গত ৩/৪ মাস ধরে ফুল উৎসব বা ফুলের মেলা চলছে। গতকাল থেকে মেলা আরো জমজমাট হয়েছে। শুক্রবার বন্ধের দিন থাকায় এদিন রেকর্ড লোক সমাগম হয়েছে পানিসারা ও হাড়িয়ায়। রাস্তার তিন ধারায় এদিন সারা দিন নারী, পুরুষ, কিশোর-কিশোরী ও শিশুদের দল একের পর এক আসা যাওয়া করেছে।
শের আলী এখন অর্কিড ও লিলিয়াম প্রজাতির ফুল চাষের টার্গেট করেছেন। ইংল্যান্ড, জার্মানী, ডেনমার্ক, সইজারল্যান্ড, ফ্রান্সসহ ইউরোপের ১৩ দেশ ছাড়াও চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডে ফুল চাষের অভিজ্ঞতা তার ঝুলিতে। জানালেন, এবার অর্কিড ও লিলিয়াম ফুল চাষ শুরুর স্বপ্নে তিনি বিভোর। তবে লিলিয়াম নিয়ে ঝামেলা আছে। এটি সাধারনত বছরে ১০ মাস শীত থাকে এমন দেশে ভাল হয়। বাংলাদেশে কেমন হবে তা নিয়ে তার নিজেরও দুশ্চিন্তা রয়েছে। তবে আগামী মার্চ পর্যন্ত পানিসারায় ফুল উৎসব যে চলবে তা নিয়ে তার কোন দ্বিধা দ্বন্দ্ব নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here