ভবদাহে কৃষিতে ২১ ধাপের ১৭ কাজ নারী করে তবু মজুরি অর্ধেক

0
377

মালেকুজ্জামান কাকা, যশোর : যশোরের দুঃখ ভবদাহ অঞ্চলের কৃষিকাজে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। তবে আশার কথা এখানে নারী পুরুষ এখানে একসাথে কৃষি কাজে সম্পৃক্ত। বলা যায়, নারী কৃষি কর্মীর সংখ্যাই বেশি। ২১টি ধাপের মধ্যে নারীরা ১৭টি ধাপে কাজ করে। তারপরও নারীরা কৃষক বা কৃষাণী হতে পারেননি। এমনকি তার মজুরী বৈষম্যের শিকার। পুরষের চেয়ে বেশি কাজ করেও মজুরি কম পায় তারা। প্রতি কর্মদিবসে সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত কাদা মাটিতে জমি তৈরির কাজ করে একজন নারীর মজুরী মাত্র ২০০ টাকা। একই স্থানে নারীর থেকে কম কাজ করে একজন পুরুষ কৃষক ৪০০ টাকা পাচ্ছেন। যদিও দীর্ষ দিন ধরে যশোরের নারী আন্দোলনকারীরা তাঁদের ‘নারী কৃষক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্ত বাস্তবে কে শোনে কার কথা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফসলের প্রাক বপন-প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ফসল উত্তোলন, বীজ সংরণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিপণনে অনেক কাজ নারী এককভাবে করেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে নারীর এ হিসাবের কেনি স্বীকৃতি নেই। কৃষিকাজকে নারীর প্রাত্যহিক কাজের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। ভাবা হয়, এ কাজে আবার মজুরি লাগবে কেন। কৃষি খাতে ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ কাজই নারীরা করেন বিনা মূল্যে। জরিপে দেখা গেছে, দেশে কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্রমশক্তির সংখ্যা ২ কোটি ৫৬ লাখ। এর মধ্যে নারী প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ। এক দশক আগেও নারীদের এ সংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন ৬৭ লাখ নারী। আর পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে সাড়ে ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত বাংলাদেশ শ্রমশক্তি বিষয়ক এক জরিপ বলেছে, কৃষি অর্থনীতিতে গ্রামীণ নারীর অবদান ৬৪.৪ শতাংশ এবং পুরুষের অবদান ৫২.৮ শতাংশ। বিবিএসের অপর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক দশকের ব্যবধানে দেশের কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ১০২ শতাংশ। সেখানে পুরুষের অংশ গ্রহণ কমেছে ২ শতাংশ। ২০০০ সালে দেশের কৃষিতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৫ লাখে। প্রতিবেদন বলছে, ১০ বছরের মধ্যে প্রায় ৭০ লাখ নারী কৃষিতে যুক্ত হয়েছেন। কৃষির বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রমবিভাজনের কারণে নারী শ্রমিকের চাহিদা বেড়েছে। বেশিরভাগ পুরুষ পেশা পরিবর্তন করে অ-কৃষিকাজে নিয়োজিত হচ্ছেন, কিংবা গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছেন শহরে। তবে এই প্রতিবেদনে উপকূল এলাকার প্রতিফলন রয়েছে। যশোর ভবদাহ এলাকার বিল মান্দিয়ায় দেখা যায় জমি প্রস্তুত করতে ব্যস্ত কৃষক। একটি জমিতে হাটু পানিতে নেমে জমি প্রস্তুত করছে রীতা রাণি, সিমা মন্ডল, শিউলি, মালারা। তাদের সাথে ছিলেন একজন পুরুষ অজিত মন্ডল। নারী কৃষক সীতা রাণী বলেন, পুরুষের চেয়ে আমরা বেশি কাজ করি। কাজে ফাঁকি দেই না। বিড়ি-সিগারেট টানতে আমাদের সময় অপচয় হয় না। সময় ধরে কাজে আসতে হয়, যেতে হয়। তবুও আমাদের মজুরি কম। মালিক বলে, আমরা নারী, আমরা পুরুষের মত কাজ পারি না। কৃষি কর্মী সিমা মন্ডল বলেন, আমাদের মনির বাপ মাঠে দিনমজুর বা কামলা হিসেবে কাজ করে। আমিও কিছু আয়ের জন্য মাঠে কাজ করি। তিনি বলেন মনির বাপ ৪০০ টাকিা মুজুরি পেলেও আমি পাই তার অর্ধেক মাত্র ২০০ টাকা। অজিত মন্ডল বলেন, এখানকার এটাই নিয়ম, মহিলাদের গায়ে জোর কম তাই ওরা কম টাকা পাই। সিমা মন্ডল এসময় বলেন অজিত দা যে কাজ করে আমরাও ঠিক একই কাজ করি। নিম্ন আয়ের পরিবারে আর্থিক টানাপোড়েন কাটিয়ে উঠতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও মাঠে কৃষি কাজে রয়েছে। এটাই এ অঞ্চলের বর্তমান চিত্র। তথ্যসূত্র বলছে, শুধু জমি প্রস্তুত নয় তার সাথে আছে ধান কাটা, ধানের চারা রোপণ, ধান শুকানো, ধান মাড়াই, সবজি আবাদ, গরু-ছাগল পালনসহ বিভিন্ন কৃষি কাজে সম্পৃক্ত যশোরের ছিয়ানব্বই এলাকা তথা ভবদহের নারীরা। পুরুষের অনুপস্থিতিতে নারী প্রধান পরিবারের ব্যক্তি নারী প্রধানত কৃষি কাজের মাধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। শুধু উৎপাদন নয়, একাধারে ফসল উৎপাদন প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত নারীরা। খাঁটুনি বেশি, কাজে ফাঁকির সুযোগ নেই, আবার কাজের সময়সীমাও বেশি- অথচ মজুরি কম। কৃষিতে নারীর অবদানের কোন স্বীকৃতিও নেই। ভবদহে ফসলের প্রত্যেক মাঠে নারী কৃষকের উপস্থিতি রয়েছে। ধান পাটের পাশাপাশি সবজি আবাদ, গরু-ছাগল পালন, মৎস্য খামার পরিচালনা, হাঁস-মুরগি পালন, ফসলের েেত নিড়ানি, মাঠের ফসল ঘরে তোলা ইত্যাদি কাজে নারীকে দেখা যায়।
একই সাথে কৃষি কাজে সম্পৃক্ত নারী কর্মীদের জন্য সরব হয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ যশোর শাখার সাধারন সম্পাদক তন্দ্রা ভট্টাচার্য্য। পুরুষের সম পরিমান মজুরি দাবি করেছেন তিনি।
তন্দ্রা ভট্টাচার্য্য বলেন, জাতীয় কৃষি নীতিমালায় নারী কৃষকের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা সংযুক্ত করে কৃষক হিসেবে নারীদের কৃষি উপকরণ সেবা প্রাপ্তিতে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিতে হবে। তাদের কাছে কৃষি সংক্রান্ত সব তথ্য পৌঁছাতে হবে। প্রযুক্তিগত প্রশিণের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থায় গ্রামীণ নারীর অংশ গ্রহণ উৎসাহিত করতে যথাযথ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের ভূমি মালিকেরা যাতে নারী কৃষকদের ন্যায্য মজুরি দিতে বাধ্য হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে নারী কৃষকদের সংগঠন গড়ে তোলাও জরুরি। নারীদের এই রোজগার পরিবারের অভাব অনটন ঠেকাতে সহায়তা করে। কিন্তু ঘরের বাইরে নারীদের কাজের পরিবেশ নেই, তারা পাচ্ছেন না ন্যায্য মজুরি। পুরুষের অর্ধেক মজুরি দেয়া হয় তাদের। ভূমি মালিকদের অনেক লাঞ্ছনাও সইতে হয়। সব কিছু তারা মাথা পেতে সহ্য করছে। আর কম মজুরি মানতে বাধ্য হচ্ছে। এটি হতাশার কথা আমাদের নারী সমাজের জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here