মণিরামপুরে ২০ দিনে তিনজন খুন

0
478

মণিরামপুর প্রতিনিধি ॥ মণিরামপুরে নির্যাতনে হত্যার প্রবণতা বেড়েছে ভয়ানক হারে। গত ২০ দিনে উপজেলায় এক যুবক ও দুই ছাত্রকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দুই ছাত্রের মধ্যে একজনকে ছিনতাইকারী এবং অপরজনকে চোর সন্দেহে নির্যাতন করা হয়েছে। পরে চিকিৎসা চলাকালে তাদের মৃত্যু হয়। হত্যাকাণ্ডের দুটি ঘটনা ঘটেছে কাশিমনগর ইউনিয়নে,বাকিটা ঝাঁপায়। তিনটি ঘটনায় মামলা হয়েছে। পুলিশ জড়িত কয়েকজনকে আটকও করেছে। তবুও ঘটনাগুলো জনমনে মধ্যে আতংক সৃষ্টি করেছে। নিজেদেরসহ সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অনেকে।
পিটিয়ে ও কুপিয়ে তিন হত্যার প্রথমটি ঘটে কাশিমনগর ইউনিয়ের শিরিলি মদনপুর গ্রামে গত ২৯ জানুয়ারি রাত নয়টার দিকে। ওই গ্রামের আমিন মোড়লের ছেলে মুকুল হোসেন বাড়ির পাশে মাছের ঘেরে গেলে চোখে লাইট মারা নিয়ে এলাকার মোন্তাজ আলীর ছেলে টিপু সুলতানের সাথে তার কথা কাটাকাটি হয়। এরপর মোন্তাজ আলী ও টিপুসহ তাদের লোকজন পিটিয়ে ও কুপিয়ে মুকুলকে মুমুর্ষু অবস্থায় ফেলে রাখে। পরে রাত ১০টার দিকে স্বজনরা তাকে যশোর সদর হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মুকুলকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে ওই রাতেই মণিরামপুর থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করে। যাদের নাম উল্লেখসহ সাত জনকে আসামি করে মামলা করেন মুকুলের পিতা। পরে পুলিশ মাজেদা বেগম নামে আরেক আসামিকে আটক করলেও বাকিরা রয়েছেন ধরা ছোয়ার বাইরে। নিহত মুকুলের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে থানায় আটটি মামলা রয়েছে। তিনি এলাকায় মাদক সম্রাট নামে পরিচিত ছিলেন। মুকুলের মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা থানার এসআই জিয়াউল হক। তিনি বলেন, মুকুল হত্যার ঘটনায় সাতজন এজাহারনামীয় আসামির মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারমধ্যে টিপু ও দীপু নামে দুইজন আদালতে খুনের দায় স্বীকার করেছেন। বাকি তিন আসামি এলাকা ছাড়া। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে চলতি মাসের ৬ফেব্রুয়ারি শনিবার। ওইদিন সকালে মোটরসাইকেল ছিনতাইকারী সন্দেহে বোরহান কবির নামে দ্বাদশ শ্রেণির মেধাবী ছাত্রকে নির্মমভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে নাইম হোসেন নামে এক যুবক। পরেরদিন রোববার ভোরে ঢাকায় নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় বোরহানের। ওই ঘটনায় পুলিশ নাইমকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায়। বোরহান উপজেলার বিজয়রামপুর গ্রামের আহসানুল কবিরের ছেলে। তিনি মণিরামপুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ঘটনার দিন সাইকেল চালিয়ে তিনি উপজেলার খালিয়ে গ্রামে যান। তার কয়েকদিন আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন বোরহান। তবে ছিনতাইকারী সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হলেও ছিনতাইতো দূরের কথা কখনো বোরহানকে নিয়ে একটা চুরির অভিযোগ দিতে পারেননি কেউ। বোরহান হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা থানার এসআই সাহাবুল আলম বলেন, নাইমকে একদিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অধিকতর তদন্ত চলছে। মামলার স্বার্থে এখনি বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। এদিকে বোরহান হত্যার ঘটনায় আরো একজনকে আসামি করতে আদালতে আবেদন করেছেন বোরহানের পিতা। তবে সেই ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোন তথ্য পাননি বলে জানিয়েছেন। এছাড়া মণিরামপুরে পিটিয়ে হত্যার তৃতীয় ঘটনাটি ঘটেছে ১৬ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাতে উপজেলার খোজালিপুর গ্রামে। ওই গ্রামের মশিয়ার গাজীর আলিম দ্বিতীয় বর্ষে পড়ুয়া ছেলে মামুন হাসানকে চোর সন্দেহে হাত-পা বেধে নির্যাতনের ১২ ঘন্টা পর হাসপাতালের বেডে মৃত্যু হয়েছে মামুনের। ওই ঘটনায় বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে নিহতের পিতা বাদি হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করেছেন। মামুনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ দ্রুত তৎপরতা দেখিয়ে জড়িত অভিযোগে একই এলাকার সোহাগ, আলতাফ ও লাভলুকে গ্রেফতার করেছ। পুলিশ ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আনিছুর রহমান বলছেন, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১১ টায় খোজালিপুর গ্রামের আয়নালদের বাড়িতে মোবাইল ফোন চুরি করতে গিয়ে সহযোগী আরমানের সাথে ধরা পড়েন মামুন। তখন প্তি লোকজন মামুনকে হাত-পা বেধে মারপিট করেন। বুধবার সকালে পুলিশের সহায়তায় স্বজনরা তাকে মণিরামপুর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল তিনটার দিকে মারা যান মামুন। মামুন নেশাগ্রস্থ ছিলেন। নেশার টাকা যোগাড় করতে তিনি নিজগ্রামসহ আশপাশের গ্রামে বৈদ্যুতিক সেচপাম্প (মোটর) ও মোবাইল চুরি করতেন। আটমাস আগে একবার মোবাইল চুরির অভিযোগে মামুনের বিরুদ্ধে গ্রাম্য শালিস হয়। আর কোন চুরির অভিযোগে শালিসের কথা জানাতে পারেননি মেম্বর আনিছুর। এছাড়া চুরির অভিযোগে মামুনের বিরুদ্ধে মণিরামপুর থানায় কখনো কোন মামলাও হয়নি। এদিকে ২০ দিনের মধ্যে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মণিরামপুরের সচেতন মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তারা বলছেন, একজন মানুষ অপরাধ করতে পারেন। কিন্তু তাকে পুলিশে না দিয়ে আইন হাতে তুলে নিয়ে এভাবে পিটিয়ে খুন করাটা মোটেও কাম্য নয়। বিষয়গুলো মণিরামপুরে আইনশৃখলার অবনতির আভাস দিচ্ছে। তারা ঘটনাগুলোর সাথে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করছেন।
জানতে চাইলে মণিরামপুর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) শিকদার মতিয়ার রহমান বলেন, মণিরামপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাল। অপরাধ দমনে পুলিশ তৎপর রয়েছে। বিচ্ছিন্ন তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। জড়িতদের মধ্যে অনেককে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। বাকি আসামি গ্রেফতারে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here