ঘুর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে উপকুলের বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত, বিপর্যস্ত জনজীবন

0
551

যশোর ডেস্ক : ঘুর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট জলোশ^াসে লন্ডভন্ড উপকুলীয় জনপদ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভেড়িবাঁধ ভেঙ্গে বিস্তৃর্ণ এলাকা হয়েছে প্লাবিত। পানি ঢুকে পড়েছে লোকালয়ে। ভেঙ্গে গেছে কাচা বাড়িঘর। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট ও মাছের ঘের। জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে ফসলি জমি। ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ার কারনে জনদুর্ভোগ বেড়েছে চরমে। ভেঙ্গে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উপকুলের কয়েক লাখ মানুষ। ইয়াসের ভয়াবহতা নিয়ে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য নিয়ে একটি ডেস্ক রিপোর্ট ।
ইয়াসের আঘাতে কয়রায় ৩০ গ্রাম প্লাবিত
আমাদের কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ এর প্রভাবে খুলনার কয়রার কপোতা- ও শাকবাড়িয়া নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়ে বেঁড়িবাধ ভেঙে উপজেলার ৪ ইউনিয়ের ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বাঁধ ভেঙে ও বেঁড়িবাধ উপছে পানি ঢুকে ধসে পড়েছে কাঁচা ঘরবাড়ি। বাড়ির আঙ্গিনাসহ তলিয়ে গেছে রাস্তা ঘাট, মাছের ঘের ও ফসলের মাঠ। ২৬ মে সকালে জোয়ার বাড়ার সাথে সাথে বেলা সোয়া ১২ থেকে বেরিবাধ উপছে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে থাকে, মহারাজপুর ইউপির দশালীয়া থেকে হোগলা পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার ব্যাপী বাধ .উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে করে দশালিয়া, কালনা, মেঘের আইট, আটরা, গোবিন্দপুর, হাগলা সহ অন্তত ৭ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানি প্রবেশ করেছে একই ইউনিয়নের মঠবাড়ি ও পবনা এলাকায়। দণি বেদকাশী ইউপির আংটিহারা মন্দিরের পাশে বাধের প্রায় ৪০ মিটার একই ইউনিয়নের জোড়শিং বাজার হতে বীণাপাণি পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার বাঁধ উপচে লোকালয় পানি প্রবেশ করেছে এতে করে ৫/৬ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। উত্তর বেদকাশী ইউপির গাতিরঘেরী বেড়ীবাধের প্রায় আধা কিলোমিটার ব্যাপী বাধ উপছে নোনা পানিতে এলাকা লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। এতে করে অন্তত ৪ গ্রাম সম্পূর্ণ নোনা পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ভেঙে পড়েছে কাঁচা ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট মৎস্য ঘের সহ সবকিছু। একই ইউনিয়নের কাঠকাটা বাঁধের ১৫০ মিটার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাধ উপচে পানি প্রবেশ করেছে কয়রা সদর ইউনিয়নের ২ নং কয়রা ঋষি বাড়ির পাশে ও ৪ নং কয়রা লঞ্চ ঘট সংলগ্ন এলাকা দিয়ে। পানি প্রবেশ করেছে মহেশ্বরীপুর ইউপির নয়ানী ও খোড়লকাঠি এলাকাসহ কপোতা ও শাকবাড়িয়া নদী তীরবর্তী প্রায় ৩০ টির অধিক গ্রামে পানি প্রবেশ এর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অধিক নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সকাল থেকেই থেমে থেমে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বাতাস বাড়ার সাথে সাথে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। দণি বেদকাশি ইউনিয়নের (বাঁধ ভাঙন) বাসিন্দা আবু সাইদ খান জানান,ঝড়-বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসলে আমরা খুবই আতংকে থাকি। বিশেষ করে রাতে। এলাকার মানুষ ছেলে-মেয়ে নিয়ে বসে থাকে। কখন বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে নদীতে চলে যায়। আজ (গতকাল) দুপুরে হঠাৎ করে নদীর বাঁধ ভেঙ্গে যেভাবে পানি উঠতে শুরু করেছে এতে বিপদে আছে উপক‚লীয় অঞ্চলের মানুষ। সাতীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর রহমান জানান,দণি অঞ্চলের নদ-নদীতে পানির স্বাভাবিক মাত্রা থাকে ৩ মিটারের কাছাকাছি। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট জলোচ্ছ¡াস এবং পূর্ণিমার জোয়ারের কারণে আরও দুই থেক ৩ ফুট বেশি পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। উপজেলার প্রায় ৩০ টি পয়েন্ট দিয়ে পানি বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। কয়েক জায়গায় বেঁড়িবাধ ভেঙ্গে প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা জিও ব্যাগ ও বালুর বস্তা ফেলে পানি আটকানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, আগামী দুইদিনে পানির উচ্চতা আরও বাড়তে পারে। এর সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জলোচ্ছ¡াস হলে পানি আটকানো সম্ভব হবে না। তিনি আরও বলেন, আমরা ২০ হাজার জিও ব্যাগ ও ৩০ হাজার সিনটেথিক ব্যাগ মজুদ রেখেছি। ঝুকি পূর্ণ জায়গায় জিও ব্যাগ দিয়ে বাধ রার কাজ করানো হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোঃ আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন দুর্যোগের খবর পাওয়ার সাথে সাথে দুইদিন যাবত আমি কয়রায় অবস্থান করছি ২৫ মে থেকে আমি নিজেই কয়রার প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাউবোর স্পর্শ কাতর স্থানগুলিতে গিয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছি আজও কয়রাতে অবস্থান করছি ঘূর্ণিঝড় ইয়াশ এর প্রভাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি কয়রা বাসির সাথে আছি । ভেঙে যাওয়া স্থানগুলি দ্রæত মেরামত করা হবে’ এছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের ইয়াসের প্রভাবে তির পরিমাণ যাতে কম হয় সে জন্য জিও ব্যাগ সিন্থেটিক ব্যাগসহ বেরিবাধ টেকানো এবং জনসাধারণের জানমাল রার্থে সকল ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত য়তির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
ঘূর্নিঝড় ইয়াসের প্রভাবে জোয়ারের পানিতে তলিয়ে
গেছে সাতক্ষীরার শতাধিক গ্রাম \ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
আমাদের সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি জানান, ভয়াল ঘূর্নিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সাতক্ষীরার সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর ও আশশুনি উপজেলার শতাধিক গ্রাম জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব গ্রামের বিপুল সংখ্যক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। পানিতে ভেসে গেছে কয়েকশত চিংড়ী ঘের। নোনা পানির এ অঞ্চলের মানুষ পুকুরের মিষ্টি পানির ওপর নির্ভরশীল। সেসব পুকুরও নোনা পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে। পানির তোড়ে শ্যামনগর উপজেলার স্বাভাবিক সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এদিকে ক্ষতিগ্রস্থ গ্রামবাসীর অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে না উঠলেও নিরাপদ স্থানে সরে গেছে। ফলে আশ্রয়কেন্দ্র গুলি একরকম খালি পড়ে আছে। বুধবার সকালে শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ঝাপা গ্রামে বেড়িবাঁধের চারটি পয়েন্ট, পাতাখালির দুটি পয়েন্ট, রমজাননগরের দুটি পয়েন্ট, গাবুরার তিনটি পয়েন্ট, কৈখালির দুটি পয়েন্ট, বুড়িগোয়ালিনীর তিনটি পয়েন্ট ও নূরনগর ইউনিয়নের একটি পয়েন্ট সহ অন্ততঃ ১৬টি স্থানে বেড়িবাঁধ উপচে পানি গ্রামে ঢুকে পড়েছে। এসব বেড়িবাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ায় সয়লাব হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। এদিকে কালিগঞ্জ উপজেলার হাড়দ্দাহ গ্রামে কালিন্দী নদীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙে ১০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। আশাশুনির দয়ারঘাট, কুড়িকাহনিয়া লঞ্চঘাট, হরিশখালী, সুভদ্্রাকাটি এলাকা ভেঙে নোনা পানিতে আটকে পড়েছে গ্রামবাসী। শ্যামনগর উপজেলার গাবুরার জেলেখালি, নেবুবুনিয়াম চাঁদনীমুখা, দূর্গাবটি সহ বিভিন্ন এলাকা এখন পানিতে ভাসছে। গ্রামবাসী ও জনপ্রতিনিধিরা বালির বস্তা এবং মাটি ফেলে বাধ সংস্কারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। শ্যামনগর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউল হক দোলন বলেন, ৩০ ভাগ চিংড়ী ঘের পানির তলে তলিয়ে গেছে। এতে বিপুল টাকার মাছের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু জার গিফারী জানান, এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি নিরুপন করা যায়নি। তবে ক্ষতির অংক হবে অনেক বড়। এদিকে বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট ধ্বসে নদীর পানি ছড়িয়ে পড়েছে। মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের সেতু উপচে চুনা নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে এলাকা। এখন পর্যন্ত কোন প্রানহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে গ্রামবাসী গবাদিপশু ও তাদের সহায় সম্পদ নিয়ে আতংকিত হয়ে পড়েছেন। সাতক্ষীরায় দিনভর বৃষ্টি হয়েছে সেইসাথে ঝড়ো হাওয়া ছিল প্রবল।
পাইকগাছায় ঘুর্নিঝড় ইয়াস-এর আঘাতে
লন্ডভন্ড পাউবো’র বেড়িবাঁধ
আমাদেও পাইকগাছা প্রতিনিধি জিএ গফুর জানান, পাইকগাছায় ঘুর্নিঝড় ইয়াস এর প্রভাবে ভরা পুর্নিমায় বিভিন্ন ইউনিয়নে ওয়াপদার বেঁড়িবাধ ভেঙ্গে ও উপচে পড়া জোয়ারের পানিতে বিভিন্ন পোল্ডারের অভ্যন্তরে লবন পানিতে প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয-ক্ষতি হয়েছে। নদ-নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বুধবার দুপুরের প্রবল জোয়ারে লতা ইউনিয়নের দক্ষিণ লতা গ্রামের ওয়পদার বাঁধ ভেঙ্গে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমেও ভাঙ্গন রোধ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া গড়ইখালী, সোলাদানা, দেলুটি, লস্কর, রাড়ুলী, হরিঢালী, কপিলমুনিতে পাউবো’র নিচু ও ঝুকিপুর্ন বেড়িবাধের উপর দিয়ে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকলে বহু চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়ে চিংড়ি সহ নানা প্রজাতির সাদা মাছ ভেসে গেছে। জোয়ারে পৌরসভা বাজার, সোলাদানা বাজার, গড়ইখালী বাজার সহ আবাসন প্রকল্প তলিয়ে গেছে। দিনভোর মাঝারি বৃষ্টি পাতের মধ্যে স্থানীয় এমপি মোঃ আকতারুজ্জামান বাবু, উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার ইকবাল মন্টু,উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ,বি,এম,খালিদ হোসেন সিদ্দিকী,ওসি মোঃ এজাজ শফী, পাউবো’র স্থানীয় শাখা প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দীন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস বিভিন্ন ইউনিয়নের ঝুঁকিপূর্ণ বেঁড়িবাধ ও ভাঙ্গন কবলিত স্থান পরিদর্শন করেছেন। এদিকে গত দু’দিনে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান-মেম্বর, রাজনৈতিক-সমাজকর্মীরা সহ সরকারী ভাবে কর্মসৃজন প্রকল্পের লোকজন দিয়ে বিভিন্ন পোল্ডারের ঝুঁকিপূর্ন বাঁধ ও ভাঙ্গন কবলিত স্থানগুলো মেরামত অব্যাহত রেখেছেন। এ বিষয়ে পাউবো’র শাখা প্রকৌশলী মোঃ ফরিদ উদ্দীন জানান, ঘুর্নিঝড়ের প্রভাবে নদ-নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে বুধবার দুপুরের প্রবল জোয়ারে ২৩’পোল্ডারের সোলাদানা বাজার, পাটকেল পোতা, বরুইতলা, বেতবুনিয়া, নারিকেল তলা, পারশ্বেমারী, লস্করের করুলিয়া, ১০/১২ পোল্ডারের গড়ইখালী বাজার, খুতখালী, গাংরক্ষি পুর্ব হড্ডা, রাড়ুলীর জেলে পল্লী, লতার ধোলাই সহ দেলুটি,হরিঢালী সহ নানা স্থানের নিচু বেঁড়িবাধ উপছে বা পরে তা খাঁদ হয়ে কোথাও ভেঙ্গে গেলে পোল্ডারে লবন পানি প্রবেশ করে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। ইউএনও এ,বি,এম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী জানান, দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্ততি নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী এলাকার মানুষের আঙ্খাকা টেকসহি বেঁড়িবাধ নির্মানে সরকারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে খুলনা-৬’র এমপি মোঃ আকতারুজ্জামান বাবু আমাদের প্রতিনিধিকে বলেন,ঘুুর্নিঝড় পরিস্থিতিতে জান-মাল রক্ষার্থে পুর্ব প্রস্ততি গ্রহন করা হয়েছে।

ইয়াসের প্রভাবে মোংলা অঞ্চলের
লোকজনের দুর্ভোগ চরমে
আমাদের মোংলা প্রতিনিধি জানান,ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে মোংলা বন্দরসহ সুন্দরবনের উপকূলীয় বিভিন এলাকার বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি লোকালয়ে এবং পৌরসভায় প্রবেশ করেছে জোয়ারের পানি। বুধবার দুপুরের পর ভরা জোয়ারের প্রভাবে সাগরছিল প্রচন্ড উত্তল এবং মুষলধারে বৃস্টি। যার কারনে পানির উচ্চতা বেড়ে যায়। এ সময় সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় বেড়িবাঁধ তিগ্রস্ত অংশ দিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করে জোয়ারের পানি। কানাইনগর, কাইনমারী, চিলা, জয়মনি, বুড়িরডাঙ্গা, মাছমারা ও পৌরসভা এলাকার তিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে প্লাবনের সৃষ্টি হয়। ফলে ওই সমস্ত নিম্নাঞ্চল এলাকার গরিব ও অসহায় লোকজনের দুর্ভোগ চরমে পৌছে যায়। খবর পেয়ে তৎক্ষনিত প্রথম পযায়ের খাদ্য সহায়তা পৌছে দেন উপজেলা প্রশাসন। ঘুর্ণিঝড় ইয়াস আসবে এমন খবরে মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন সংলগ্ন উপকুলীয় এলাকার মানুষের মাঝে একটি অজানা আতংঙ্ক বিরাজ করছিল। গত তিনদিন ধরেই আবহাওয়া অফিস তাদের বার্তায় এমন খবরই প্রচার হচ্ছিল এবারের ঘর্ণিঝড় ইয়াস একটি শক্তিশালী প্রলয়ংকারী ঝড়ে পরিনত হবে। এখানকার নদী বেষ্টিত এলাকার অসহায় মানুষগুলো প্রতিনিয়তই ঝড় জলোচ্ছাস নিয়েই বেঁচে থাকতে হয় তাদের। তার পরেও গত বেশ কয়েকটি ঘুণিঝড়ে তারা হারিয়েছে মাথা গোঁজার ঠাঁইসহ তাদের সহায় সম্ভল ও অন্যান্য আসবাস পত্র। তাই সময় যতই অতিবাহিত হচ্ছিল ততই মানুষের মনে ভয় বাসা বেঁেধছিল এই বুঝি উপকুলের দিকে ধেঁয়ে আসছে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট হওয়া ঘুর্ণিঝড় ইয়াস। গত তিনদিন থেকেই নদী ও সাগর প্রচন্ড উত্তল ছিল। যার প্রভাবের কারনে মোংলা বন্দরে ৩ নাম্বার স্থানীয় সতর্ক সংকেতও বহাল রেখেছিল আবহাওয়া অফিস। শহর ও উপকুলীয় এলাকায় সকাল থেকে দুর্যোগপুর্ন আবহাওয়ার ফলে হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় এখানকার মানুষ ঘর থেকে নামতে পারছিলনা। অপরদিকে, দুর্যোগপুর্ন আবহাওয়ার সাথে কখনও হালকা ও আবার কখনও ভারী বৃষ্টির ফলে বন্দরে অবস্থানরত বানিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কাজও ব্যাহত হচ্ছিল। বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের আধিক্য বিরাজ করায় বুধবার সকালেও সুন্দরবন উপকূল অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ অব্যাহত ছিল। থেমে থেমে কখোনও মাঝারী আবার মুষলধারেও বৃষ্টি হাচ্ছল অভিরাম। উপকূলীয় এলাকায় প্রচন্ড বাতাস ছাড়াও বিরাজ করছিল দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া। ঘুর্ণিঝড়টি পুর্ণিমার ভরাগোনে সৃস্টি হওয়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় ৪ থেকে ৫ ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবনসহ উপক’লীয় নি¤œাঞ্চল এলাকায় ঢুকে পরে পানি। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় সুন্দরবনের করমজল পর্যটন ও বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রটি। এছাড়াও বনের দুবলার চরের জেলেপল্লীর টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রহাদ চন্দ্র রায় জানান, দুবলা ও এর আশপাশ এলাকার সুন্দরবনের ভেতরে পানি ঢুকে পরে। আর এ ঘুর্ণিঝড়ের পানি বনের অভ্যান্তরে ঢুকে পরায় এখানকার জেলে ও বন্যপ্রানীদের মিস্টি পানির এক মাত্র পুকুর তলিয়ে যায়। বনে পানি ঢোকায় প্রায় বাচ্চাসহ ৪শ’ থেকে ৫শ’ হরিণ ও অন্যান্য প্রানী এ মিষ্টি পানির পুকুর পাড়ে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে। নদীর এ পানি বনের কতদুর গিয়ে গড়িয়েছে তা আমাদের অজানা। তবে ভিতরে ঢুকে দেখলে জানা যাবে পানি কতটুকু ভিতরে পৌঁছেছে। এছাড়া মোংলার কাইনমারী সুইস গেট উপচে পানি পৌর শহরে প্রবেশ করছে। পৌরসভার মধ্যে পানি ঢুকছে মাছমারা এলাকার মানুষের চলাচলের রাস্তাও তলিয়ে যায়। জলোচ্ছ্াসে সুন্দরবনের দুবলার চরের অন্যান্য জায়গায়ও স্বাভাবিকের তুলনায় পাঁচ-ছয় ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। ঝড়ে ভেঙে গেছে বন বিভাগের দুবলা জেলেপল্লী টহল ফাঁড়ির কাঁচাঘরও। অপরদিকে, ঘুর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে নদীর পানি বিপদ সীমার উপরদিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় মোংলার প্রায় সাড়ে ৬শ’ পরিবার জলোচ্ছ্াসে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বুধবার দুপুরের দিকে পৌরসভাসহ তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ১০টি গ্রামে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমলেশ মজুমদার জানান, দুপুরে খবর পাওয়ার সাথে সাথে ওই এলাকায় গিয়ে বন্যা দুর্গতদের উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি জরুরী খাদ্য সহায়তার শুরু করা হয়েছে। প্রথমে শুকনা খাবার এবং রাতে তাদের জন্য খিচুরীর ব্যাবস্তা করা হয়েছে। এছাড়া যাদের কাচা ঘর ভেঙ্গে গেছে তাদের আশ্রয় কেন্দ্রে থাকার ব্যাবস্থা করা হবে বরেও জানায় এ কর্মকর্তা। এদিকে ঘুর্ণিঝড় আঘাত হানবে এমন খবরে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল উপজেলা প্রশাসন। প্রস্তুত রেখেছে সিপিপি সেচ্ছাসেবকদের। কন্টোল রুমের মাধ্যমে উপক’লীয় এলাকার সব কিছুই পর্যবেক্ষন করছিল উপজেলা প্রশাসন। নৌবাহিনী, কোষ্টগার্ড ও বন বিভাগ তাদের নৌযান সমুহ নিরাপদে সারিয়ে রাখা হয়েছিল। সুন্দরবনে ঝুঁকিপুর্ন ৮টি অফিসের বনরক্ষীদের তাদের অফিস থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে নিরাপদ স্থানে বলে জানায় বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মোঃ বেলায়েত হোসেন। সাগর ও পশুর চ্যানেলে বৈরী আবহাওয়া আর বৃষ্টির ফলে মোংলা বন্দরে অবস্থানরত বানিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কাজ ব্যাহত হচ্ছিল। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বন্দরে সার, কিংকার, পাথর, গ্যাস, ফাই আ্যাশসহ ১১টি বাণিজ্যিক জাহাজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় এখানে অবস্থান করছিল বলেও জানায় বন্দরের হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফকর উদ্দিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here