মালিকুজ্জামান কাকা, যশোর : মাংস বা বিভিন্ন স্বাদের তরকারিতে চুঁই ঝাল একটি মজাদার মশলা হিসেবে সারা দেশে এই মুহুর্তে খুবই জনপ্রিয়। এই চুঁইঝাল রোপণ করে ব্যবসা ও জীবন ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে কয় যুবক। স্বপ্ন বুনছেন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সাত গ্রামের ৭০০ তরুণ ও যুবক। সমবায়ের ভিত্তিতে তারা এক হয়েছেন ভাগ্য ফেরানোর আশায়। স্বপ্নবাজ এই যুবক বা তরুণেরা গঠন করেছেন খানপুর চুইঝাল প্রজেক্ট। খানপুর চুইঝাল প্রজেক্ট এর আওতায় মণিরামপুর উপজেলার ১৩ নম্বর খানপুর ও ১২ নম্বর শ্যামকুড় ইউনিয়নের চার গ্রামে ১০০০০ গাছে চাষ করা হয়েছে চুইঝাল। আরো তিন গ্রামে চলছে চারা রোপণের তোড়জোড়। তিন বছর পর এই চুইঝাল বিক্রির উপযোগি হলে প্রতিটি গাছ গড়ে পাইকারি বিক্রি হবে অন্তত: ২০০০ টাকায়। উদ্যোক্তাদের ল্য আগামি ছয় বছরে এই সাতটি গ্রামের কয়েক লাখ গাছের প্রতিটিতে জড়িয়ে থাকবে চুঁইঝালের লতা। চুঁইঝাল প্রকল্পে এই তরুণ ও যুবকদের একত্রিত করেছেন উদ্যোমী তরুণ মাসুদুর রহমান সবুজ।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, ব্যক্তি উদ্যোগে বাণিজ্যিকভাবে চুইঝালের চাষ হলেও দেশে সমবায় ভিত্তিতে এই লতা ঝালটির চাষ তাদের জানা মতে প্রথম। চুইঝাল মসলা জাতীয় উদ্ভিদ। চুইঝাল গাছ দেখতে পানের লতার মতো। পাতা কিছুটা লম্বা ও পুরু। এর কান্ড বা লতা কেটে ছোট টুকরা করে মাছ-মাংস, ছোলা বা ডাল রান্নায় ব্যবহার করা হয়। রান্নার পর এর টুকরা চুষে বা চিবিয়েও খাওয়া যায়। মাংস রান্নায় চুইঝালের ব্যবহার বেশি। এটি মাংসের তরকারিতে আনে বিশেষ স্বাদ। নামে ‘চুইঝাল’ হলেও এটি খেতে খুব বেশি ঝাল নয়। চুইঝালের কিছু ঔষধি গুণের কথাও বলা হয়। আগে মূলত যশোর, খুলনা, সাতীরা এলাকায় এর ব্যবহার হলেও প্রচারমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে চুইঝালের কথা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে দিন দিন বাড়ছে এর চাহিদাও। বাজারে চুইঝাল আকৃতি ভেদে ৩০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। মণিরামপুর উপজেলার ১৩ নম্বর খানপুর ইউনিয়নের নিভৃত, মনোরম সবুজে ছাওয়া একটি গ্রাম মুন্সি খানপুর। এই গ্রামের হাজি আনসার মোড়লের ছেলে মাসুদুর রহমান সবুজ। তার বাড়িতে দেখা যায়, আশপাশের বেশির ভাগ গাছেই বেয়ে উঠেছে চুইঝালের লতা।
চুঁই ঝাঁলের প্রজেক্ট উদ্যোক্তা মাসুদুর রহমান সবুজ বলেন, ‘সাতটি গ্রাম নিয়ে এই প্রজেক্ট গড়ে তোলা হয়েছে। এরই মধ্যে মুন্সি খানপুর, লাউড়ি, সুন্দলপুর ও জামলা—এই চার গ্রামের ১০ হাজার গাছের গোড়ায় চুইঝালের চারা রোপণ শেষ হয়েছে। প্রজেক্টের বাকি তিনটি গ্রাম তেঘরি, ধলিগাতি ও গোবিন্দপুরে চারা রোপণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। সবুজ জানান, কয়েক জন বন্ধুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে ইতিবাচক সাড়া পান। এরপর ২০২০ সালের ১ জুন ১৩ জন মিলে খানপুর চুইঝাল প্রজেক্ট গঠন করেন। বর্তমানে দুই ইউনিয়নের সাত গ্রামে এর সদস্য সংখ্যা এখন ৭০০। তিন বছর পর চুইঝাল বিক্রির পর তারা প্রাপ্ত অর্থের ৩০ শতাংশ পাবেন। জমির মালিক পাবেন ৩০ শতাংশ। মূূূল বিনিয়োগকারি হিসেবে তিনি নেবেন ৩০ শতাংশ। বাকি ১০ শতাংশ অর্থ প্রজেক্টের প থেকে কল্যাণ মূলক কাজে ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। সবুজ জানান, আমরা এমন ভাবে এগোচ্ছি যে আগামি ছয় বছর পর এই সাত গ্রামে যে কয় লাখ গাছ আছে, তার প্রতিটি বেয়ে থাকবে চুই গাছের লতা। কোনো গাছ খালি থাকবে না। প্রজেক্টের সদস্য ওলিয়ার রহমান ছিলেন প্রায় বেকার। সামান্য জমিতে চাষ করে সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন। এখন চুইঝাল প্রকল্পে যুক্ত হয়ে সুদিনের স্বপ্ন দেখছেন। লতা বিক্রির পর আমরা সদস্যরা একেকজন কয়েক লাখ টাকা হাতে পাব। একই আশা প্রজেক্টের আরেক তরুণ সদস্য রাসেল হোসেনের। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে চাকরি করেন। সামান্য বেতনে চলছিল না। তাই চাকরির পাশাপাশি চুঁইঝাল চাষ করছেন। মণিরামপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আবুল হাসান বললেন, মাসুদুর রহমান সবুজ উপজেলার একজন উদ্যোগী তরুণ কৃষক। সবুজের খানপুর চুই প্রজেক্ট ছাড়া দেশে অন্য কোথাও চুইঝাল সমবায় ভিত্তিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে বলে আমার জানা নেই। এমন সমবায় ভিত্তিতে চুই চাষ দেখে অন্য এলাকার বেকার বা কৃষক তরুণ-যুবকরাও এতে উৎসাহী হবেন।















