কালীগঞ্জে কৃষকের স্বপ্ন পানির নিচে

0
250

মিশন আলী,স্টাফ রিপোটার,কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) ॥ কিছুদিন আগের অসময়ের বৃষ্টিতে পঁচে গলে নষ্ট হয়েছিল আমনের আগাম ধান। আবার চলমান নিম্নচাপের বৃষ্টিতে নাবি ক্ষেতও আজ পানির নিচে। ক্ষতির সম্মুখীন। প্রকৃতির এমন খামখেয়ালীতে এ বছরের আমন চাষীরা হয়েছেন চরম ক্ষতিগ্রস্থ। যা কাটিয়ে উঠতে কৃষকদের অনেক সময় লেগে যাবে।
কৃষি অফিস বলছে,এ বছরের বৈরি আবহাওয়ায় বৃষ্টিতে আগাম আমনে চোট খেয়েছিল কৃষক। নাবিতেও সেই বৈরি আবহাওয়া চোখ রাঙাচ্ছে। তবে শেষ মুহুর্তের এ সময়ে এসে যদি আগামী দুই একদিনের মধ্যে বৃষ্টি কেটে যায় তাহলে খুব বেশি ক্ষতি হবে না। এর আগে আগাম ধানে বেশ ক্ষতি হলেও কৃষকেরা তা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠেছিলেন। চলমান ক্ষতি আর কাটিয়ে ওঠার নয়। তবে কৃষকেরা বলছেন, এ আমন মৌসুমে আমরা দেখলাম প্রকৃতির র্নিমমতা। তা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার শুরু হয়েছে ধানের উপরের বুষ্টির নির্মমতা। গত তিনদিন ধরে বৃষ্টির ফোটা বন্ধই হচ্ছেনা। এমন অবস্থায় মাঠের সব ধান পানিতে ভাসছে। আবার নিচু ক্ষেতগুলোতে পানির গভীরতা অনেক বেশি। এমন অবস্থায় বৃষ্টি বন্ধ না হলে এবছরের আমন নিয়ে কৃষকদের আশার গুড়ে বালি। নিম্নচাপের প্রভাবে গত ৩ দিন ধরে লাগাতর বৃষ্টি হচ্ছে। প্রথম দিন সকালে ছিটেছাটা বৃষ্টি শুরু হলেও রাতে হয়েছে মুষলধারে। এতেই এ উপজেলার সকল আমনের মাঠ পানিতে ভাসছে। সেই সাথে ভাসছে আমনের নাবী ধানও। প্রথম দিন শনিবার সকালে সরেজমিনে ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের বিভিন্ন মাঠে গেলে দেখা যায়,মাঠের পর মাঠে আমন ধান ক্ষেতেই পড়ে ভিজছে। তারমধ্যে কোনটি ক্ষেতে ছড়ানো,কোনটি আটি বাধা,আবার কোনটি না বাধা ধান জমিতে ছড়ানো ছেটানো। এগুলোর ওপর দিয়ে গত ৩ দিনে বয়ে যাচ্ছে লাগাতর বৃষ্টি। এর প্রভাবে সব মাঠের ধানক্ষেত এখন পানির নিচে। কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসসূত্রে জানাগেছে, চলতি আমন মৌসুমে এ উপজেলার ধানচাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৫’শ হেক্টোর। কিন্ত চাষ হয়েছে ১৮ হাজার ৭’শ ৫০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২’শ ৫০ হেক্টর বেশি জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এরমধ্যে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ জমির ধান কৃষকেরা ঘরে তুলতে পেরেছেন। বাকি ধানের ১০ ভাগ মত বাড়িতে এনে পালা দিয়ে রেখেছেন আর গুলো ক্ষেতেই পড়ে ভিজছে। একাধিক কৃষক জানান, চলতি আমন মৌসুমের ধানে কোন ধরনের কীটপতঙ্গের আক্রমন ছিল না। ইতোমধ্যে যে ধানগুলো মাড়াই করা হয়েছে ফলনও হয়েছে লোভনীয়। ফলে ক্ষেতের ধান কৃষকদেরকে স্বপ্ন দেখাচ্ছিল। কিন্ত পরপর দ’ুদফার নিম্নচাপের বৃষ্টিতে কৃষকের আমন ধানে অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে।
তারা আরও জানান,গত বছর এমন সময়ে ঝড়োবৃষ্টিতে ধানের মহা সর্বনাশ হয়েছিল। এ বছরও প্রকৃতির সেই কালো থাবায় জর্জরিত হতে বসেছে কৃষকেরা। এমন অবস্থায় বৃষ্টি থেমে গেলেও ধান বাঁচাতে শুরু হবে শ্রমিক নিয়ে কাড়াকাড়ি। অপেক্ষাকৃত বেশি মুজুরী হাঁকিয়ে প্রতিযোগীতার ভিত্তিতে কৃষি শ্রমিক আয়ত্বে নিতে হবে। সে ক্ষেত্রেও উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এখন তাদেও ভাবনা কতদিন চলবে এ বেরসিক বৃষ্টি, সে সময় পর্যন্ত ধানের কি পরিমান ক্ষতি হবে, পরে সহজেই শ্রমিক মিলবে কিনা আমন নিয়ে এমন নানা ভাবনায় আছেন তারা।
কালীগঞ্জ উপজেলার খেদাপাড়া গ্রামের কৃষক সাধন কুমার ঘোষ জানান, প্রথম যখন আগাম আমন ধান কেটেছিলাম তখনও বৃষ্টিতে ধান কলিয়ে ক্ষেতেই নষ্ট হয়েছিল। আবার নাবি ধান কেটেছি এর পরের দিন থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সকালে দেখলাম ক্ষেতে কেটে ফেলিয়ে রাখা ধান পানিতে একাকার হয়ে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি বৃষ্টি না থামলে ক্ষেতেই পঁচে নষ্ট হবে। উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের মিজানুর রহমান জানান, এ বছর ৫ বিঘা জমিতে আমনের চাষ করেছিলাম। আগে ২ বিঘা জমির ধান বাড়িতে এনে মাড়াই শেষ করেছি। বেশ ভালো ফলন হয়েছে। মাঠে আরও যে ক্ষেতগুলো রয়েছে সে গুলোর ধান আরও বেশি ভালো ছিল। তার মধ্যে গতকাল গরুর গাড়িতে করে একবিঘা জমির ধান তড়িঘড়ি মাঠ থেকে বাড়ি এনেছি ঠিকই কিন্ত শ্রমিক না পাওয়ায় নিজের ব্যস্ততায় পালা দিতে পারিনি। এরমধ্যে লাগাতর বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সারা মাঠের ধান এখন পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে।
বেলাট সাদিকপুর গ্রামের কৃষক রেজাউল ইসলাম জানান, এ বছর আমন নিয়ে ঝামেলা যেন পিছু ছাড়ছে না। কয়েকদিন আগে নিম্নচাপে ক্ষেতের ধান পঁচেছে। আবার শুরু হয়েছে নিম্নচাপের প্রভাবে লাগাতর বৃষ্টি। এটা কেটে গেলেও কৃষকের আমন নিয়ে ভোগান্তি যেন কোন ভাবেই কাটছে না। তিনি আরও বলেন, এ বছর সাড়ে ১২ বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছিলাম। এজন্য সারা আমন মৌসুম পরিচর্যায় টাকা ব্যয় করেছি। ক্ষেতে ধান হয়েছিল ছিল বেশ। কিন্ত ব্যাপক ক্ষতি হয়ে গেলো। এমনিতে শীতের হিমশীতল আবহাওয়া এরমধ্যে বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করাও যাচ্ছে না। আর সে কারনেই কৃষি শ্রমিক ঠিকমত পাওয়া যাবে না। বৃষ্টি বন্ধ হলে হয়তো কিছু ধান পাওয়া যাবে তবে কৃষি শ্রমিকের দিতে হবে কয়েকগুন বেশি টাকা। সে কারনে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। এক কথায় এ মৌসুমের আমনে কৃষকদের লোকসানই হবে। কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার মোহায়মেন আক্তার জানান, চলতি বৈরি আবহাওয়ায় শেষ মুহুর্তের আমনের ব্যাপক ক্ষতি হলো। যে ক্ষতি পুশিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here