জেলা আওয়ামী যুবলীগ কমিটি গঠন/ যশোরে চলছে সভাপতি সম্পাদক হওয়ার দৌড়

0
748

মালিকুজ্জামান কাকা : যশোরে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কমিটি গঠন নিয়ে শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা। কে কাকে ডিঙিয়ে শীর্ষ পদ দখল করবে তার প্রচেষ্টায় লিপ্ত অন্তত: অর্ধশত নেতা-কর্মী। কেউ যশোর-৩ আসনের এমপি’র মদদ পুষ্ঠ হিসাবে পদ চাইছেন আর কেউ কাঁঠালতলার মদদ পুষ্ট হয়ে জেলার শীর্ষ যুবলীগ পদের দাবিদার হয়ে ঢাকার রাজনীতির মাঠ চষছেন। আবার কেউ স্থানীয় লবিং গ্রুপিং ঠিক রেখে খুলনা গোপালগঞ্জের সমর্থনপুষ্ঠ হয়ে জেলা যুবলীগের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হতে চান। এরা এসব পদপ্রার্থী যুবলীগ নেতারা ম্যারাথন এ্যাথলেট বেশে এখন যুবলীগের নেতার দৌড়ের রেসে রয়েছেন। সম্মেলন না হওয়ার প্রবল সম্ভাবনায় কেন্দ্র থেকে কমিটি পাশের প্রচেষ্টায় পদপ্রার্থীরা ঘন ঘন রাজধানী যাতায়াত করছেন। আগামী ২৩ জানুয়ারি যশোর জেলা যুবলীগের সম্মেলন- এটা বর্ধিত সভায় সর্ব ঐক্যের দিন ক্ষণ। পূর্নাঙ্গ জেলা কমিটি এদিন গঠন করা হবে, এমন আশায় বুঁক বাঁধে যুবলীগের নেতা-কর্মীরা। কিন্ত বিধি বাম। করোনার ঢেউ আরো একবার বাংলার আকাশ ও জমিন কাঁপাচ্ছে। এ কারনে যশোরে যুবলীগের সম্মেলন হচ্ছেনা এক প্রকার নিশ্চিত হয়েছে। এখন জেলা কমিটির পদের জন্য বেশির ভাগ পদের দাবিদার নেতা সদলবলে রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করছেন। সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক দুটি পদের জন্য প্রার্থী এখন ২০। যশোর পৌরসভার সাবেক মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, সৈয়দ মেহেদী হাসান, সৈয়দ সামস উদ্দীন টগর, মঈনুদ্দীন মিঠু, শফিকুল ইসলাম জুয়েল, যশোর সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বিপুল, দেবাশীষ, কাউন্সিলর হাজী আলমগীর কবির সুমন, আরিফুল ইসলাম রিয়াদ, তৌহিদ চাকলাদার ফন্টু, কাউন্সিলর জাহিদুল ইসলাম মিলন ছাড়াও মনিরামপুর, ঝিকরগাছা, চৌগাছা ও শার্শার অনেকে রয়েছেন পদের দৌড়ে। পুরাতনদের মধ্যে পদ পেতে চেষ্টা করছেন সৈয়দ শামস উদ্দীন টগর, সৈয়দ মেহেদী হাসান, আরো রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক দেবাশীষ রায় যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রওশন ইকবাল শাহী, সদর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম প্রমুখ। এরা বার বার রাজধানী ঢাকায় যাচ্ছেন আর থাকছেন। লবিং গ্রুপিং করছেন কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা ও আওয়ামীলীগের শীর্ষ স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সাথে। কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় আবার খুলনার এমপি শেখ জুয়েল, বাগেরহাটের এমপি শেখ হেলালের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। এসব প্রতিযোগী যুবলীগ নেতারা কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করছেন আর প্রতিপক্ষের যাবতীয় আমলনামা নেতৃবৃন্দের কাছে পেশ করছেন। বলাই বাহুল্য এসব আমলনামায় রয়েছে সমালোচনার কাড়ি কাড়ি খৈ-মুড়ি। সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক পদের জন্য কেন্দ্রে তদবির চালাচ্ছেন অন্তত ১৪ জন নেতা। এদের মধ্যে জেলা যুবলীগের সিনিয়র সহসভাপতি সৈয়দ মুনির হোসেন টগর, সহসভাপতি সৈয়দ মেহেদী হাসান, সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, সাংগঠনিক সম্পাদক মঈন উদ্দিন মিঠুসহ ১০ নেতা। এদিকে সাধারণ সম্পাদক হতে চাচ্ছেন জেলা যুবলীগের প্রচার সম্পাদক জাহিদ হোসেন মিলন, সদস্য জাহিদুর রহমান লাবু, শহর যুবলীগের সাবেক সভাপতি মোস্তফা কামাল পর্বত, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আরিফুল ইসলাম রিয়াদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বিপুল, সাবেক সভাপতি রওশন ইকবাল শাহী, সাবেক সহসভাপতি ফয়সাল খান, সাবেক সহসভাপতি আলি মোর্ত্তূজা রিফাতসহ ৩২ জন নেতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা যুবলীগের কয়েক পরিচিত জন বললেন, এখন আর যশোরে এসে কেন্দ্রীয় নেতাদের স্থানীয় যুবলীগের আমলনামা দেখতে হচ্ছেনা। ঢাকায় বসেই তারা তা জেনে যাচ্ছে। কোন কোন কেন্দ্রীয় নেতা এসব আমলনামা জানছে আর শোনা জানার জন্য ডাক্তারের মতই ভিজিট ফি নিচ্ছে। তবে এই ফি ২/১ হাজার নয় মোটেও। আর নানা ফলজ রসদ ভেট রয়েছে তাদের জন্য। কেউ কেউ অর্থ ঢেলে নেতাগিরি প্রাপ্তির আশায় কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করছেন। নিজেকে এড়িয়ে এরা অন্য প্রতিযোগীর দীর্ঘ এক সমালোচনা পত্র কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে পেশ করছেন। কেউ আশ্বাস গ্রীন কার্ড পাচ্ছেন আবার কেউ ক্রিকেট আম্পায়ারের কাছে আবেদন করেও সাড়া পাচ্ছেননা একেবারেই। তবে লাল কার্ড পাওয়ার আতঙ্কে এরা আবার চরম ফাউল করতেও ভয় পাচ্ছেন। একজন রাজধানী গেছেন এমন খবর মেলার পর আরো অনেকেই ঢাকায় রওনা হচ্ছেন এক মুহুর্ত কাল ক্ষেপণ যশোরে না করে। এদের কাছে রাজধানী এখন সোনায় সোহাগা এক তীর্থ স্থান জন্মভূমি যশোর নয়। যশোরের পরিচিত এক যুবলীগ মুখ বললেন, খেজুর রস, খেজুর গুড় আর পাটালী আমরা এখনো ঠিকমতো খেতে পারিনি। তবে ঢাকায় নেতারা তা এতটা পেয়েছেন যে, নিকটে তাদের আর গুড় পাটালীর প্রয়োজন পড়বেনা। তাদের বাড়ির শিশু বিশুদের মিষ্টির তেষ্টাও এবার মিটবে। ঐ নেতা বলেন, কাজের কাজ রাজনীতি মোটে করার লোক খুজে পাওয়া কষ্টকর অথচ ঢাকায় এখন যুবলীগ নেতাদের পাল পাল চলাচল। এটা রাজনীতির জন্য খুব ভালো কথা নয়। জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ ও যুবলীগ নেতাদের অতি প্রিয় ও গ্রহনযোগ্য এক নাম। মঈনুদ্দীন মিঠু যশোর-৩ আসনের এমপি কাজী নাবিল আহমেদের অতি আস্থাভাজন। এমপির ত্রাণ বিতরণসহ দলীয় অন্যান্য কার্য্যক্রমে তার বলিষ্ঠ উপস্থিতি চোখে পড়ার মত। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, যুবলীগ নেতা শফিকুল ইসলাম জুয়েল করোনায় মানুষ সেবায় ছিলেন উজ্জ্বল এক নাম। মৃতদের দাফন কাফন, রোগগ্রস্থদের চিকিৎসা সেবাসহ বিভিন্ন কার্য্যক্রমে তার নামটি প্রশংসা আকারে উচ্চারিত হচ্ছে। যুবলীগেও তার সুনাম স্পষ্ট। বিরোধী দল থাকা অবস্থায় দলের ক্রাইসিস মুহুর্তে তিনি রাজপথে ছিলেন উজ্বল। তার সামাজিক সেবা মূলক কর্মকান্ডও যুবলীগের ভাবমূর্তি বাড়িয়েছে বলে তার অনুসারিরা মনে করছেন। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক, ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বিপুল করোনা কালীন ত্রাণ বিতরণে আর এক সেবক হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। এই তরুণ নিয়মিত যুবলীগের ব্যানারে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজনে নজর কেড়েছেন। এই দুই যুবলীগ নেতা জুয়েল ও বিপুল গাছের চারা রোপণ করেও নজর কেড়েছেন মানুষের। বিশেষ করে বজ্র নিরোধক তাল গাছের চারা রোপণ ছিল সময়ের প্রয়োজনে বিশেষ কিছু। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম জুয়েল জানান, আওয়ামীলীগে থাকায় তৎকালীন বিএনপির শাসকরা তাকে বহু মামলা হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিনত করে। তবে তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও সমাজসেবায় তিনি যশোর জেলা যুবলীগের সাধারন সম্পাদক পেতে পরম আশাবাদি। করোনায় যখন মানুষ দিশেহারা তখন তিনি জীবনের মায়া ভূলে তাদের পাশে দাড়িয়ে সেবা দিয়েছেন। নিজে ও তার টিম মৃতদের দাফন কাফন করেছেন সকল ভয় ভূলে। টিকা রেজিস্ট্রেশন করেছেন স্ব-উদ্যেগে। যুবলীগ কর্মী হিসেবেও তিনি রাজপথে ছিলেন সদা উজ্বল। এগুলো কেন্দ্র যথাযথ মূল্যায়ন করবে বলে তিনি আশাবাদি। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক, সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বিপুল বলেন সাধারন সম্পাদক পদ পেতে তিনি আশাবাদি। ছাত্রলীগে তার রাজনীতির জৌলুষ নিশ্চয় নীতি নির্ধারকরা বিচার করবেন। করোনা ক্রাইসিসে তিনি সদা রাজপথে গনমানুষের পাশেই ছিলেন। ছাত্রলীগকে তিনি যশোরে বলিষ্ঠ একটি সংগঠনে পরিনত করেছেন। বঞ্চিত দলীয় নেতা-কর্মীরা তার সহমর্মিতায় আপ্লুত। যুবলীগের ইমেজ বাড়াতেও তিনি দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজনে ছিলেন অন্যদের থেকে এগিয়ে। এগুলো তার পদ প্রাপ্তির পজিটিভ দিক। হাজী আলমগীর কবির সুমন বলেন, তিনি যুবলীগের সাধারন সম্পাদক পদ পেতে আগ্রহী। তবে দলে যোগ্য প্রার্থী সকলেই। সকল পদপ্রার্থী রাজনৈতিক সামাজিক কর্মকান্ডে মানুষের সেবক। এদের মধ্যে তিনি করোনায় মানুষের সেবায় ছিলেন দিনরাত। এসব বিবেচনা করে তাকে কাঙ্খিত পদ দেওয়া হবে বলেও তিনি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। গত ২০০৩ সালের ১৯ জুলাই যশোর জেলা যুবলীগের সম্মেলন হয়। এতে বর্তমান যশোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা ফরিদ আহম্মেদ চৌধুরীকে সভাপতি ও জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টুকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা যুবলীগের কমিটি হয়। ৫৩ সদস্যের এই কমিটির মেয়াদ ২০০৬ সালে শেষ হয়। নুতন নেতৃত্বে আগ্রহীরা ইতিমধ্যে পদ প্রত্যাশায় নিজেদের জীবন বৃত্তান্ত কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দিয়েছেন। যাদের বেশির ভাগই সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। জনমনে প্রশ্ন কে হচ্ছেন যশোর জেলা যুবলীগের সভাপতি সম্পাদক। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর যশোর জেলা যুবলীগের কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়ে ১ জানুয়ারি যুবলীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ স্বারিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ৩ থেকে ৬ জানুয়ারির মধ্যে যুবলীগের প্রধান কার্যলয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও সর্বশেষ শিা সনদের ফটোকপিসহ জীবন বৃত্তান্ত জমা দিতে বলা হয়। খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক দায়িত্ব প্রাপ্ত কেন্দ্রীয় যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুব্রত পাল জানান, তৃনমূলের ইউনিটগুলোর দাবির ভিত্তিতে বর্ধিত সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল। ২৩ জানুয়ারি সম্মেলন হবে কিনা, সেটি এখনো অনিশ্চিত। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই করবেন। রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় যুবলীগের একটি সূত্র জানায়, এবার যশোর জেলা যুবলীগ কমিটি গঠন হবে সম্পূর্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ায়। যতই লবিং গ্রুপিং করা হোক না কেন পদ দেওয়া হবে বেছে বেচে প্রকৃত যোগ্যজনকে। একটি ছোট্ট তালিকা রয়েছে কেন্দ্রের হাতে। সেই তালিকায় সভাপতি- সাধারন সম্পাদকের জন্য মাত্র কয়েকটি নাম স্পষ্ট তালিকাভূক্ত আছে। কোন সুপারিশ গ্রহনের ক্ষেত্রেও তার যোগ্যতা বিবেচনায় পর্যালোচনার পরেই কেবল নামটি গ্রহনযোগ্য হবে। সংক্ষিপ্ত তালিকার কয়েকটি নাম হচ্ছে জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, মঈনুদ্দীন মিঠু, শফিকুল ইসলাম জুয়েল, আনোয়ার হোসেন বিপুল, হাজী আলমগীর কবির সুমন ও তৌহিদ চাকলাদার ফন্টু। এর বাইরে আরো কয়েকটি নাম আলোচনার টেবিলে ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে শিঁকে ছিড়বে কার ভাগ্যে তা এখনি নিশ্চিত নয়। সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকের রেসের দুই নাম জেলা কমিটি গঠনের আগে একেবারেই প্রকাশ হচ্ছেনা তা বলাই বাহুল্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here