রাসেল মাহমুদ ॥ বাঁশ শিল্প বাঙালি সংস্কৃতির একটি বড় অংশ। আদিকাল থেকেই বাঁশ ও বেঁতের তৈরি ঘরের কাজের যোগ্য বিভিন্ন জিনিসপত্র ব্যবহার করে আসছে মানুষ।
একটা সময় বাঁশ ও বেঁতের তৈরিকৃত জিনিসপত্রের কদরও ছিলো বেশ। যশোর সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর ইউনিয়নের চাউলিয়া ঋষিপল্লী জুড়ে বাঁশ শিল্পের দেখা মিললেও এখন আর নেই বললেই চলে। মহামারী করোনা ভাইরাসের অগ্রাসনসহ বিভিন্ন কারণে এঅঞ্চলের দুই শতাধিক হস্তশিল্পীর অধিকাংশই এখন পেশা পাল্টেছে জীবিকার তাগিদে।
যুগের পরিবর্তনে বাঁশ-বেতের তৈরি চাটাই, কুলা, ডালা, চাঙারি, টুকরি বা ঝুঁড়ি, পোলো, ডোল (ধান রাখা পাত্র), চালুনি, মাছ রাখার খালই, হাঁস-মুরগি রাখা খাঁচা, টেপারিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রের বিকল্প হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্য সমগ্রী।
একেত মানব সভ্যতার পরিবর্তন তার উপর মহামারীর ধাক্কা সব মিলিয়ে কোনো মতে টিকে থাকার লড়াইয়ে এঅঞ্চলের হস্তশিল্পীরা। দীর্ঘ সময়ের মহামারী করোনা ভাইরাসের স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও উপকরণের মূল্য বৃদ্ধিসহ প্লাস্টিক পণ্যের সহজলভ্যতায় এঅঞ্চল থেকেও বাঁশ শিল্প এখন বিলুপ্তি প্রায়। বলা চলে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য বাঁশ শিল্পের ঠিকানা এখন স্মৃতির জাদুঘরে। একটা সময় রূপদিয়ার এলাকার চাউলিয়া ঋষিপল্লীর বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকার একমাত্র উৎস ছিলো বাঁশ-বেতের তৈরি গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত হস্তশিল্প পণ্য। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতিদিনই চলতো গ্রামীণ এ পল্লী জুড়ে বাঁশের চটা দিয়ে তৈরি চাটাই বা চাঁচ, কুলা, ডালা, চাঙারি, টুকরি বা ঝুড়ি, চালুনি বা চালন, মাছ রাখার খালই, ঝুড়ি ও হাঁস-মুরগির খাঁচাসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির প্রতিযোগিতা। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এ কাজে সামিল হতো কাঁধেকাঁধ রেখে। প্রত্যেহ সপ্তাহের হাটবার গুলোতে আশপাশের অঞ্চলের স্থানীয় বাজারে পশরা সাজিয়ে চলাতো গভীর রাত পর্যন্ত বেঁচাবিক্রি। অনেকেই আবার বিভিন্ন অঞ্চলের বাড়ি বাড়ি যেয়ে ফেরি করে বিক্রয় করতো নিজেদের তৈরি বাঁশ-বেতের এসব প্রয়োজনীয় পণ্য। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এ শিল্পের মূল উপকরণ বাঁশের মূল্য বৃদ্ধিতে বাঁশ-বেতের কারিগররা তাদের পেশা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বলে জানান। ফলে বেকার হয়ে পড়েছে গ্রামীণ এ বাঁশ-বেঁতের অধিকাংশ কারিগরেরা। বাধ্য হয়ে অনেকেই আবার এ পেশা ছেড়ে চলে গেছে অন্য পেশায়। এক সময় এসব এলাকার বিভিন্ন জনপদে বড় বড় বাঁশ বাগান দেখা গেলেও এখন আর চোখে পড়ে না। এ বাঁশ দিয়েই বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতো তারা। নির্বিচারে বাঁশ কড়ল ধ্বংসের কারণে বাঁশের বংশ বিস্তার কমেছে বহু গুণে।
চাউলিয়া দাসপাড়ার কার্তিক চন্দ্র দাস দৈনিক যশোর’কে বলেন, ‘বাঁশের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র মানুষ এখন আর আগের মতো ব্যবহার করে না। কারণ বর্তমানে প্লাস্টিকের তৈরি পণ্যের উপর ঝুঁকছে এখনকার মানুষ। ফলে এ শিল্পটি চিরতরে হারিয়ে যেতে বসেছে। বাঁশ-বেঁত শিল্পের দুর্দিন কাটিয়ে সুদিন ফিরিয়ে আনতে সরকারি কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। বাঁশ-বেঁতে তৈরি জিনিষের স্থানীয় পাইকারী ক্রেতা আনন্দ দাস বলেন, ‘একটা সময় এ অঞ্চলের প্রতিটা বাড়িতেই বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের ব্যবহার ছিল। চাহিদাও ছিল ব্যাপক। বর্তমান প্লাস্টিক পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প’টি। এলাকার বাঁশ শিল্পের কারিগর প্রভাষ দাস, কালাচান দাস ও জগদীশ দাস বলেন, ‘কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় আমরা এখন অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছি। শত প্রতিকূলতার মধ্যে পুরোনো পেশা ধরে রাখতে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করছি। কিন্তু প্রয়োজনীয় পুঁজি আর উপকরণের অভাবে সে প্রচেষ্টা থমকে গেছে। আমরা সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার ঋণ সহায়তা ব্যাবস্থা কামনা করছি।”
Home
যশোর স্পেশাল যুগের পরিবর্তনে চাহিদা নেই বাঁশ ও বেঁতের তৈরি জিনিষপত্রের জীবন-জীবিকার লড়াইয়ে যশোরের...















