মালিকুজ্জামান কাকা, যশোর : বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ এ ভূষিত হয়েছেন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার কৃতি সন্তান কবি হোসেনউদ্দীন হোসেন। অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে পুরস্কার তুলে দিবেন। প্রবন্ধ-গবেষণায় তিনি এ সম্মাননা পাচ্ছেন বলে বাংলা একাডেমির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা গেছে। এ বছর ১১ বিভাগে ১৫ গুণিজনকে পুরস্কার দেয়া হবে। এরা হলেন, কবিতায় আসাদ মান্নান ও বিমল গুহ, কথাসাহিত্যে ঝর্না রহমান ও বিশ্বজিৎ চৌধুরী, প্রবন্ধ বা গবেষণায় হোসেন উদ্দীন হোসেন, অনুবাদে আমিনুর রহমান ও রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, নাটকে সাধনা আহমেদ, শিশুসাহিত্যে রফিকুর রশীদ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় পান্না কায়সার, বঙ্গবন্ধু-বিষয়ক গবেষণায় হারুন-অর-রশিদ, বিজ্ঞান বা কল্পবিজ্ঞান বা পরিবেশ বিজ্ঞানে শুভাগত চৌধুরী, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বা ভ্রমণকাহিনিতে সুফিয়া খাতুন ও হায়দার আকবর খান রনো এবং ফোকলোর বিভাগে আমিনুর রহমান সুলতান। এক নজরে হোসেনউদ্দীন হোসেন: ইতিহাসবিদ, উপন্যাসিক, কবি ও সাংবাদিক হোসেন উদ্দিন হোসেন ১৯৪১ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার পৌর শহর কৃষ্ণনগর ওয়ার্ডে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কপোতাক্ষ নদের অপরুপ দৃশ্য দেখেছেন ছোট থেকেই। তার বাবা মরহুম কলিম উদ্দীন এবং মাতা মরহুম আরিছন নেছা। ১৯৬৩ সালে উপজেলার লাউজানী লীপুর গ্রামের মেয়ে হাসিনা আক্তারের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন হোসেন উদ্দীন। তিনি পারিবারিকভাবে দুই পুত্র এবং দুই কন্যা সন্তানের জনক। শিাজীবন: হোসেনউদ্দিন হোসেনের প্রাথমিক শিার হাতেখড়ি কৃষ্ণনগর পল্লীমঙ্গল সমিতির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মাধ্যমিক শিা গ্রহণ করেন ঝিকরগাছা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি এই বিদ্যালয়ে শিা গ্রহণ করেন। ১৯৫৭ সালে ঢাকা শিাবোর্ডের অধীনে তিনি প্রাইভেট পরীা দিয়ে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৫৯ সালে একই বোর্ড থেকে প্রাইভেট পরীা দিয়ে আইএ পাশ করেন। সাহিত্যকর্ম: প্রচলিত শিা ব্যবস্থার প্রতি তার কোন আস্থা না থাকায় একাডেমিক শিা তিনি এখানেই শেষ করেন। শৈশবকাল থেকে হোসেনউদ্দীন হোসেন কবিতা লিখতে শুরু করেন। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি একটি হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করেন। তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে কোলকাতার দৈনিক লোকসেবক পত্রিকায় ছোটদের বিভাগে। এরপর পর্যায়ক্রমে কোলকাতা ও ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত তার গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে। পত্রিকাগুলোর মধ্যে রয়েছে দৈনিক লোকসেবক, দৈনিক বাংলা, দৈনিক জনতা, দৈনিক সত্যযুগ, চাঁদের হাট, সংবাদ, কালের পাতা, সমকাল, ইত্তেফাক, জনকন্ঠ, ভোরের কাগজ, যুগান্তর, আজকের কাগজ, নয়াদিগন্ত, মাসিক সাহেন, মাসিক পূবালি, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ভারত বিচিত্রা, শৈলী, কলকাতা থেকে প্রকাশিত নন্দন, ক্রান্তি, কোরক, গ্রন্থসাথী, রাজশাহী থেকে প্রকাশিত চিহ্ন, নন্দন, গল্পকথা, শাশ্ববিধী, বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত উত্তরাধিকারসহ বহু পত্রপত্রিকা। হোসেন উদ্দীন হোসেনের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৭টি। এগুলো হলো যশোরাদ্যদেশ (১৯৭৪), যশোর জেলার কিংবদন্তী (১৯৭৪)- ১ম খন্ড, যশোর জেলার কিংবদন্তী (১৯৭৯)- ২য় খন্ড, অমৃত বৈদেশিক (১৯৭৫), ভলতেয়ার ফবেয়ার কলসত্ব ত্রয়ী উপন্যাস ও যুগমানস (১৯৮৮), ঐতিহ্য আধুনিকতা ও আহসান হাবীব (১৯৯৪), বাংলার বিদ্রোহ (২০০৩) ১ম খন্ড, বাংলার বিদ্রোহ (২০০৬) ২য় খন্ড, নষ্ট মানুষ উপন্যাস (১৯৭৪), প্লাবন এবং একজন উপন্যাস (১৯৭৯), সাধুহাটির লোকজন উপন্যাস (২০০১), ইঁদুর ও মানুষেরা উপন্যাস (২০০৮), সোনালি জলের কাঁকড়া উপন্যাস (২০১১), ঋখঙঙউ অঘউ অ ঘঙঙঐ উপন্যাস (২০০৫), সমাজ সাহিত্য দর্শণ প্রবন্ধ (২০১০), রণেেত্র সারাবেলা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি (২০১২), লোকলোকোত্তর গাঁথা কিংবদন্তী (২০১২), উনাশির শ্রেষ্ঠ গল্প সম্পাদনা (১৯৭৯) এবং মরাল সম্পাদনা (২০০৮ সাল থেকে প্রকাশিত হচ্ছে)।
সম্মাননা ও সাহিত্য পুরস্কার: লেখালেখিতে হোসেন উদ্দীন হোসেনের ঝুঁলিতে জমেছে অনেক পদক। চাঁদের হাট পদক-১৯৯০, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্মৃতি পদক-১৯৯৬, বিজয় দিবস পদক-১৯৯৭, মাইকেল মধুসূদন একাডেমী পদক-২০০১, কোলকাতা বিধান নগর (সল্টলেক) মেলা পদক-২০০৪, কন্ঠশীলন সম্মাননা পদক-২০০৬, গুনীজন সম্মাননা পদক- ২০০৬, এম,এল হাই স্কুল সম্মাননা পদক-২০০৬, ক্যামব্রিজ স্বর্ণপদক (ইংল্যান্ড)- ২০০৬, কপোতা সম্মাননা পদক-২০০৭, আয়েসা জব্বার সম্মাননা পদক-২০০৭, বিবর্তন আজীবন সম্মাননা পদক-(ঢাকা) ২০১০, বইমেলা সম্মাননা পদক-(যশোর ইনস্টিটিউট) ২০১০, বইমেলা সম্মাননা পদক- (মনিরামপুর) ২০০৮, সাতীরা জেলা প্রশাসক সম্মাননা পদক- ২০১০, শিমুল পলাশ সম্মাননা পদক- (কলকাতা) ২০০৩, লিটল ম্যাগাজিন সম্মাননা পদক- (কলকাতা) ২০০৩। ২০০৬ সালে হোসেনউদ্দীন হোসেনকে ক্যামব্রিজ, ইংল্যান্ড থেকে ঞড়ঢ়-১০০ ৎিরঃবৎং হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। কোলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১০ সালে বাংলা বিভাগে হোসেনউদ্দীন হোসেনের ইঁদুর ও মানুষেরা উপন্যাসটি এমএ কাসে পড়ানো হয়। পেশাগত জীবন: হোসেন উদ্দীন হোসেন ৬০ দশকে সাংবাদিকতা পেশা গ্রহণ করেন। দৈনিক সংবাদে কিছুকাল কাজ করেছেন। এক বছর পর এই পেশা থেকে সরে সাহিত্য সেবায় যুক্ত হন। তিনি ১৯৬৮ সালে যশোর থেকে প্রকাশিত পাকি নতুন দেশ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। এই পত্রিকাটি ১৯৭১ সালের ২০ মার্চ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল।
যুদ্ধে অংশগ্রহণ: ১৯৬৫ সালে হিন্দুস্তান পাকিস্তান যুদ্ধে হোসেন উদ্দীন হোসেন স্বেচ্ছায় অংশ গ্রহণ করেন। তিনি এই সময় যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার জন্য পাকিস্থান সেনাবাহিনীতে গেরিলা প্রশিণ নেন। তাকে যুদ্ধের মধ্যে ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত করা হয়। ১৯৬৭ সালে তিনি স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনী থেকে ফিরে আসেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং কয়েকটি সফল অভিযানে নেতৃত্ব দেন।















