মেজর সিনহা হত্যা মামলার রায় ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতের ফাঁসি

0
319

মালিকুজ্জামান কাকা, যশোর : কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত যশোরের সন্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় রায় দিয়েছেন আদালত। বহুল আলোচিত মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় দুজনের মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন বিজ্ঞ আদালত। একই রায়ে হত্যায় সহযোগিতা করায় ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ দিয়েছেন বিজ্ঞ বিচারক। যাবজ্জীবন দন্ড প্রাপ্তরা হলেন প্রদীপের দেহরী রুবেল শর্মা, বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের বরখাস্ত উপ-পরিদর্শক (এসআই) নন্দ দুলাল রতি ও বরখাস্ত কনস্টেবল সাগর দেব এবং টেকনাফ থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলার সাী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন। এছাড়া রায়ে বাকি সাতজনকে বেকসুর খালাস দেন আদালতের বিচারক। অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় বিচারক সাতজন আসামীকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন। খালাস প্রাপ্তরা হলেন, বরখাস্ত সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, বরখাস্ত কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এপিবিএনের বরখাস্ত উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শাহজাহান, বরখাস্ত কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ। সোমবার (৩১ জানুয়ারি) কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল এ রায় ঘোষণা করেন। সিনহা হত্যা মামলায় প্রদীপ ও লিয়াকতের ফাঁসির আদেশ দেন বিজ্ঞ বিচারক। মেজর (অব.) সিনহা েেমা. রাশেদ খান হত্যা মামলায় সম্পৃক্ততা প্রমাণ পাওয়ায় বিতর্কিত ওসি (বরখাস্ত) প্রদীপ কুমার ও লিয়াকত আলীর মৃত্যু দন্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। এদিন বিকেলে ৩০০ পৃষ্ঠার রায় পাঠকালে তাদের দুজনের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করেন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাঈল। দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে এজলাসে এসে আদালতের কার্যক্রম শুরুর পর মামলা সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক আলোচনা করেন বিচারক। এরপর শুরু করেন অপরাধের পর্যবেণ বয়ান। স্যা-প্রমাণে কার কী অপরাধ দাঁড়িয়েছে সেসব তুলে ধরার পর হত্যায় সংশ্লিষ্টতার অপরাধ অনুসারে সাজা ঘোষণাকালে প্রধান দুই অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যু দন্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। এমনটি জানিয়েছে বিচার সংশ্লিষ্ট সূত্র। এর আগে সকালে আদালতে হাজির করা হয় মামলায় অভিযুক্ত বিতর্কিত ওসি (বরখাস্ত) প্রদীপ কুমার ও লিয়াকতসহ ১৫ আসামিকে। আদালতের সরকারি কৌঁসুলি, বাদী পরে আইনজীবী ও আসামি পরে আইনজীবীসহ বাদী ও বিবাদীদের স্বজন এবং সংশ্লিষ্টরা এজলাসে উপস্থিত ছিলেন। রায় কেন্দ্র করে আদালতের চারপাশে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। নির্মম ও আলোচিত হত্যাকান্ডের ১৮ মাসের মাথায় রায় ঘোষণা হয়েছে এদিন। বিচারিক কার্যক্রম শুরু করে মাত্র ৩৩ কার্যদিবসে শেষ হয়েছে মামলাটির পরবর্তী কাজ। কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত সৃষ্টির ৩৮ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম এত দ্রুত কোনো হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হচ্ছে। এর আগে হত্যা কিংবা ফৌজদারি কোনো মামলায় এত বিপুল সংখ্যক সাী নেওয়ার নজির নেই। তেমনটি নজির নেই এত স্বল্প সময়ে চার্জগঠন, শুনানি, স্যাগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের। সিনহা হত্যা মামলার রায়ের আগেই সবকিছুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সোমবার সকাল থেকেই পুরো আদালত পাড়ায় কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আদালত পাড়ার চারপাশে ও পয়েন্টে পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে নিরাপত্তাকর্মী। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা বিভাগের লোকজন কয়েক স্তরের নিñিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই ঈদুল আজহার আগের রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিনড্রাইভ সড়কের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এপিবিএন চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর সিনহা। হত্যাকান্ডের চারদিন পর ৫ আগস্ট সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে কক্সবাজার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিমের আদালতে হত্যা মামলা করেন। মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশসহ নয়জনকে আসামি করা হয়। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে। ওসি (বরখাস্ত) প্রদীপ কুমার দাশকে করা হয় দুই নম্বর আসামি। মামলার তিন নম্বর আসামি বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে কর্মরত উপ-পরিদর্শক (এসআই) নন্দ দুলাল রতি। কক্সবাজারের র‌্যাব-১৫ মামলাটির তদন্তভার পায়। ওই বছরের ৭ আগস্ট মামলার আসামি সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তদন্তে নেমে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় তিন বাসিন্দা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্য ও ওসি প্রদীপের দেহরীসহ আরও সাতজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এরপর ২০২১ সালের ২৪ জুন মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি কনস্টেবল সাগর দেবের আদালতে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আলোচিত এই মামলার ১৫ আসামির সবাই আইনের আওতায় আসেন। এ মামলায় চার মাসের বেশি সময় তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ৮৩ জন সাীসহ অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ১৫ জনকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকান্ডকে একটি পরিকল্পিত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ শুনানি, সাীদের জবানবন্দি, জেরা ও আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষে গত ১২ জানুয়ারি রায়ের জন্য ৩১ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছিলেন বিচারক। সোমবার (৩১ জানুয়ারি) আড়াইটার দিকে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল ৩০০ পৃষ্ঠার এ রায় পড়া শুরু করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর নূরুল ইসলাম সায়েম। এর আগে কারাগার থেকে আসামিদেরকে আদালতে আনা হয়। র্দীঘ শুনানি, সাীদের জবানবন্দি, জেরা ও আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষে গত ১২ জানুয়ারি রায়ের জন্য এদিন ধার্য্য করেন বিচারক। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে টেকনাফে দুটি ও রামুতে একটি মামলা করে। ঘটনার পাঁচ দিন পর ৫ আগস্ট কক্সবাজার আদালতে টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ পুলিশের নয় সদস্যের নামে হত্যা মামলা করেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর প্রদীপ কুমার দাশসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও র‌্যাব-১৫ কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মো. খাইরুল ইসলাম। এতে সিনহা হত্যাকান্ড কে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রপরে আইনজীবী ও পিপি ফরিদুল আলম জানিয়েছেন, এ মামলায় আট দফায় ৮৩ সাীর মধ্যে ৬৫ জনের স্যা গ্রহণ ও জেরা করা হয়। এরপর ৯ থেকে ১২ জানুয়ারি মামলায় উভয়পরে আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের েেশষ দিনে আদালত রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। যশোর শহরের কারবালার সন্তান আবেগী সিনহা। তার মৃত্যুতে সঙ্গত কারনেই নাড়া পড়ে এখানকার মানুষের মনে। সকলেই আগ্রহ নিয়ে অধীর অপেক্ষায় ছিলেন রায় শুনতে। সকলেই স্বস্তির দীর্ঘ নি:শ্বাস নিয়েছেন রায় ঘোষনার পর। স্বস্তি একটি অপরাধের যথাযোগ্য শাস্তি ষোষনা আদালত কতৃক রায়ে। আর দীর্ঘ নি:শ্বাস সিনহার করুণ মৃত্যুর জন্য। তার আত্মার জন্য এটি যশোরবাসীর সহমর্মিতা প্রকাশ। যশোরবাসী শান্তির পক্ষে। মানবতার পক্ষে তাদের সমর্থন। খুনের বিপক্ষে তাদের অবস্থান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here