0
381

বঙ্গবন্ধুর চিন্তার পরতে পরতে ছিল দেশপ্রেম আর গণমানুষের প্রতি দরদ
-মোঃ আনোয়ার হোসেন বিপুল
আজ এমন এক ঐতিহাসিক দিন, যে দিনে রাজনৈতিক পূন্যভূমি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি এমন একজন রাজনৈতিক কবি যার মন্ত্রমুগ্ধ আহ্বানে একাত্তরে কোটি কোটি বাঙালি জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন।
তবে এই আকাশসম জনপ্রিয়তা অর্জনে তাকে লড়তে হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। সংগ্রাম করতে হয়েছে স্বৈরাশাসক থেকে কথিত আন্তর্জাতিকতাবাদীদের বিরুদ্ধে। আর সমস্ত লড়াইয়ে শুধু দেশপ্রেম আর গণমানুষের প্রতি ভালবাসার শক্তি দিয়ে তিনি জয়ী হয়েছেন। যা তিনি কারারুদ্ধ অবস্থায় লিপিবদ্ধ করে রাখেন। পরবর্তীতে তার সুযোগ্য কন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত কারাগারে বসে তিনি লেখেন ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। বইটিতে ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর চিন্তার গভীরতা ও তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাল্যকালেই সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবে তিনি মর্মাহত হতেন। অনেক সময় হতাশও হয়েছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে (পৃষ্টা ১০-১১) তিনি লিখেছেন-
‘১৯৩৮ সালের ঘটনা। শেরে বাংলা তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। তাঁরা গোপালগঞ্জে আসবেন। বিরাট সভার আয়োজন করা হয়েছে। এগজিবিশন হবে ঠিক হয়েছে। বাংলার এই দুই নেতা একসাথে গোপালগঞ্জে আসবেন। মুসলমানদের মধ্যে বিরাট আলোড়নের সৃষ্টি হল। স্কুলের ছাত্র আমরা তখন। আগেই বলেছি আমার বয়স একটু বেশি, তাই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করার ভার পড়ল আমার ওপর। আমি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করলাম দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে। পরে দেখা গেল, হিন্দু ছাত্ররা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী থেকে সরে পড়তে লাগল। ব্যাপার কি বুঝতে পারছি না। এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম, সেও ছাত্র, সে আমাকে বলল, কংগ্রেস থেকে নিষেধ করেছে আমাদের যোগদান করতে। যাতে বিরূপ সম্বর্ধনা হয় তারও চেষ্টা করা হবে। এগজিবিশনে যাতে দোকানপাট না বসে তাও বলে দেওয়া হয়েছে। তখনকার দিনে শতকরা আশিটি দোকান হিন্দুদের ছিল। আমি এ খবর শুনে আশ্চর্য হলাম। কারণ, আমার কাছে তখন হিন্দু মুসলমান বলে কোন জিনিস ছিল না। হিন্দু ছেলেদের সাথে আমার খুব বন্ধুত্ব ছিল। একসাথে গান বাজনা, খেলাধূলা, বেড়ানÑসবই চলত।’
বাল্যকালে এমন অভিজ্ঞতার পর পরিণত বয়সেও সাম্প্রদায়িকতার রকমফের দেখে হতাশা প্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি ফরিদপুর জেলখানায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন এভাবে-
‘চন্দ্র ঘোষ স্ট্রেচারে শুয়ে আছেন। দেখে মনে হল, আর বাঁচবেন না, আমাকে দেখে কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, “ভাই, এরা আমাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে বদনাম দিল; শুধু এই আমার দুঃখ মরার সময়! কোনোদিন হিন্দু মুসলমানকে দুই চোখে দেখি নাই। সকলকে আমায় ক্ষমা করে দিতে বোলো। আর তোমার কাছে আমার অনুরোধ রইল, মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখ। মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য ভগবানও করেন নাই। আমার তো কেউ নাই, আপন ভেবে তোমাকেই শেষ দেখা দেখে নিলাম। ভগবান তোমার মঙ্গল করুক।” এমনভাবে কথাগুলো বললেন যে সুপারিনটেনডেন্ট, জেলার সাহেব, ডেপুটি জেলার, ডাক্তার ও গোয়েন্দা কর্মচারী সকলের চোখেই পানি এসে গিয়েছিল। আর আমার চোখেও পানি এসে গিয়েছিল। বললাম, “চিন্তা করবেন না, আমি মানুষকে মানুষ হিসাবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিষ্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ।” আর কথা বলার শক্তি আমার ছিল না।’
এই অসাম্প্রদায়িক মানুষটি, যিনি সংগ্রাম করে খোকা থেকে হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। লাল-সবুজের পতাকা ছিনিয়ে এনে হয়েছেন স্বাধীন দেশের জাতির পিতা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তাঁর সেই স্বদেশে তাঁর আদর্শের বড়ই অভাব। মুখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বললেও অনেকেই আছেন যারা ভেতরে ভেতরে বঙ্গবন্ধু যাকে ঘৃণা করতেন সেই সাম্প্রদায়িক চিন্তাকেই লালন করেন।
বঙ্গবন্ধু বাংলার দুখি মানুষের অর্থনৈতিক দৈন্যতায় ব্যথিত ছিলেন। অর্থনৈতিক শোষণ বন্ধে তার চিন্তাও ছিলো সুস্পষ্ট। তিনি লিখেছেন-
‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যত দিন দুনিয়ায় থাকবে, তত দিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না।’
বইটির ৪৭ ও ৪৮ পৃষ্টায় তিনি বাঙালির চরিত্র ব্যাখ্যা করেছেন। একই সাথে এই নেতিবাচক চিন্তার কারণে আমাদের উন্নতির প্রধান বাঁধা বলে চিহ্নিত করেছেন-
‘আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হল আমরা মুসলমান, আর একটা হল, আমরা বাঙালি। পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোন ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, ‘পরশ্রীকাতরতা’। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে ‘পরশ্রীকাতর’ বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সকল ভাষায় পাবেন, সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই, ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। সুজলা, সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিযায় খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারণ, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে। নিজকে এরা চেনে না, আর যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততদিন এদের মুক্তি আসবে না।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরো লিখেছেন-
‘অনেক সময় দেখা গেছে, একজন অশিতি লোক লম্বা কাপড়, সুন্দর চেহারা, ভাল দাড়ি, সামান্য আরবি ফার্সি বলতে পারে, বাংলাদেশে এসে পীর হয়ে গেছে। বাঙালি হাজার হাজার টাকা তাকে দিয়েছে একটু দোয়া পাওয়ার লোভে। ভাল করে খবর নিয়ে দেখলে দেখা যাবে এ লোকটা কলকাতার কোন ফলের দোকানের কর্মচারী অথবা ডাকাতি বা খুনের মামলার আসামি। অন্ধ কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাসও বাঙালির দুুঃখের আর একটা কারণ।’
ছয় দফার উত্তাল আন্দোলনের মধ্যে ১৯৬৬ সালের ২ জুন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে সরকার। সেই থেকে ১৯৬৭ সালের ২২ জুন পর্যন্ত ছিলেন কেন্দ্রীয় কারাগারে। এছাড়া ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তরীণ ছিলেন কুর্মিটোলা সেনানিবাসের অফিসার মেসে। বঙ্গবন্ধুর এই সময়ের দিনলিপির বিবরণ প্রকাশ হয়েছে ‘কারাগারের রোজনামচা’ নামে।
বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলভিত গড়ে দেয় ৬ দফা আন্দোলন। এই আন্দোলন সফল করতে বঙ্গবন্ধু অসংখ্য সভা-সমাবেশ করেছেন। ফলে এদেশের মানুষ পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে। যার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে জনগণের ওপর নির্মম নির্যাতন শুরু করে সরকার। যার রেস পড়ে কারাগারেও। কারাগারে আটক রেখেও অসংখ্য নেতাকর্মীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্বাতন করা হতো। যার বেশ কিছু বর্ণনা রয়েছে কারাগারের রোজনামচা বইটিতে। তবে এতো নির্বাতনের পরও চীনপন্থী কমিউনিস্টরা পাকিস্তানি সরকারকেই সমর্থন করতে লাগলো। তারা ছয় দফা তো করেননি, উল্টো কৌশলে আইয়ুব সরকারের কর্মকান্ডকে সমর্থন দিলো। ন্যাপ নেতা মশিয়ুর রহমান ছয় দফার আন্দোলনকে রীতিমতো বিচিন্নতাবাদীদের আন্দোলনের সাথে তুলনা করেন। জবাবে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-
‘জনগণ জানে এই দলটির কিছু সংখ্যক নেতা কিভাবে কৌশলে আইয়ুব সরকারের অপকর্মকে সমর্থন করছে। আবার নিজেদের বিরোধী দল হিসেবে দাবি করে এরা জনগণকে ধোঁকা দিতে চেষ্টা করছে। এরা নিজেদের চীনপন্থী বলেও থাকেন। একজন একদেশের নাগরিক কেমন করে অন্য দেশপন্থী, প্রগতিবাদী হয়?’
জাতির পিতার দর্শন অনুযায়ী একজন দেশপ্রেমিক কোনভাবেই অন্যদেশ পন্থী হতে পারেন না। নিজ দেশের জনগণের ওপর যাদের আস্থা আছে, তারা অন্যদেশের মুখাপেক্ষি হতে পারে না। ইতিহাস স্বাক্ষী যারা এমন পরদেশ নির্ভর হয়েছে, শেষ পর্যন্ত তাদের ‘নীলে বিলীন’ হতে হয়েছে। আজও যারা জনগণের স্বার্থবিরোধী বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা রুখতে বিদেশীদের স্মরণাপন্ন হচ্ছে তাদের জন্যও অপেক্ষা করছে করুণ পরিণতি।
লেখক: ভাইস চেয়ারম্যান, সদর উপজেলা পরিষদ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, যশোর জেলা শাখা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here