উচ্চ শিক্ষার গলায় কেনো ফাঁসি?

0
319

সম্প্রতি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চালানো এক গবেষণায় উঠে এসেছে প্রায় ২৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর মাথায় জীবনের কোনো না কোনো আত্মহত্যার চিন্তা এসেছে। উচ্চ শিক্ষার এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত প্রায় ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী চরম দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরতরা যেখানে দেশের ভবিষ্যৎ, সেখানে তাদের উল্লেখযোগ্য অংশের চিন্তাধারা আমাদের জন্য অশনী সংকেত বলা যায়। আত্মহত্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কিছু প্রধান কারণ উল্লেখ করা হলোঃ-
আবেগ প্রবণের ফলে আত্মহত্যাঃ- আবেগ প্রবণ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই সমস্যা বিষেশ করে নবীন শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশি লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া অর্থাৎ চলাফেরা, বন্ধু নির্বাচন, খাবার-দাবার, বা ক্যাম্পাস জীবনের শুরুর দিকে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হলে। সেই সব পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পেরে। কেউ কেউ আবেগ বসত আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এজন্য নবীন শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রবীণ শিক্ষার্থীদের বন্ধুসলভ আচরণ করা প্রয়োজন। যা এই সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থেকে মুক্তি দিতে পারে।
পারিবারিক দূরত্বঃ-কখনো কখনো শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারিবারিক দূরত্বের কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় গুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত। সে কারণে শিক্ষার্থীদের পরিবার ত্যাগ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করতে হয়। এতে করে স্বাভাবিক ভাবে পরিবারের সাথে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে ছেলে মেয়েদের অবাধ চলাফেরার সুযোগ তৈরি হয়। মন খারাপের সময় পরিবারের তেমন পৃষ্ঠপোষকতা পাই না। এতে করে কেউ কেউ এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
র‍্যাগিংঃ- স্কুল, কলেজ শেষ করে একজন শিক্ষার্থী সুনীল স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখে। তাদের পূর্ব শিক্ষা জীবনে র‍্যাগিং নামক নির্মমতার সাথে পরিচিত ছিলো না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার সাথে সাথে তাদের এমন একটি সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যার জন্য তারা মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিলো না। প্রথমত পরিবার থেকে দূরে আর দ্বিতীয়ত নতুন পরিবেশ। এর মাঝে র‍্যাগিং এর নাম করে মানসিক চাপের কারণে ছাত্র ছাত্রীরা আত্মহত্যা করার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।তাই নবীন শিক্ষার্থীদেরকে র‍্যাগিং এর নামে মানসিক চাপ দেওয়া উচিত নয়৷
রাজনৈতিক চাপঃ-গ্রাম থেকে উঠে আসা একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে নানা মুখী চাপের সম্মুখীন হয়। তার মধ্যে অন্যতম একটি চাপ রাজনৈতিক চাপ। শিক্ষার্থীদের হলে উঠার সুযোগ সুবিধা থেকে শুরু করে অন্যান্য বিষয় গুলোর প্রতি কতৃপক্ষের পরিপূর্ণ নজরদারি না থাকাই। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের চাপের মুখে পরতে হয়। এতে করে শিক্ষার্থীদের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। তারা সবসময় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকে। তারা মনোবল হারিয়ে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ে। যার ফলে আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
ভালো বন্ধুর অভাবঃ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভালো বন্ধু নির্বাচন করা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিকে একজন শিক্ষার্থী যেমন বন্ধু নির্বাচন করবে সেটা ভবিষ্যত জীবনে তাকে সে ভাবে প্রভাবিত করবে। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিকে তাড়াহুড়ো করে বন্ধু নির্বাচন করতে গিয়ে ভুল মানুষ কে নির্বাচন করে ফেলে। আর সেই সব সম্পর্কের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে বিপথে পা বাড়ায়। খারাপ মানুষের সাথে পরিচিত হয়ে বিপদগামী হওয়ার পর নিজের ভুল বুঝতে পারে। তখন হীনমন্যতার ভুগে। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
মাদকদ্রব্য সেবনঃ-বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় গুলো মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিনত হয়েছে। এখানে নবীন থেকে প্রবীণ শত শত শিক্ষার্থী মাদকে আসক্ত। মূলত প্রবীণ শিক্ষার্থীদের পৃষ্ঠপোষকতায় নবীন শিক্ষার্থীরা এই মৃত্যু পুরীতে প্রবেশ করে। সেই সব শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের মাদক দ্রব্য গ্রহণ করে থাকে। অনেক সময় অতিরিক্ত মাদক গ্রহণের ফলে তারা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। এমন অবস্থায় আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
প্রেম ব্যর্থতা বা মনোমালিন্যঃ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে সকল কারণে আত্মহত্যা করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো প্রেমে ব্যর্থতা বা মনোমালিন্য। সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যা করা এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর লাশ যখন মা বাবার কাছে পৌঁছাই। তখন শিক্ষার্থীর মা চিৎকার করে বলেছিল, ১ বছরের ভালোবাসা জন্য তুমি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে তাহলে আমাদের ২২ বছরের ভালোবাসা কি মিথ্যাে ছিলো।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই আবেগি প্রেমের কারণে আত্মহত্যা করতে দেখা যায়৷
অর্থনৈতিক চাপঃ- বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। সেই কারণে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু থেকেই আর্থিক চাপের মুখে পরতে হয়। পরিবার থেকে আসতে থাকে নিজের খরচ জোগানোর তাগিদ। এমন সময় শিক্ষার্থীরা পরিবারের কাছে খরচের টাকা চাইতে হীনমন্যতায় ভুগে। যার ফলে শিক্ষার্থীরা মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরে। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
সামাজিক চাপঃ- বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিকে সামাজিক কোনো চাপ না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষের দিকে হাজারো সামাজিক চাপের বোঝা লক্ষ্য করা যায়। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে রাস্তা ঘাট সকল জায়গায় সমালোচনার ঝড় উঠে। এমন কি অনেকে সামনেও আজেবাজে মন্তব্য করে থাকে। এই সব কারণে শিক্ষার্থীরা এলাকায় যেতেও হীনমন্যতায় ভোগে। এইসব ঘটনা গ্রামে গঞ্জে বেশি লক্ষ্য করা যায়। এসব ঘটনার ফলে শিক্ষার্থীরা মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পরে। এমন অবস্থায় কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
হতাশা ও বিষণ্নতাঃ- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে সব কারণে আত্মহত্যা করে থাকে তার মধ্যে অন্যতম হলো হতাশা ও বিষণ্ণতা। হতাশা ও বিষণ্ণতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষ করে নবীন ও প্রবীণদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ জীবনের শংকা নিয়ে বেশি হতাশায় ভুগতে দেখা যায়। যা শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here