ভারতের কালিতলা পার্কিং সিন্ডিকেট থেকে মুক্তি মিললো আমদানিকারকদের

0
235

মোঃএনামুলহক, বেনাপোল প্রতিনিধি : পেট্রাপোলে দালাল চক্রের গাড়ি পার্কিং নিয়ে রমরমা ব্যবসা বন্ধ হওয়ায় দেড় মাস থেকে কমে এখন তিন দিনেই ট্রাক ডুকছে বাংলাদেশে। বনগাঁ পৗরসভার হাত থেকে নিয়ে সেই দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে পরিবহণ দপ্তরকে। এই সিদ্ধান্তেই পরিবর্তন সাধিত হয়েছে পেট্রাপোল ও বেনাপোল সীমান্তের। আগে এক থেকে দেড় মাস সীমান্তে আটকে থাকত পণ্যবাহী গাড়ি। এখন প্রায় দিনের দিনই মালপত্র নিয়ে বাংলাদেশ ডুকছে পারছে ভারতীয় ট্রাক। আশুসিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আনন্দ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ-ভারত সকল ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীরা । তাঁদের বক্তব্য, গত দুই যুগ ধরে দুষ্টচক্রের জাঁতাকলে ফেঁসে দিনের পর দিন পন্যবাহী ট্রাক আটকে থাকতে হতো সীমান্তে। ভারতের রাজ্য সরকারের নয়া সিদ্ধান্তে এশিয়ার বৃহত্তম স্থল বন্দর পেট্রাপোল জিম্মিদারের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে।
বেনাপোল বন্দরের আমদানি রফতানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বলেন, একটা সময় কোনও পণ্যবাহী ট্রাক এন্ট্রি নেওয়ার পর প্রায় ৩৯ দিন আটকে থাকতো। তারপরও দালালদের টাকা দিয়ে ঢুকতো বাংলাদেশে। ব্যবস্থা পাল্টাতে মাস্টারস্ট্রোক দেয় ভারত রাজ্য সরকার। পৌরসভার হাত থেকে পার্কিং নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কেড়ে তা তুলে দেওয়া হয় পরিবহণ দপ্তরের হাতে। নয়া সিদ্ধান্তের পর দেখা গিয়েছে, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে আটকে থাকা গাড়ি এবং দিন সংখ্যা ভালো রকম হ্রাস পেয়েছে। এখন ৩৯ দিন নয়, তা কমে তিনদিনে নেমে এসেছে, বলছেন চালকরা। চলতি সপ্তাহে তা আরও কমে আসবে। এন্ট্রি হওয়ার দিনই গাড়ি ঢুকছে বাংলাদেশ । আগের ব্যবস্থায় দিন প্রতি পণ্যবাহী গাড়ির এন্ট্রি হতো ৮৪৬টি করে। বর্তমানে তা কমে ২৯৯টি হয়েছে। আগে লাইনে পণ্যবাহী গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকত ৯ হাজারের মতো। নয়া ব্যবস্থার পর তা কমে ১ হাজার ৫৮৭ টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। এতে বাণিজ্যে স্বস্তি ফিরেছে। সিঅ্যন্ডএফ ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী জানান, সরকারের এমন পদক্ষেপে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সহজ হওয়াতে স্বস্তি ফিরেছে আমদানি কারকদের মাঝে। দ্রুত পরিবহন করা যাচ্ছে পণ্য। এতে বাণিজ্য সহজ হয়েছে। ভারতীয় ট্রাক চাল অনিমেস জানান, আগে দেড় মাস পর্যন্ত কালিতলা পার্কিংয়ে থাকতে হতো। এখন ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে বাংলাদেশে ঢোকা যাচ্ছে। দ্রূত পণ্য পৌচাচ্ছে বন্দরে।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ স্টাফ এ্যাসোসিয়েশেন সহসভাপতি কামাল হোসেন জানান, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এমন উদ্যেগে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা খুশি। তবে ট্রাক প্রতি এ ধরনের সেবা চার্জ পণ্যবাহি ট্রাক ১০ হাজার রুপি ও ট্রাক চ্যাচিজ চার্জ ৫ হাজার রুপি নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থের পরিমান কিছুটা কমালে আরো উপকৃত হবেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ ভারত ল্যান্ড পোর্ট চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মতিয়ার রহমান জানান, বাংলাদেশের প্রতিটি আমদানিকারক ঋণপত্র খোলার সময় পণ্যের মূল্যের সাথে বনগাঁ, কালিতলাপার্কিং এর ৩০-৩৫ দিনের ট্রাক ডিটেনশন চার্জও মালবাহি ট্রাক চার্জ উল্লেখ করে তার উপর আমদানিকারককে শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। গত এক দশক ধরে প্রতি বছর কমপক্ষে দুই হাজার কোটি টাকা পণ্যের মূল্য ও ট্রাক ভাড়া ছাড়া শুধু কালিতলা পার্কিং ডিটেনশন চার্জ বাবদ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রিয় সরকারের সদ্বিচ্ছায় ও মূখ্য মন্ত্রীর উদ্যেগে বনগাঁ, কালিতলা পার্কিং সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া হয়। দিল্লি বোম্বে সহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ হতে একটি ট্রাক আসার পর লোকাল গোডাউনে আনলোড করে রাখা হয়। পরবর্তীতে সেই একই পণ্য দুইটি ট্রাকে লোড করে বেনাপোলে পাঠানো হয় যা ঋণ পত্রের শর্ত বহির্ভূত। এলসি তে পার্ট শিপমেন্ট অনুমোদন থাকলেও ট্রান্সশিপমেন্টের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকে। বনগাঁ পার্কিং সিন্ডিকেট ট্রাকের ভুয়া নম্বর দিয়ে এন্ট্রি করে রাখা হতো। পরবর্তীতে সেই সিরিয়াল নম্বর পঞ্চাশ হাজার টাকায় বিক্রি করা হতো। সম্প্রতি বিভিন্ন পণ্যের ইনভয়েজের মূল্যের সাথে কত মালবাহি ট্রাকের চার্জ উল্লেখ করা হয়েছে তা বিশ্লেষণে জানা য়ায় একটি গ্লশ ইন্ড্রাস্টি্র কর্তৃক আমদানিকৃত কেমিক্যাল ব্রীক্স ০৪ টি ট্রাকে আমদানি হয়েছে। সেখানে ডিটেনশনহ সহ মালবাহি চার্জ উল্লেখ আছে ৮,০০০ ডলার অর্থাৎ একটি ট্রাকের ভাড়া ও ডিটেনশন চার্জ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে এক লক্ষ একাশি হাজার টাকা। এই ভাড়া পণ্যের মূল্যের সাথে সংযোগ করে শুল্ক পরিশোধ করা হয়। একটি ঔষধ শিল্পের ২ টন পণ্য আমদানি হয়েছে যার ডিটেনশনসহ মালবাহি চার্জ উল্লেখ আছে ৩,১০০ ডলার অর্থাৎ একটি ট্রাকের ভাড়া দুই লক্ষ উনসত্তর হাজার টাকা। একটি ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠানের নামে ১২০ টি কেমেক্যাল চালান একটি ট্রাকযোগে আমদানি হয়েছে। যার ডিটেনশন সহ মালবাহি চার্জ উল্লেখ আছে ৩,২০০ ডলার। অর্থাৎ একটি ট্রাকের ভাড়া দুই লক্ষ সাতাত্তর হাজার পাঁচশত টাকা। ভারতের যেকোন প্রদেশ হতে বেনাপোলে পণ্য আসলে সাধারণত ডিটেনশন ছাড়া ভাড়া হয় দেড় লক্ষ টাকা। পশ্চিম বাংলা সরকারের পরিবহন দপ্তর অনলাইনে ¯স্লট বুকিং চালু করায় ভারতের যেকোন প্রদেশ হতে ট্রাক কোলকাতায় এসে পৌঁছানোর পর ১-২ দিনের মধ্যে বেনাপোলে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে খুশি ব্যবসায়িরা।এ বিষয়ে উভয় দিকে সরকারি কর্মকর্তারগণ বিশেষ করে ভারতীয় পরিবহন দপ্তর, বন্দর কাস্টমস এবং বেনাপোল কাস্টমস্ ও পোর্ট এলপিআই নিয়মিত তদারকি করলে ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশে বনগাঁ পার্কিং সিন্ডিকেটের ডিটেনশন হতে চিরতরে মুক্তি পাবে এবং বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতারা উপকৃত হবে বলে আশা করেন তিনি।
অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, “ভুয়ো এন্ট্রি বন্ধ হওয়ায় এখন দু থেকে তিনদিনের মধ্যে গাড়ি বাংলাদেশ পৌঁছে যাচ্ছে। আগামী দিনে এই বন্দরে কাজের পরিমাণও বাড়বে। রপ্তানি বাণিজ্য করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীদের উৎসাহ বাড়বে বলে মনে করছেন শুল্কদপ্তরের আধিকারিকরাও। বেনাপোল বন্দরের উপ-পরিচালক(ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার বলেন, দুই দেশের সরকারের চেষ্টায় ভারতের রাজ্য সরকারের নতুন নির্দেশে পেট্রাপোলের আমদানি বাণিজ্যে গতি এসেছে বেনাপোলে। পার্কিং নিয়ে যে জটিল সমস্যা ছিলো সেটা এখন আর নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here