ইমদাদ হোসেন,চুড়ামনকাটি ॥ সবজির রাজ্য যশোরে উৎপাদিত সবজিতে বিষ। পোকা-মাকড় দমনে বেগুন, শিম, পাতাকপি,ফুলকপিসহ সকল সবজিতে অবাধে মাত্রাতিরিক্ত বিষ ছিটানো হচ্ছে। আগের দিন বিষ স্প্রে করা সবজি পরের দিন ভোরে চাষিরা বাজারজাত করছে বলে স্থানীয় অনেকেই জানিয়েছেন। সবজির নামে বিষ খাচ্ছে মানুষ। সহনীয় মাত্রায় বিষ ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট সময়ের আগে সবজি বাজারজাত করা মানেই মানুষের বিষ খাওয়াানো হচ্ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। যশোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বিষমুক্ত সবজি চাষে কৃষকদের নানাভাবে সচেতন করা হয়। এছাড়া পোকা মাকড় দমনে ফেরোমন ফাঁদ ও আইপিএমএর বিভিন্ন পদ্ধতিতে সবজি চাষে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তারপরেও সবজিতে অতিরিক্ত বিষ ব্যবহার বন্ধ হচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, যশোর সদর উপজেলার চুডামনকাটি, হৈবতপুর ও কাশিমপুর ইউনিয়নে বারো মাস সবজির চাষ করেন কৃষকরা।মাঠের পর মাঠ শীতকালীনসহ বারো মাসই মাঠে থাকে সবজির সবুজ সমারোহ।যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্র জানা গেছে,যশোর জেলায় ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে সবজির চাষ হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমানে চাষ করেছেন চুড়ামনকাটি, হৈবতপুর ও কাশিমপুর ইউনিয়নের চাষিরা।
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, হৈবতপুর ইউনিয়নে ১ হাজার ৬শ ৩০ হেক্টর, চুড়ামনকাটি ইউনিয়নে ৮শ ২৮ হেক্টর ও কাশিমপুর ইউনিয়নে ৫শ ৫৩ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজির চাষ হয়েছে। এখানে উৎপাদিত সবজির সুনাম দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও রয়েছে। কিন্তু আগের মতো সবজিতে সেই স্বাদ আর নেই। কারণ সবজির সাথে বিষ খাচ্ছে মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবজিতে ছিটানো বিষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রিনকর্ড, সিমবুন, সুমিসাইডিন, হেপ্টাকোর, থায়াডিন, ডিডিটি। এগুলো খুবই বিপদজনক। এছাড়াও নগস, সুমিথিয়ন, ডাইমেক্রন, ম্যালালাথিয়ন, অ্যারোমাল ইত্যাদি। এসব কীটনাশক প্রয়োগের পর অপোমানকাল কোনোটির ৩ দিন, কোনোটির ৭ দিন, কোনোটির ২১ দিন এমনকি ৬ মাস পর্যন্ত হতে পারে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, চাষিরা সকল বিধিনিষেধ উপো করে বিষ প্রয়োগের কয়েক ঘন্টা পরেই সবজি বাজারজাত করছেন। তরতাজা সবজি বেশি দামে বিক্রির আশায় চাষিরা মানুষকে বিষ খাওয়াচ্ছেন।
চুড়ামনকাটি, আব্দুলপুর, ছাতিয়ানতলা, সানতলা, নুরপুর, বাগডাঙ্গা, দোগাছিয়া, সাজিয়ালী, শ্যামনগর, হৈবতপুর, তীরেরহাট, মানিকদিহি, মথুরাপুর, শাহাবাজপুর, মুরাদগড়, কাশিমপুর, বিজয়নগর, দৌলতদিহি, বালিয়াঘাট ললিতাদাহ, বালিয়াডাঙ্গা, বেনেয়ালী, ডহেরপাড়া, লাউখালী, নাটুয়াপাড়ার প্রতিটি মাঠে আবদকৃত সবজিতে মাত্রাতিরিক্ত বিষ ছিটানো হচ্ছে। কোন নিয়ম মানছেন না তারা। অনেকেই খালি শরীরে মুখে কাপড় না বেধে বিষ ছিটানোর কাজ করছে।যা স্বাস্থের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ন। সবজি চাষি চুড়ামনকাটি এলাকার আতিকুর রহমান, জয়নাল আবেদীন, মিন্টু মিয়া, জামাল উদ্দিন, শহিদুল ইসলাম, আশাদুল ইসলাম, মিজানুর রহমান, বজলু মিয়াসহ অনেকেই জানান, কি আর করবো বলেন বিষ না দিলে সবজির চেহারা ঠিক থাকেনা। ফেরোমন ফাঁদ দেয়ার পরও পোকামাকড়ের অত্যাচার আছেই। তিকর পোকা-মাকড় মরেনা। তাই বিষ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি।
বিভিন্ন ইউনিয়নের দায়িত্বরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা জানান, সবজিতে মাত্রাতিরিক্ত বিষ দেয়ার বিষয়ে চাষিদের বার বার নিষেধ করা হচ্ছে। তাদের সচেতন করতে মাঠ দিবস ও উঠান বৈঠকসহ বিভিন্নভাবে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ওপর আলোচনা অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। কীটনাশক ছাড়াই উন্নত মানের সবজি কিভাবে আবাদ করা যায় তার প্রশিণও দেয়া হয় কৃষান কৃষানীদের। তবে পূর্বের তুলনায় চাষিরা এখন অনেক সচেতন। অনেকেই বিকল্প পদ্ধতিতে সবজি েেত পোকা মাকড় দমন করছে। তবে বেগুন ও শিমে কিছু কিছু চাষি অতিরিক্ত বিষ ব্যবহার করে।
যশোর হর্টিকালচারের উপপরিচালক দিপাঙ্কর দাস জানিয়েছেন, যশোর সবজির জেলা হিসেবে সারা দেশে পরিচিত। যে কারণে এখানে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের ব্যাপারে চাষিদের বরবরাই সচেতন করতে হয়। সবজির পোকা-মাকড় দমনে কীটনাশকের বিকল্প ব্যবস্থাপনার উপর বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। চাষিদের বলা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার ও নিয়ম মেনে বাজারজাত করার জন্য। তাহলে মানব দেহে এর কোন প্রভাব পড়বে না। তিনি আরো বলেন, সবজিতে বিষ ব্যবহারের সুনির্দ্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ আইন গঠন করা উচিত। তাহলে নিয়ম না মেনে বিষ ব্যবহার করলে চাষিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে পরিবেশের জন্য উপকারী পোকা মাকড় ও ধ্বংস হচ্ছে। আবার জমির উর্বরতা শক্তিও কমে যাচ্ছে। তিনি কৃষককে অবশ্যই বিষ প্রয়োগের পর থেকে নির্দিষ্ট সময়ের পর বাজারজাত করণের জন্য পরার্মশ দেন।















