নড়াইলের বিশ্বকর্মার গ্রাম রামসিধিরঐতিহ্যবাহী নৌকা-নড়াইলের রামসিধি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী নৌকা

0
227

জেলা প্রতিনিধি নড়াইল থেকে: নড়াইলের বিশ্বকর্মার গ্রাম রামসিধিরঐতিহ্যবাহী নৌকা। নড়াইল সদর উপজেলার ডহর রামসিধি গ্রামের ২৫ পরিবার নড়াইলের নৌকা শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে। বর্ষা মৌসুমে এখানকার ডিঙ্গি নৌকা জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশে পাশের কয়েকটি জেলায় বিক্রি হয়ে থাকে। উজ্জ্বল রায়, জেলা প্রতিনিধি নড়াইল থেকে জানান, চাহিদা থাকায় রামসিধি গ্রামেই গড়ে উঠেছে ডিঙ্গি নৌকার হাট। এখানকার দরিদ্র নৌকা শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী এ কুটিরশিল্পকে অনেক কষ্ট করে টিকিয়ে রাখলেও বিসিক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো সহায়তা পান না। জানা গেছে, সদর উপজেলার বাঁশগ্রাম ইউনিয়নের ডহর রামসিধি গ্রামের এসব পরিবার কয়েক পুরুষ ধরে নৌকা তৈরির পেশার সাথে জড়িত। আগে এসব নৌকা তৈরি করে খুলনার আবালগাতি, নড়াইলের পেড়লি ও খড়রিয়া হাটে বিক্রি করলেও গত ১০ বছর যাবত এ গ্রামেই জেলার একমাত্র নৌকা বিক্রির হাট গড়ে উঠেছে। সপ্তাহে প্রতি বুধবার হাটে বিক্রয়ের জন্য গড়ে ৭০ থেকে ৮০টি ডিঙ্গি নৌকা ওঠে। নড়াইলের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও খুলনা, মাগুরা ও যশোর জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বর্ষা মৌসুমে এবং মাছের ঘেরে বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য নৌকা কিনতে আসেন। জানা গেছে, জেলায় বর্তমানে শুধু ডহর রামসিধি গ্রামেই পেশাগতভাবে নৌকা তৈরি হয়।
ডহর রামসিধি গ্রামের নৌকা শিল্পী নিখিল বিশ্বাস (৫০) বলেন, এ গ্রমের মানুষ কয়েক পুরুষ এ পেশার সাথে জড়িত। আষাড় থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত ৫ মাস নৌকা তৈরী হয়। এক সময় নৌকা তৈরী ও বিক্রয় করে প্রায় সারা বছর সংসার চললেও এখন পানি কমে যাওয়ায় নৌকার চাহিদা কমে গেছে। এখন ৬-৭ মাসের বেশী সংসার চলে না। মৌসুমের শুরুতে একটি নৌকা ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা বিক্রি হলেও এখন ৩৫শ টাকার বেশী বিক্রি হচ্ছে না।
নৌকা শিল্পী শিশু সিকদার (৫৫) ও স্বপন বিশ্বাস (৬০) জানান, মৌসুমের শুরুতে কাঠ কিনতে কিছু অর্থ লোন প্রয়োজন পড়ে। এজন্য সরকারিভাবে স্বল্প সুদে লোন পেলে তাদের অনেক উপকার হতো।
নৌকা নির্মাতা শান্তিরাম বিশ্বাস (৬৫) জানান, একটি নৌকা গড়তে বা তৈরীতে ৩জন শ্রমিকের প্রয়োজন। এসব নৌকা ২ বছর ভালো থাকে। তবে আলকাতরা লাগানো হলে ৪ থেকে ৫ বছর চলে। নৌকা গড়ার কারিগর সুশেন মল্লিক (৪০) জানান, বর্তমানে এ পেশার প্রতি মানুষের ঝোঁক কমে যাচ্ছে। কারন একদিকে চাহিদা কমছে, অন্যদিকে লাভও কম। অনেক সময় নৌকা অবিক্রিতও থেকে যায়। অপর নৌকা নির্মাতা সঞ্জয় বিশ্বাস (৩৫) জানান, নৌকা গড়তে কাঠ ক্রয়, বহন, শ্রমিকের মজুরি ও লোহার জিনারিসহ একটি নৌকা গড়তে প্রায় ৩ হাজার টাকা খরচ পড়ে। সাধারনত ৩৫শ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। অনেকে বাড়ি থেকেও স্পেশালভাবে বেশী দাম এবং ভালো কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি করে।
নৌকা ক্রেতা লোহাগড়া উপজেলার কুমড়ি গ্রামের বিল পাড়ার জমির শেখ জানান, বর্ষাকালে এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যাওয়া-আসা, ফসল আনা, মাছ ধরা, শাপলা তোলা, শামুক কুড়ানোসহ বিভিন্ন কাজে ডিঙ্গি নৌকা খুবই জরুরি। এসব নৌকা ব্যবহারের সুবিধা হল একটি মাত্র বৈঠা দিয়েই এটা চালানো যায়। হালের প্রয়োজন হয়না। চলেও দ্রুত।
নড়াইল জেলা বিসিকের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো: সোলায়মান হোসেন বলেন, তাঁত, মৃৎ, বাঁশবেত, নৌকা নির্মাণ কুটির শিল্প আমাদের দেশের ঐতিহ্য। এ কুটির শিল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছি। আগামী ডিসেম্বরের শেষের দিকে সরজমিনে গিয়ে এসব শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের তথ্য সংগ্রহ করব। পরবর্তিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউপি চেয়ারম্যানসহ সকলকে নিয়ে কারিগরদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা করা হবে তিনি বলে জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here