চৌগাছা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আবারও অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বাদে নিজের নামে ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা চেক ইস্যু করতে হিসাবরক্ষণ অফিসকে চাপ

0
206

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি ॥ যশোরের চৌগাছা ৫০ শয্যা হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আবারো দূর্নীতির তথ্য মিলেছে। গতকাল বুধবার উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে ৭ টি বিল ভাউচারে মোট ১ কোটি ৬৫ লাখ ৪৯ হাজার ২’শ টাকার বিল ভাউচার জমা দিয়ে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করলে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা অর্থ ছাড় বন্ধ রাখেন। বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ইউনুচ আলী। শুধু তাই নয় এই টাকা ছাড় করতে বিভিন্ন মহল দিয়ে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগে পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে চৌগাছা হাসপাতালে ঔষধপত্র (ইডসিএল বর্হিভূত), মালামাল সরবারাহের কার্যাদেশ পান মজুমদার ট্রেড কর্পোরেশন। তারই ধারাবাহিকতায় উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা লুৎফুন্নাহার ওই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামে ৭ টি বিল ভাউচারে ১ কোটি ৬৫ লাখ ৪৯ হাজার ২’শ টাকার বিল-ভাউচার জমা দেন হিসাবরক্ষণ অফিসে। একই সাথে বিলের সমুদয় টাকা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ব্যতিরেখে ব্যক্তিগত একাউন্টে প্রদানের জন্য সুপারিশ করেন। বিলগুলো জমাদানের পর হিসাবরক্ষণ অফিসার ইউনুচ আলীর নজরে আসে। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি সকল বিলভাউচার প্রাথমিক যাচাই করে নিশ্চিত হন যে, বিল দাখিলের মধ্যে ব্যাপক ত্রুটি রয়েছে। একই সাথে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বাদে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নামে বিল ছাড় করা নিয়ম বর্হিভূত। এই অবস্থায় জমাকৃত বিল-ভাউচার ত্রুটিযুক্ত সন্দেহ হবার কারনে তিনি বিলগুলো ছাড় করা থেকে বিরত থাকেন। একই সাথে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
এদিকে এই ঘটনায় বুধবার উপজেলা চত্তরে হাসপাতালের বিল-ভাউচার নিয়ে ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয় এই বিলভাউচার ছাড় করে দেবার জন্য এক সাংবাদিককে দিয়ে হিসাবরক্ষণ অফিসে ফোনও করা হয়েছে। হিসাবরক্ষণ অফিস সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতালের বিল-ভাউচার জমাদানের পর ত্রুটি ধরা পড়লে জানিয়ে দেয়া হয় ঠিকারদার প্রতিষ্ঠানের নামে ছাড়া এই বিল ছাড় করা সম্ভব না। এরপরপরই এক সাংবাদিক অফিসের অডিটর মদিন আলীকে ফোন দিয়ে জানানো হয় হাসপাতালের বিলগুলো ছেড়ে দেয়ার জন্য। এ সময় অডিটর জানান, এই বিলে ত্রুটি আছে বলেই আপাতত ছাড় দেয়া যাবে না। এ সময় ফোনকারী সাংবাদিক বিল ছাড় না হলে ঝামেলাই পড়বেন বলে শাষানো হয়। ফোন করার সময় সাংবাদিকের নাম আজিজ বলে পরিচয় দেন বলেও হিসাবরক্ষণ অফিস সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসার ইউনুচ আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিয়ম বর্হিভূতভাবে ৭টি বিলে ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার বেশী বিল জমা দেয়া হয়েছে। ঠিকাদান প্রতিষ্ঠান বাদে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নামে আমি চেক ইস্যু করতে পারিনা। এছাড়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের স্বপক্ষে তার কোন যোক্তিক কাগজপত্র জমা দেননি।
বিল ছাড়ের বিষয়ে বলেন, অফিসের অডিটরকে ফোনে এক সাংবাদিক বিলটি ছাড় করে দেবার কথা জানান। না দিলে ঝামেলা হবে বলেও হুমকি দেন বলে আমি জেনেছি।
বিল জমাদানের বিষয়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ লুৎফুন্নাহারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন ওই বিলে অনিচ্ছাকৃত ভুল আছে। এসব ঠিক করা হবে। আপনার পক্ষ নিয়ে এক সাংবাদিকের বিল ছাড় করতে ফোন দেয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এটা আমি জানিনা।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইরুফা সুলতানার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি আমার জানা নেই। তবে হিসাবরক্ষণ অফিসার আমাকে জানালে বিষয়টি নিশ্চয় খতিয়ে দেখা হবে।
প্রসঙ্গতঃ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বহুদিনের। দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত হয়ে প্রমানিত হলেও রহস্যজনক কারনে তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন। স্থানীয় রাজনীতিকদের ম্যানেজ করে অনিয়ম দুর্নীতি করছেন বলেও বারবার অভিযোগ উত্থাপতি হচ্ছে।
নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উপজেলার নারায়নপুর, সুখপুকুরিয়া, জগদেশপুর ও পাশাপোল ৪টি ইউনিয়নে উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিচ্ছন্নতা বাবদ ২০২১ সালের অক্টোবরের ৮ তারিখে ৯৯ হাজার ৮’শ ৪০ টাকা উত্তোলন করেন ( বিল নং-৯৯০৪), ২০২২ সালের এপ্রিলে ২ বারে ১ ল ৫৯ হাজার ৬০০ ও ১ ল ৪০ হাজার ৪০০ টাকা, মোট ৩ ল টাকা (বিল নং-২৩৯৯৪ ও ২৩৯৯৩), জুনের ২৭ তারিখে ৪৯ হাজার ৯’শ২০ টাকা (বিল নং-২৮৫৪৫), একই মাসের ২৮ তারিখে ১ ল ৬২ হাজার টাকা (বিল নং-২৮৮০৬) উত্তোলন করেন বহু বিতর্কিত এই উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। অথচ পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বাবদ একটি টাকাও প্রদান করা হয়নি কেন্দ্রগুলোতে। এছাড়া করোনা টিকা প্রদানের জন্য প্রতি ইউনিয়নে মাইকিং বাবদ চলতি বছরের ২ জুন ভুয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে ৩৩ হাজার টাকা (বিল নং-২৮৬৪৬) উত্তোলন করেন। একাধিক স্থানীয়রা জানায় টিকা প্রদানের জন্য শুধু মাত্র মসজিদের মাইকেই জানানো হয়। অভিযোগে আরো জানাগেছে, চলতি বছরে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ২৫ থেকে ৩০ দিন টিকাদান কর্মসূচি পালন করা হয়। প্রতিটি ইউনিয়নে দিনে ৩ টি করে ক্যাম্প তৈরী করে ৩ জন টিকাদান কর্মী (এইচএ, এফডাবলুএ, সিএইচসিপি, এসএসসিএমও) ও ২ জন ভলেন্টিয়ার দ্বারা কর্মসূচি পালন করা হয়। টিকাদান ও ভলেন্টিয়ারকর্মী সম্মানী ভাতা হিসেবে ৩০ শে জুন ৮ ল ৮২ হাজার টাকা (বিল নং-২৮৬৪৭) উত্তোলন করেন। সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন টিকাদান কর্মীর সম্মানী ভাতা ৫’শ টাকা ও ভলেন্টিয়ারকর্মী ৩’শ ৫০ টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও উর্ধ্বতন স্যারের কথা বলে তিনি টিকাদান কর্মী থেকে ১’শ ১০ টাকা করে কেটে রাখেন। এমন অভিযোগ সব সময় উত্থাপিত হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here