বিনম্র শ্রদ্ধায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করলো যশোরবাসী

0
191

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আগমুহূর্তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার বুদ্ধিজীবীদের বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে যশোরবাসী। বুধবার দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এ শহিদদের স্মরণ করেন তারা। একইসাথে মুক্তিযোদ্ধাসহ শত-শত জনতা মুষ্টিবদ্ধ হাতে দৃপ্ত হয়ে উদাত্ত কন্ঠে শপথ নিয়ে বলেন, শহিদদের রক্তঋণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তারা সমুন্নত রাখবে ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তারাধিকার হিসেবে স্বাধীন বংলার সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। কর্মসূচির মধ্যে ছিল মৌন পদযাত্রা সহকারে যশোর চাঁচড়া রায়পাড়া বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পন আলোচনাসভা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রসঙ্গত, মহান মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্তে পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর আলবদর, রাজাকার, আল-শামস ঘাতকরা বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করতে রাতের অন্ধকারে মেতে ওঠে বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞে। তারা হত্যা করে বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। ১৪ ডিসেম্বর সারা দেশ থেকে সহ¯্রাধিক বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে পৈশাচিকভাবে তারা হত্যা করে । অনেকের লাশই পাওয়া যায়নি। রাজাকারদের নজিরবিহীন নৃশংসতা এবং এক ভয়ংকর নীলনকশা বাস্তবায়নের একটি প্রামাণ্য দলিল। হানাদাররা সেদিন কেবল ঢাকাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবী, পদস্থ সরকারি- বেসরকারি কর্মকর্তাসহ প্রায় দেড়শ’ বুদ্ধিজীবী-কৃতী সন্তানকে অপহরণ করে মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করে। সেই থেকে ১৪ ডিসেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনে এক শোকাবহ দিন। এই শোকাবহ দিনে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এদিন সকাল থেকেই যশোর চাঁচড়া রায়পাড়া বধ্যভূমিতে ভিড় করে জেলার সর্বস্তরের মানুষ। তারা সকলেই শ্রদ্ধাবনত চিত্তে পুষ্পস্তবক নিয়ে পদযাত্রা করে এসে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে উপস্থিত জনতাকে শপথবাক্য পাঠ করান যশোর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহসভাপতি ফারাজি আহমেদ সাঈদ বুলবুল। এদিন সকালে যশোর চাঁচড়া রায়পাড়া বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পন করে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানান, যশোর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, জেলা পরিষদ, পৌর মেয়র, জেলা আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠন, যবিপ্রবি, মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোর সরকারি সিটি কলেজ, যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজ, ডা. আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ, যশোর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, প্রেসকাব, সংবাদপত্র পরিষদ, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন, সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোর, দৈনিক প্রতিদিনের কথা, দৈনিক কল্যাণ, ফটো জার্নালিস্ট এ্যাসোসিয়েশন, জাসদ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী), ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, শংকরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাম গণতান্ত্রিক জোট, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, বাসদ, বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠন, ক্যাম্পাস থিয়েটার আন্দোলনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এদিকে বিকেলে যশোর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে বুদ্ধিজীবী হত্যার ৫০ বছর পূর্তিতে ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলক’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সুপার নিউমারি অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। বলেছেন- আগামী ২৬ মার্চের মধ্যে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা চাই। শুধু তালিকা করলে হবে না- যারা প্রথমসারির বুদ্ধিজীবী তাদের সম্পর্কে আমার তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করবার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সরকারকে নিতে হবে। কারণ বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন আলোর মানুষ। বুদ্ধিজীবীরা চাননি দেশ সাম্প্রদায়িক হোক, তারা কখনও চাননি দেশের ধর্ম হোক। ঐতিহাসিক টাউন হল ময়দানের শতাব্দী বটমূলের রওশন আলী মঞ্চে এ অনুষ্ঠানে বিশিষ অতিথি ছিলেন ডক্টর শওকত আরা হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাড. মনিরুল ইসলাম মনির, ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম। সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান। আলোচক ছিলেন যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি একরাম-উদ-দ্দৌলা, বীরমুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. সালেহা বেগম, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সুকুমার দাস, তির্যক যশোরের সাধারণ সম্পাদক দীপংকর দাস রতন, প্রেসকাব যশোরের সম্পাদক এসএম তৌহিদুর রহমান। সঞ্চালনা করেন শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা সাধন কুমার দাস, শ্রাবণী সুর ও আহসান হাবিব পারভেজ। আলোচনার আগে গণসংগীত পরিবেশন করেন জেলা শিল্পকলা একাডেমী, সুরধুনী, তির্যক, পুনশ্চ, উৎকর্ষ, ভবের হাট, স্পন্দন, স্বরলিপি সঙ্গীত একাডেমি। বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করেন বিবর্তন যশোরের শিল্পীরা। সঙ্গীতানুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আফরোজা নাসরিন নীলিমা। আলোচনা শেষে উদীচী ও নৃত্যবিতান সমবেত নৃত্য পরিবেশন করেন এবং শিল্পী সৃষ্টি পরিবেশনায় নাটক মঞ্চস্থ হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here