ঘনঘন লোডশেডিং আর তিব্র তাপদাহে; ফের পাখা পল্লীর পালে হাওয়া!

0
340
রাসেল মাহমুদ।। কাঠফাঁটা খরতাপ আর বিদ্যুতের ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারনে, দীর্ঘদিন পর ফের ছন্দ ফিরতে শুরু করেছে শেখহাটি গ্রামের সেই পাখাপল্লীতে। কয়েক বছর পূর্বে এই পল্লীতে ভাটা পড়লেও ফিরতে শুরু করেছে সুদিন। দিনরাত চলছে তালের পাতা দিয়ে পাখা তৈরির মহা কর্মযজ্ঞ। পাইকারি বিক্রির পাশাপাশি অনেক কারিগর’ই নিজেরা জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গরমে প্রশান্তির পরশ বোলানো হাতপাখা ফেরি করে খুচরা বিক্রি করেন। এর ফলে পাখা প্রতি খানিকটা বেশি লাভ হয় বলে জানান পাখা তৈরির অন্যতম কারিগর আব্দুল করিম খান। বিশেষ কায়দায় তৈরি এসব তালপাতার হাতপাখা গুলো প্রকার ভেদে ৫০-৭০ টাকা পর্যন্ত খুচরা বিক্রি করেন বলে জানান তারা। মাঝখানে কয়েকটা বছর পাখাপল্লিতে ছন্দপতন ঘটলেও সম্প্রতি পুরাতন ঐতিহ্য ফিরতে শুরু করায় কর্মচঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে পাখা তৈরির এই গ্রামে। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মানবসভ্যতার পরিবর্তণ এখন বিশ্বব্যাপি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে-সাথে তাল মিলিয়ে তেমনি এগিয়ে চলছে বাংলাদেশও। কিন্তু পরিবর্তনের কল্যাণে দেশ যেমন আধুনিকতায় পূর্ণতা পাচ্ছে। ঠিক তেমনি ভাবে যুগযুগ ধরে বয়ে চলা গ্রামবাংলার নানা ঐতিহ্যও দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে চিরোতরে।
এসবের মধ্যে তালের পাতার তৈরি হাতপাখা এখন বিলুপ্তীর পথে। আধুনিক যন্ত্রের কাল্যাণে এখন ‘তুচ্ছো’ এক সময়কার তিব্র গরমের মানব শরীরের শান্তির পরশ বোলানো একমাত্র পন্থা তালপাতার তৈরি এই পাখার।
প্রচন্ড খরতাপে সৃষ্ট গরমে সব বয়সের মানুষের শরীরের ঠান্ডা বাতাসের পরশ বোলাতে তালপাতার এই হাতপাখার জুড়ি মেলা ভার। প্রাকৃতিক পন্থায় তৈরি হাতপাখার বাতাস সর্বশ্রেনীর মানুষের প্রাণ জুড়ালেও আধুনিক প্রযুক্তির যুগে অনেকটা বেকার হয়ে পড়ে তালপাতার তৈরির এই হাতপাখা। নানা প্রতিকুলতার মাঝে টিকে থাকা হাতে গোনা গুটি কয়েক তালপাতা দিয়ে পাখা তৈরি শিল্প সংশ্লিষ্টরা। যশোর শহর থেকে আনুমানিক ২০-২৫ কিলোমিটার পূর্বে বসুন্দিয়া আফরাঘাট পার হয়ে শেখহাটি গ্রামের বাদ্যকরপাড়ার আরেক নাম পাখা পল্লী। এক নামে পাখা পল্লী হিসাবে চেনন সকলে। সম্প্রতি প্রচন্ড খরতাপ আর বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ফলে চাহিদা বেড়েছে তালপাতার হাত পাখার। তাই ফের শুরু হয়েছে পাখা তৈরির কর্মযজ্ঞ।
সরেজমিন ঘুরে শেখহাটির এই পাখাপল্লীর সবচেয়ে পুরানো ও বয়স্ক কারিগর মো: করিম খান ও জরিফ খানের সাথে কথা হয়। তারা জানান তালপাতা দিয়ে এই পাখা তৈরি কাজ করেন আজ প্রায় ৪০ বছরের বেশী সময় ধরে।
বংশিও পরমপরায় বাপ-দাদার কাজ এই পাখা তৈরি। তারা বলেন আমরা কোনো মতে এখনো এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি।  বাপ-দাদার রেখে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী প্রচীন শিল্পটি কোনো মতে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহে রিতীমত সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। শুধু করিম খান ও জরিফ খান’ই না এই পেশার সাথে জড়িয়ে রয়েছে এই পল্লীর আলম শেখ ও জিয়াউলের মত আরও ১৫-২০ জন ব্যক্তি। যা কিনা এক সময় পুরোগ্রামের বাসিন্দা এই পেশায় জড়িত ছিলো। তাল গাছ বিলুপ্ত হওয়া সহ নানা কারনে গ্রামবাংলার প্রচীন এই ঐতিহ্যবাহী পেশা পাল্টে ফেলেছে এই পল্লীর বহু বাসিন্দা। এপ্রজন্মের তালপাতার পাখা তৈরির আরেক কারিগর জিয়াউল বলেন বেশ কষ্টসাধ্য কাজ এটি। আমাদের পাশাপাশি বাড়ির মহিলারাও রাতদিন সমান তালে পরিশ্রম করে চলে পাখা তৈরির কাজ। যদিও আগের মত এখন এই হাতপাখার ব্যবহার নেই; তবু কম বেশি যা চলে তাতে কোনো মতে পরিজন নিয়ে টানাপোড়নের মধ্যে চলতে হয় ভোরবছর।
বছরের ৩ মাস এই পাখার কিছুটা চাহিদা থাকে। চৈত্রমাসের শুরু থেকে জৈষ্ঠ্যর শেষ পর্যন্ত চলে তালপাতার তৈরি এসমস্ত হাতপাখার। আগে গ্রামগঞ্জ ঘুরে পাখা তৈরির জন্য তালপাতা সংরহ করতে পারলেও এখন মেলানো যায় না। এলাকা থেকে তালগাছ কেটে ফেলায় এখন গাছের সংকট দেখা দিয়েছে। আর যা আছে তার পাতা এখন টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে আসতে হয়। আগের মত ফাউ পাওয়া যায় না। আস্ত একেক টা তালপাতা ৭-৮ টাকা দামে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কিনে নিয়ে আসতে হয়। তার উপর একটা পাতা থেকে ২টা পাখা তৈরি করা যায়। পাখা তৈরিতে সর্ব প্রথমে গাছ থেকে কাঁচাপাতা সংরহ করে এনে পানিতে জাগিয়ে পরে রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। এরপর হাতের মাপে পাতা ছাটাই করে ধাপেধাপে বাঁশের চটার শলা তৈরি করে তাতে হরেক রকমের রং করে শুকিয়ে নিয়ে গুটি শুতায় শেলায়ের মাধ্যমে একটি হাতপাখা বিক্রয়ের জন্য উপযোগী করে তোলার কাজ শেষ হয়। সব কিছু মিলিয়ে একেক টি পাখা তৈরিতে বর্তমানে ১৫-২০ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে যায়। প্রস্তুতকৃত এই তালেরপাতার হাতপাখা পাইকাররা প্রকার ভেদে (অর্থাৎ বাঁশের হাতলের) ১২-১৪’শ ও ১৮-২২’শ টাকা করে ১শ’পিচ বিক্রয় করে। চৈত্র থেকে জৈষ্ঠ্য এই তিন মাসের আয় দিয়ে চলতে হয় বছরের অন্য দিন গুলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here