স্টাফ রিপোর্টার: যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া হিজবুল্লাহ দাখিল মাদ্রাসার সুপারের বিরুদ্ধে শিক্ষক হয়রানী, শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা দাবী ও জোরপুর্বক চাঁদা আদায়, মাদ্রাসার পুরোনো ইট, বেন্স ও টিন বিক্রির টাকা আত্মস্যাত, সরকারি অনুদানসহ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বোর্ড নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত ফি আদায় করে তা আত্মস্যতসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সুপারের দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মাদ্রাসার ট্রেড ইন্সট্রাক্টর,জেনারেল ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কস পদের একজন সহকারি শিক্ষক উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
জানা গেছে, ২০১২ সালে মোঃ হাবিবুর রহমান নওয়াপাড়া হিজবুল্লাহ দাখিল মাদ্রাসার সুপার পদে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই তিনি নানা অনিয়মের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ২০১৪ সালে নাশকতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। ওই মামলায় তিনি দুইমেয়াদে চার মাস জেলও খাটেন। সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে তাকে কোনো কারণ দর্শানো নোটিশ বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি। এমনকি নিয়ম অনুযায়ী তার বেতনের অর্ধেক উত্তোলনের কথা থাকলেও তিনি প্রতিমাসে পূর্ণ বেতনভাতা উত্তোলন করছেন।
জানা গেছে, কোন প্রকার অনুমতি বা কমিটির রেজুলেশন ছাড়াই ২০১৯ সালে মাদ্রাসার পঞ্চাশ হাজার ইট, ২০২২ সালে তানযীমুল কুরআন ক্যাডেট মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে ৩০ সেট বেন্স এবং ২০২৩ সালে মাদ্রাসার পুরাতন শ্রেণি কক্ষের ৩০ পিচ ঢেউটিন বিক্রয় করে মাদ্রার কোষাগারে জমা না দিয়ে সমুদয় অর্থ তিনি আত্নসাৎ করেন।
এছাড়াও মাদ্রাসায় কেউ চাকুরীতে যোগদান করলে তাকে অবশ্যই পালনীয় শর্তাবলী সম্বলিত লিখিত শর্ত দেন তিনি। যাতে উল্লেখ রয়েছে মাদ্রাসায় চাকরি করতে গেলে তাকে অবশ্যই বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকতে হবে। কারিগরি শাখার ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায়কৃত অর্থের অর্ধেক গোপনে সুপারের কাছে জমা দিতে হবে।মাদ্রাসার কোন প্রয়োজনে টাকা লাগলে ওই শিক্ষক ধার দিতে বাধ্য থাকবে কিন্তু উক্ত টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দিতে পারবে না।চাকুরীরত অবস্থায় কোন প্রকার সমস্যা হলে কেউ ম্যানেজিং কমিটিকে জানাতে পারবে না।সুপারের পছন্দ নয় এমন কার সাথে কোনো শিক্ষক চলাফেরা করতে পারবে না।
জানা গেছে, ২০২০ দাখিল পরীক্ষার বোর্ড নির্ধারিত ফিস ১৪৮৫ টাকা ছিল। কিন্তু সুপার ২৬ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩৫০০ টাকা আদায় করেন। ২০২১ দাখিল পরীক্ষার বোর্ড নির্ধারিত বিজ্ঞান বিভাগের জন্য ছিল ১৬৭৫ টাকা কিন্তু তিনি নিয়েছেন ৩৫০০ টাকা ও মানবিক বিভাগের জন্য ছিল ১৪৮৫ টাকা কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে নিয়েছেন ৩২০০ টাকা। এভাবে ৩২ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তিনি অতিরিক্ত ফি আদায় করেন। এ বছর ৩২ জন শিক্ষার্থীর ফরমপূরণ বাবদ আদায়কৃত টাকা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা তিনি আর ফেরত দেননি। ২০২২ দাখিল পরিক্ষার বোর্ড নির্ধারিত ফি সাধারণ ১৫৪৫ টাকা ও বিজ্ঞান বিভাগে ১৮১৫ টাকা। কিন্তু ৩৭ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে যথাক্রমে ২৪৫০ টাকা ও ২৭৫০ টাকা করে আদায় করেন । ২০২৩ সালে দাখিল পরিক্ষার বোর্ড নির্ধারিত ফিস সাধারণ-২৩০৫ টাকা ও বিজ্ঞান বিভাগে ২০২৫টাকা ছিল। কিন্তু ৩০ জন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করেন সাধারণ-৩৫০০ টাকা(সাধারণ) ও ৩৭০০ টাকা (বিজ্ঞান) করে আদায় করেন।
এছাড়া গবেষণাগারের সরঞ্জামাদি ক্রয়ের জন্য ২০২০ সালে ৬৫ হাজার টাকা ও ২০২১ সালে ৭২ হাজার ৪০০ টাকা সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সুপার যার কোনটি বাস্তবায়ন না করে নিজে আত্মস্যাৎ করেন। এছাড়াও ভোকেশনাল শাখার ছাত্রছাত্রীদের জন্য সরকারিভাবে ৪০টি প্লা¯িটকের টুল প্রদান কারা হয়। সুপার ১২টি টুল রেখে বাকিগুলো গোপনে বিক্রয় করে দেন । প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষক দিয়ে শ্রেণী কার্যক্রম ও কোচিং বাণিজ্য পরিচালনা, টাকার বিনিময়ে বহিরাগতদের সনদপত্র ও প্রশংসাপত্র প্রদান তার নিত্যনৈমিত্যিক কাজ। সুপারের দলীয় এবং পছন্দ নয় এমন শিক্ষক কর্মচারীকে তিনি নানাভাবে হয়রানি করেন এবং কারণ দর্শানো নোটিশ ইস্যু করেন। ২০১৯ সালে মোছাঃ ইভা খাতুন নামের একজন সহকারী শিক্ষক(বাংলা) এনটিআরসিএ কর্তৃক ওই মাদ্রাসায় নিয়োগের জন্য সুপারিসপ্রাপ্ত হন। সুপার তার কাছে এমপিও ভুক্ত করার জন্য ২ লক্ষ টাকা দাবি করেন। ইভা খাতুন অস্বীকৃতি জানালে সুপার তার বেতন ভাতার জন্য প্রয়োজনয়ি ব্যাবস্থা গ্রহণে বিরত থাকেন। পরবর্তিতে চাকুরীতে যোগদানের ১ বছর ২ মাস ২৭ দিন চাকুরী করার পর তিনি এমপিও ভূক্ত হন। এভাবে তিনি ১৫ মাসের বেতনভাতা যার পরিমান একলক্ষ ৯১ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বঞ্চিত হন। পরে তিনি ক্ষোভেÑদুঃখে চাকুরী ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।
এ বিষয়ে ইভা খাতুনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাকুরীতে যোগদানের পরে এমপিও ভূক্তির জন্য সুপার সাহেব টাকা দাবি করেন ।আমি টাকা দিতে না পারায় সুপার ১৫ মাস পরে আমার এমপিও ভূক্তির কাগজ পাঠান। পরে আমি অন্য ভাল প্রতিষ্ঠানে চাকুরী পেয়ে চলে আসি। আমার ১৫ মাসের টাকাও আমি পাইনি।
মোঃআশরাফুল ইসলাম আশিক (ট্রেড ইন্সট্যাক্টর,কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তি) জানান,আমার নিকট এমপিওভূক্ত করার জন্য সুপার ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন । আমি যোগদানের দিন সুপারকে ১৫ হাজার টাকা দিই। আর বাকি ৩৫ হাজার ১ সপ্তাহের মধ্যে দেওয়ার কথা হয় । কিন্তু সেই টাকা আমি যোগাড় করে দিতে না পারায় সুপার আমাকে অনেক বাজে কথা বলেন ও আমার কাগজপত্র এমপিও ভূক্তির জন্য পাঠান নি।পরে আমি আর ওই মাদ্রাসায় যায়নি। আমি সুপারের শাস্তি চাই।
মোঃ নাহিদ সুলতানের(ট্রেড ইন্সট্রাকটর,জেনারেল ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কস) কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুপার আমাকে যোগদানের পরে বলেন তার কথা মত কাজ না করলে ইভা ম্যাডামের মতই একই পরিণতি হবে। আমি যোগাদানের পর সুপার তার ব্যক্তিগত তহবিলে ৪ লক্ষ ও মাদ্রাসার তহবিলে ১ লক্ষ টাকা ডোনেশন হিসাবে জমা দেওয়ার জন্য আমাকে লিখিত নোটিশ দেন। আমি টাকা দিতে অপারগতা দেখালে তিনি আমাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করতে থাকেন। এছাড়াও সুপার চাকুরীর পর আমার কাছ থেকে ২৮ হাজার ৯৮১ টাকা ধার নেন। ওই ধারের টাকা পাইবার জন্য গত ২৫.৪.২৩ তারিখে আমি লিখিত আবেদন করি। তারপর থেকে তিনি আমাকে আরো বেশি করে চাপ ও হয়রানি করতে থাকেন । আমি আর কোন উপাই না পেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে তার বিরুদ্ধে আবেদন করতে চাইলে ওই কর্মকর্তা আমার কাছ থেকে দরখাস্ত না নিয়ে বলেন একই প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করতে গেলে মিলমিশ হয়ে থাকতে হয়। আমি আপনাদের দুইজনকে ডেকে বিষয়টি সমাধান করে দিব।
অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
নওয়াপাড়া হিজবুল্লাহ দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো: হাবিবুর রহমান বলেন,আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আপনি আমার মাদ্রাসায় এসেন আপনার সাথে সামনা সাননী কথা বলব।এ বলে তিনি ফোন কেঁটে দেন।
নওয়াপাড়া হিজবুল্লাহ দাখিল মাদ্রাসার সভাপতি মো: রেজাউল হোসেন বিশ^াস বলেন,আসলে এবিষয় গুলো আমার কোন কিছু জানা নাই । শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ ঝামেলার কারণে কিছু সমস্যা হয়েছে। এছাড়া আমার কিছু জানা নাই। আপনি মাদ্রাসায আসেনর আপনার সাথে সামনা সামনি কথা বলবো।
এবিষয়ে অভয়নগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: শহিদুল ইসলাম বলেন,এ সকল বিষয়ে আমার কোন কিছু যানা নাই। আমার কাছে কেউ কোন অভিযোগ দেয়নী। রেজুলেশনের বাইরে প্রতিষ্ঠানের কোন মালামাল গোপনে বিক্রয়ের কোন সুযোগ নাই। জেল খাটা কালীণ কীভাবে বেতন উঠাল এটা আমার জানা নাই। নির্ধারিত ফিসের বাইরে বেশি অর্থ নেওয়ার কোন সুযোগ নাই। যদি এমন কিছু করে থাকে সেটা অপরাধ বলে গণ্য হবে।















