আসছে বসন্ত বরণ, ভালবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস গদখালিতে শত কোটি টাকার ফুল বাণিজ্যের প্রস্তুতি

0
217

স্টাফ রিপোর্টার : ফেব্রুয়ারি-মার্চের পাঁচ দিবস ঘিরে শত কোটি টাকার ফুল বাণিজ্যের স্বপ্ন বুনছে ফুলের রাজধানীখ্যাত যশোরের গদখালি। ফেব্রুয়ারিতে বসন্ত বরণ, বিশ^ ভালবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং মার্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু’র জন্মদিন ও মহান স্বাধীনতা দিবস ঘিরে গোটা দেশেই থাকে অঢেল ফুলের চাহিদা। যার সিংহভাগ যশোরের গদখালি অঞ্চল পূরণ করে থাকে।
কৃষি বিভাগ বলছে, ফেব্রুয়ারি-মার্চের পাঁচ দিবস ঘিরে গদখালি এলাকা থেকে শত কোটি টাকার ফুল সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। যদিও কৃষকদের প্রত্যাশা, ফেব্রুয়ারিতেই তারা শত কোটি টাকার ফুল বিক্রি করতে সক্ষম হবেন। ইতোমধ্যে গোলাপ ক্ষেতের পঁচন রোগ থেকে তারা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। আর এবার গদখালিতে ফুলের দামও বেশি।
ইতোমধ্যে দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেছে বসন্ত বরণ উৎসব। একইদিনে বিশ্ব ভালবাসা দিবস এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের স্বরস্বতী পূজা। এরপরেই আসছে আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস। এই দিবসগুলো উদযাপনে ফুলের বিকল্প নেই। তাই ফুলের রাজধানীখ্যাত যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি-পানিসারা-হাড়িয়া অঞ্চলের ফুলচাষিরা বসন্ত বরণ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলে শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নিজেদের েেতর ফুলগাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
মূলত এই তিন দিবস ঘিরে জমে ওঠতে শুরু করেছে গদখালি ফুলবাজার। অন্য সময় থেকে বেশি দামে ফুল বিক্রি হওয়ায় এসময়ে ফুল গাছের বাড়তি যত্ন নেন কৃষকেরা। সময় যত ঘনিয়ে আসছে পাইকারি বাজারে ফুলের দামও ততো বাড়ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফুলের দাম বেড়েছে কয়েকগুন। ফুলচাষের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সামনের এই তিন দিবসে অন্তত একশো কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে।
যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপনন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, সারা বছর ফুল বিক্রি হলেও মূলত বসন্ত বরণ, ভালবাসা দিবস আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘিরে বেচাকেনা বেশি হয়। এ মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বিশেষ করে গোলাপ ফুলের উৎপাদন কম হয়েছে। তবে আসন্ন তিন দিবসকে ঘিরে অন্তত শত কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে বলে আমরা আশা করছি।
যদিও কৃষি বিভাগ বলছে, ফেব্রুয়ারি-মার্চের পাঁচ দিবস ঘিরে গদখালি এলাকা থেকে শত কোটি টাকার ফুল সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন কৃষকরা।
ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ হোসেন পলাশ বলেন, ঝিকরগাছা উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নে ৬৩০ হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হয়ে থাকে। ইতোমধ্যে ফেব্রুয়ারিতে বসন্ত বরণ, বিশ^ ভালবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং মার্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু’র জন্মদিন ও মহান স্বাধীনতা দিবস ঘিরে ফুলের বাজার ধরার জন্য স্থানীয় ফুলচাষী ও ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এবার ফুলের আবাদ ভাল হয়েছে; বাজারে দামও ভাল। এ কারণে এই দু’মাসে এই এলাকা থেকে শত কোটি টাকার ফুল সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে, আসন্ন দিবসগুলোর বাজার ধরতে প্রতিদিন কাকডাকা ভোরেই চাষিরা বিভিন্ন যানবাহনে তাদের উৎপাদিত ফুল নিয়ে আসছেন ফুলের পাইকারি গদখালি বাজারে। ক্রেতা-বিক্রেতার হাকডাকে সরব হয়ে উঠছে ফুলবাজার। যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের দু’ধারে বিভিন্ন জাতের ফুলের পসরা সাজিয়ে বসছেন কৃষক। কেউ ভ্যান, কেউ সাইকেল, মোটরসাইকেল বা ঝুড়ির মধ্যে ফুল রেখে ঢাকা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দরদামে ব্যস্ত তারা।
শুক্রবার গদখালি বাজারে প্রতিটি গোলাপ বিক্রি হয়েছে ১৪ থেকে ২০ টাকা দরে। এক সপ্তাহ আগে যা বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ১২ টাকায়। প্রতিপিস রজনীগন্ধা বিক্রি হয়েছে ১০-১২ টাকায়, যা আগে ছিল ৮-১০ টাকা। রঙিন গ্লাডিউলাস প্রতিটি মানভেদে বিক্রি হয়েছে ১২ থেকে ১৬ টাকা, যা আগে ছিল ৮-১০ টাকা। জারবেরা বিক্রি হয়েছে ৮ থেকে ১০ টাকা। তবে কৃষক বলছেন, এবছর জারবেরার উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম অপরিবর্তিত আছে।
ফুল বাঁধাইয়ের জন্য কামিনীর পাতা বিক্রি হয়েছে প্রতি আঁটি ২০ টাকায়। জিপসির আঁটি বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকায়। যা আগে ছিল ২০-২৫ টাকায়। মালা গাথার জন্য চন্দ্রমল্লিকা বিক্রি হয়েছে প্রতি ১০০ ফুল ২০০ টাকা। গাঁদা ফুল বিক্রি হয়েছে প্রতি হাজার ২৫০-৩০০ টাকায়, যা আগে ছিল ১০০-১৫০ টাকা। লিলিয়াম প্রতি পিস বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকা। দুইদিন আগেও যার দাম ছিল ১০০ টাকা।
পানিসারা গ্রামের সোহান আড়াই বিঘা জমিতে জারবেরা চাষ করেছেন। তিনি বলেন, এবছর ফুলের ভাল দাম পাওয়া যাচ্ছে। ইজতেমার কারণে শুক্রবার দাম একটু কম আছে। জারবেরা ৮-১০ টাকায় বিক্রি করছি। আগামী দুই তিনদিনে দাম আরো বাড়বে।
টাওরা গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম ৯ কাঠা জমিতে গোলাপ চাষ করেছেন। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে গোলাপের দাম ছিল ৮-১০ টাকা। আজ ২০ টাকা পর্যন্ত দাম উঠেছে।
হাড়িয়া নিমতলা গ্রামের ফারুক হোসেন ৩০০ পিস গোলাপ বিক্রির জন্য এনেছিলেন। তিনি বলেন, প্রতি ১০০ ফুল তিনি বিক্রি করেছেন ১৯৫০ টাকা। তিনি জানান, ২বিঘা জমিতে গোলাপ চাষ করেছি, এবছর পঁচন রোগের কারণে উৎপাদন কম। তবে দাম বেশি হওয়ায় তি পুষিয়ে নেয়া যাবে।
গদখালির ফুল ব্যবসায়ী রনি আহমেদ বলেন, বাজারে গোলাপের খুবই সংকট। ভালবাসা দিবসের আগের বাজারে ২৫ টাকায় ফুল পাওয়াও মুশকিল হয়ে যাবে।
আরেক ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, গাঁদা ফুলের দাম একটু কম ছিল। তবে শুক্রবার থেকে দাম উঠতে শুরু করেছে। প্রতি হাজার গাঁদা বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা।
টাওরা গ্রামের আক্তারুল ইসলাম বলেন, এবছর পঁচা রোগের কারণে গোলাপের উৎপাদন কম হয়েছে। এজন্য দাম বেশি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি, নাভারণ ও পানিসারা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে রয়েছে নানা জাতের ফুল। এই অঞ্চলের কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন গোলাপ, জারবেরা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, গাঁদা, লিলিয়াম, জিপসি, চন্দ্রমল্লিকাসহ অন্তত ১১ ধরণের ধরণের ফুল।
পহেলা ফাল্গুন বসন্ত উৎসব, ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালবাসা দিবস ও ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বাজার সামনে রেখে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন ফুল চাষিরা। উৎসব পর্যন্ত গাছে ফুল ধরে রাখতে, পোকার আক্রমণ ও পঁচন রোধে তারা বাড়তি পরিচর্যা করছেন।
টাওরা গ্রামের কামাল হোসেন বলেন, ভালোবাসা দিবসে রজনীগন্ধা ও ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবসে গাঁদা ফুল বিক্রি করবো। এজন্য এখন ফুলের পরিচর্যা করছি। বিশেষ করে, ফুল মান ভালো রাখতে এবং পোকামাকড়ের হাত থেকে রা করতে ভিটামিন ও কীটনাশক ব্যবহার করছি। আশা করছি, ভালো দামে ফুল বিক্রি করতে পারবো।
হাড়িয়া নিমতলা গ্রামের নয়ন হোসেন বলেন, ১৮কাঠা জমিতে গোলাপের চাষ করছি। ১৪ ফেব্রুয়ারিতে বিক্রির জন্য ফুলে ক্যাপ পরিয়ে রাখা হয়েছে। এখন নানা ধরনের ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে, যাতে ফুল নষ্ট না হয়।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here