ছয় দিবস ঘিরে গদখালিতে শত কোটি টাকার ফুল বাণিজ্যের প্রস্তুতি ভারত থেকে ফুল আসায় ভালোবাসা দিবসের বাজার ধরতে পারেনি চাষীরা

0
216

জসিম উদ্দীন : ফেব্রুয়ারি-মার্চের পাঁচ দিবস ও বাংলা নববর্ষ ঘিরে শত কোটি টাকার ফুল বাণিজ্যের স্বপ্ন বুনেছিল ফুলের রাজধানীখ্যাত যশোরের গদখালির চাষীরা। বসন্ত বরণ, বিশ^ ভালবাসা দিবস ,আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, মার্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু’র জন্মদিন ও মহান স্বাধীনতা দিবস এবং পহেলা বৈশাখ ঘিরে গোটা দেশেই থাকে অঢেল ফুলের চাহিদা। যার সিংহভাগ যশোরের গদখালি অঞ্চল পূরণ করে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে চাষীদের স্বপ্নে জল ঢালতে উঠে পড়ে লেগেছে একটি মহল। তারা এরই মধ্যে ভারত থেকে বিভিন্ন রকম ফুল আমদানি করে দেশের বিভিন্ন জেলাতে সরবরাহ করতে শুরু করেছে। গদখালির চাষীরা সড়ক অবরোধ করে এঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এ চক্রকে থামাতে চাষীরা জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফুল চাষীরা জানান, গোলাপ ক্ষেতের পঁচন রোগ থেকে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আর এবার গদখালিতে ফুলের দামও বেশিছিল। বসন্ত বরণ উৎসব ও বিশ্ব ভালবাসা দিবস এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের স্বরস্বতী পূজা ঘিরে ৫/৬দিনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলাতে প্রায় বিশ কোটি টাকার ফুল গেছে। এরপরেই আসছে আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস। এসব দিবসগুলো উদযাপনে ফুলের বিকল্প নেই। তাই ফুলের রাজধানীখ্যাত যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি-পানিসারা-হাড়িয়া অঞ্চলের ফুলচাষিরা শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন হঠাৎ করে গত ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজধানীতে ফুল যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কারন জানতে ভারত থেকে ফুল আসার তথ্য বেরিয়ে আসে। এ ফুল গদখালি বাজারেও নামে। যার দরুন ২৫ টাকার গোলাপ নেমে আসে ১৫ টাকায়, ৩০ থেকে ৩৫ টাকার চায়না রোজ নেমে আসে ২০টাকায়। এছাড়া প্রায় সব ফুলের দামের উপর প্রভাব পড়ে। ফুল চাষের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এখানের সারা বছরই গোলাপের চাষ হয় কিন্তু আশানুরুপ লাভ হয়না। তারা গোলাপে লাভ করার জন্য মুলত বসন্তবরন এবং ভালোবাসা দিবস টার্গেট করেন। অথচ এই সময় ভারত থেকে এসেছে মন্টিগোলাপ। গত ৫/৬ দিনের বাজার দেখে চাষীদের ধারনা ছিল লক্ষ্যের চেয়েও বেশী দামের ফুল বিক্রি করা সম্ভব হবে। চাষীরা জানান, সপ্তাহ আগে গদখালি বাজারে প্রতিটি গোলাপ বিক্রি হয়েছে ১৪ থেকে ২৫ টাকা দরে। আগে যা বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ১২ টাকায়। প্রতিপিস রজনীগন্ধা বিক্রি হয়েছে ১০-১২ টাকায়, যা আগে ছিল ৮-১০ টাকা। রঙিন গ্লাডিউলাস প্রতিটি মানভেদে বিক্রি হয়েছে ১২ থেকে ১৬ টাকা, যা আগে ছিল ৮-১০ টাকা। জারবেরা বিক্রি হয়েছে ৮ থেকে ১০ টাকা। তবে কৃষক বলছেন, এবছর জারবেরার উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম অপরিবর্তিত আছে। ফুল বাঁধাইয়ের জন্য কামিনীর পাতা বিক্রি হয়েছে প্রতি আঁটি ২০ টাকায়। জিপসির আঁটি বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকায়। যা আগে ছিল ২০-২৫ টাকায়। মালা গাথার জন্য চন্দ্রমল্লিকা বিক্রি হয়েছে প্রতি ১০০ ফুল ২০০ টাকা। গাঁদা ফুল বিক্রি হয়েছে প্রতি হাজার ২৫০-৩০০ টাকায়, যা আগে ছিল ১০০-১৫০ টাকা। লিলিয়াম প্রতি পিস বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকা। দুইদিন আগেও যার দাম ছিল ১০০ টাকা। যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপনন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, সারা বছর ফুল বিক্রি হলেও মূলত বসন্ত বরণ, ভালবাসা দিবস আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘিরে বেচাকেনা বেশি হয়। এ মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বিশেষ করে গোলাপ ফুলের উৎপাদন কম হয়েছে। তবে আসন্ন তিন দিবসকে ঘিরে অন্তত শত কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে বলে আমরা আশা করছিলাম। তাছাড়া এখানে পাঁচটি ইউনিয়নের মানুষের জীবন চলে ফুল চাষের উপর। প্রতিকুল পরিবেশ কাটিয়ে এবার চাষীরা আশায় বুক বেঁধেছিল ভালো লাভের আশায়। বাজারও ভালো ছিল । হঠাৎ করে ভারত থেকে ফুল আমদানি করে চাষীদেও মাঝে হতাশা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা আধা ঘন্টা যশোর বেনাপোল মহাসড়ক অবরোধ কওে এর প্রতিবাদ জানিয়েছি। তাছাড়া জেলাপ্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করবো ভারত থেকে ফুল আমদানি আটকানোর জন্য। ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ হোসেন পলাশ বলেন, ঝিকরগাছা উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নে ৬৩০ হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হয়ে থাকে। ইতোমধ্যে ফেব্রুয়ারিতে বসন্ত বরণ, বিশ^ ভালবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং মার্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু’র জন্মদিন ও মহান স্বাধীনতা দিবস ও পহেলা বৈশাখ ঘিরে ফুলের বাজার ধরার জন্য স্থানীয় ফুলচাষী ও ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এবার ফুলের আবাদ ভাল হয়েছে; বাজারে দামও ভাল। এ কারণে এই দু’মাসে এই এলাকা থেকে শত কোটি টাকার ফুল সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ভারত থেকে ফুল আমদানি যদি আটকানো না যায় তাহলে পথে বসবে এ অঞ্চলের মানুষ। হাড়িয়া নিমতলা গ্রামের মাসুদ হোসেন ৩০০ পিস গোলাপ বিক্রির জন্য এনেছিলেন সকালে, তিনি বলেন, ১০০ ফুল তিনি বিক্রি করেছেন ১৫০০ টাকায়। বাকিটা বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। তিনি জানান, ২বিঘা জমিতে গোলাপ চাষ করেছি, এবছর পঁচন রোগের কারণে উৎপাদন কম। তবে দাম বেশি হওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছিলাম। হঠাৎ করে ভারত থেকে মন্টিগোলাপ এসে একেবারে বাজার পড়ে গেছে। গদখালির ফুল ব্যবসায়ী রনি আহমেদ বলেন, ভালোবাসা দিবস ঘিরে ফুল চাষী, ব্যবসায়ীদের আনদে মলিন হয়ে গেছে ভারত থেকে ফুল আসায়। সরেজমিনে দেখা যায়, ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি, নাভারণ ও পানিসারা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে রয়েছে নানা জাতের ফুল। এই অঞ্চলের কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন গোলাপ, জারবেরা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, গাঁদা, লিলিয়াম, জিপসি, চন্দ্রমল্লিকাসহ অন্তত ১১ ধরণের ধরণের ফুল। পহেলা ফাল্গুন বসন্ত উৎসব, ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালবাসা দিবস ও ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখের বাজার সামনে রেখে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন ফুল চাষিরা। উৎসব পর্যন্ত গাছে ফুল ধরে রাখতে, পোকার আক্রমণ ও পঁচন রোধে তারা বাড়তি পরিচর্যা করেছেন। টাওরা গ্রামের কামাল হোসেন বলেন, ভালোবাসা দিবসে রজনীগন্ধা ও ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবসে গাঁদা ফুল বিক্রি করবো। ফুলের মান ভালো রাখতে এবং পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করতে ভিটামিন ও কীটনাশক ব্যবহার করেছি। আশা করেছি, ভালো দামে ফুল বিক্রি করবো। করছিলামো তাই। হঠাৎ করে একটি চক্র ভারত থেকে ফুল আমদানি করেছে। আমাদের পথে বসার উপক্রম হয়ে পড়েছে। নিমতলা গ্রামের মনির হোসেন বলেন, ১৮কাঠা জমিতে গোলাপের চাষ করছি। ১৪ ফেব্রুয়ারিতে বিক্রির জন্য ফুলে ক্যাপ পরিয়ে রাখা হয়েছে। নানা ধরনের ওষুধ স্প্রে করা হয়েছে, যাতে ফুল নষ্ট না হয়। অর্ধেক ফুল ভালো দামে বিক্রি করেছি হঠাৎ করে ভারত থেকে ফুল আসায় বাজার মুল্য কমে গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here