বাগেরহাটের মোংলায় সুন্দরবন ও সংশিষ্ট জলজ বাস্ততন্ত্রে দূষণ প্রতিরোধ ও বিশ মুক্ত মাছ ধরা বিষয়ে যৌথ পরিদর্শন।

0
194
বাগেরহাট প্রতিনিধি : বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলায় চিলা ইউনিয়নের জয়মুনি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপা্ই রেঞ্জ স্টেশনে সুন্দরবন ও সংশিষ্ট জলজ বাস্ততন্ত্রে দূষণ প্রতিরোধ ও বিশ মুক্ত মাছ ধরা বিষয়ে এক যৌথ পরিদর্শন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আরণ্যক ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগীতায় রিহ্যাবিলাইটেশন ইমপ্লয়মেন্ট  এন্ড ডেভেলপমেন্ট ফর দি ইয়ুথস (রেডি) এর বাস্তবায়নে ১২ জুন বুধবার সকাল ১১ টায় এই যৌথ পরিদর্শন অনুষ্ঠিত হয়।
রিহ্যাবিলাইটেশন ইমপ্লয়মেন্ট  এন্ড ডেভেলপমেন্ট ফর দি ইয়ুথস (রেডি) এর সহকারি প্রকাল্প ব্যবস্হাপক শেখ মারুফ হোসেনের সঞ্চালনায় এ সময় উপস্হিত ছিলেন সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাট এর সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব, সিনিয়র উপজেলা মৎস অফিসার অঞ্জন বিশ্বাস, টুরিস্ট পুলিশ সুন্দরবন জোন অফিসের অফিসার ইনচার্জ সুজিৎ দাস, বাংলাদেশ পরিবেশ অন্দলন (বাপা) এর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মো: নূর আলম শেখ,  সংশিষ্ঠ প্রকল্প ব্যাবস্হাপক শেখ মাসুম, বনজীবি,মৎস্যজীবি জেটিবোর্ড চালক, টুরিস্ট গাইড, টুরিস্ট এজিন্সির প্রতিনিধি,পরিবেশ কর্মি,গণমাধ্যম কর্মি স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, গণমান্য ব্যক্তি বর্গ, সহ প্রমূখ।
এসময় সঞ্চালক শেখ মারুফ হোসেন বলেন, সুন্দরবন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যনগ্রোভ এলাকা। রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এই বন পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ইকোসিস্টেম। প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলের প্রতিরক্ষা ঢাল হিসাবেো কাজ করে আসছে সুন্দরবন। বঙ্গোপসাগর থেকে সৃষ্টি হওয়া যেকোন ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে এই সুন্দরবন। প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের জলভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ বর্গ কিলোমিটারের বেশি যা সমগ্র সুন্দরবনের ৩১ দশমিক ১৫ ভাগ। সুন্দরবনের তিনভাগের প্রায় একভাগ জুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে ১৩টি বড় নদ-নদীসহ ৪৫০টির মতো খাল। এসব নদী-খালে অনেক জেলে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করে যা সুন্দরবনের প্রাণ-বৈচিত্রের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বিষ দিয়ে মাছ শিকার। এ ছাড়া বিষ প্রয়োগকৃত পানি পান করে বাঘ, হরিণসহ বনের নানা প্রাণীও বিভিন্নভাবে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এইসব অসাধু জেলেদের জন্য সুন্দরবনের শুধু মাছ নয়, মূল্যবান বনজ ও মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে।  বিষ দিয়ে শিকার করা মাছ পুরো বাংলাদেশে বিক্রি হয়। এতে সারা দেশের সব মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা হুমকির মুখে। বিষাক্ত পানির মাছ খেলে মানুষের পেটের পীড়াসহ কিডনি ও লিভারে জটিলতা দেখা দেয়। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা বাড়ে। মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়। উপকূলীয় এলাকায় পানীয় জলের উৎসগুলোও বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক জটিলতা তৈরি করে। যেসব খালে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়, তার বিষক্রিয়া ঐ এলাকায় চার মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত থাকে। বিষক্রিয়ায় মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। যা অদূর ভবিষ্যতে তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। কীটনাশকমিশ্রিত পানি ভাটার টানে সমুদ্রের দিকে যায়, তখন সেই এলাকার মাছও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  বিষের ব্যবহার বন্ধ না হলে সুন্দরবনসহ অন্যান্য নদী-খালে ভবিষ্যতে মাছের সংকট তীব্র হবে।
বিষ ব্যবহারের কারণে মাছসহ সব প্রজাতির জলজ প্রাণীই মারা যায়। এতে ঐ এলাকার খাদ্যচক্রে প্রভাব পড়ে। বিষাক্ত মাছ, পোকা-মাকড় ও পানি খেয়ে পাখি, বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে।
এসময় তিনি আরও বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্য আমাদের চারপাশে অবস্থান করে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করছে। সুন্দরবনের সৌন্দর্য নষ্ট করে জীব-বৈচিত্রের ক্ষতি করে চলেছে প্লস্টিক বর্জ্য। প্লাস্টিক দূষণ সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও তাদের আবাসস্থল, খাদ্য সংগ্রহের স্থান ও উদ্ভিদের খাদ্য গ্রহণের পথে বাধার সৃষ্টি করছে। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে প্লস্টিক বর্জ্যরে জন্য। প্লাস্টিক উপাদানগুলো সুন্দরবনের নালা-নর্দমা, খাল এমনকি নদীর পনি প্রবাহকে বাধা গ্রস্থ করছে। ক্লোরিনযুক্ত প্লাস্টিক ক্ষতিকারক রাসায়নিকগুলি সুন্দরবনের আশেপাশের মাটিতে ছেড়ে দিতে পারে, যা পরে ভূগর্ভস্থ পানি বা সুন্দরবনের আশেপাশের পানির উৎস এবং বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। এটি সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার পানি পানকারী প্রজাতির মারাত্মক ক্ষতি করাতে পারে। প্লাস্টিক পণ্যের সরাসরি সংস্পর্শে ত্বকের রোগ হতে পারে। প্লাস্টিকের দ্রব্যগুলো ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে মাইক্রো-প্লাস্টিকে পরিনত হচ্ছে যা সুন্দরবনের মাছ এর মাধ্যমে অবার মানব দেহে ফিরে আসছে। সুন্দরবনে কচ্ছপের গায়ে পলিথিন জড়িয়ে যাওয়ায় তারা মারা যাচ্ছে। পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্বক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে প্লাস্টিক দূষণ যার মাধ্যমে সুন্দরবনের পানি, মাটি, নদী সবই দূষিত হচ্ছে। প্লাস্টিক প্যাকেজিং খাদ্য বা প্লাস্টিকের মধ্যে রাখা খাবার গ্রহণের ফলে প্লাস্টিকে থাকা রাশয়নিক পদার্থ খাবারের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে ক্রমাগত বাড়ছে হজমের সমস্যা, হরমোন জনিত সমস্যা, এজমা, হচ্ছে গর্ভপাত, বাড়ছে ক্যানসারসহ আরোও অজানা রোগ। প্রতিবছর অনুমানিক ৯০লক্ষ টন প্লাস্টিক সমুদ্রে জমা হচ্ছে। এগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে মাইক্রো প্লাস্টিকে রূপান্তরিত হয়। যার একটি অংশ ডলপিন, সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর আহারের মাধ্যমে পাকস্থলিতে আটকে তাদের মৃত্যু ঘটায় এতে মাছ ও অন্যান্য জীব-বৈচিত্র আজ হুমকির মুখে। প্লাস্টিক মাটিতে মিশবে না পনিতে পোঁচবে না, পোড়ালে তৈরী হয় ডাইঅক্সিন বেনজো ফোরানের মতো বিশাক্ত গ্যাস যা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর। প্লাস্টিক দহনের ফলে উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইড বিশ্ব উষ্ণায়নের সৃষ্টি করছে। প্লাস্টিক দূষণ বাস্তুতন্ত্র ও জীব বৈচিত্র প্রত্যক্ষ ও পরক্ষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। নষ্ট করছে পরিবেশের ভারসাম্য। হুমকিতে পড়ছে পরিবেশ, প্রাণ ও প্রকৃতি। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে আমাদেরকে সুন্দরবনে ভ্রমণ কিংবা জিবিকা নির্বাহের জন্য বনের মধ্যে প্লাস্টিকের বোতল, ব্যাগ এবং অন্যান্য প্লাস্টিক সামগ্রী ফেলে না আসা। সুন্দরবনে ভ্রমণের সময় প্রয়োজনীয় প্লাস্টিক উপকরণ ব্যবহার শেষে সুন্দরবনের মধ্যে না ফেলে ফেরত নিয়ে আসা। সুন্দরবনে আগত পর্যটক, বনজীবি ও মৎসজীবিসহ সংশ্লিষ্ট সকলে একবার ব্যবহৃত প্লাস্টিক পণ্যের পরিবর্তে বিকল্প ব্যবহার করা। প্লাস্টিক পন্যের যত বিকল্প রয়েছে তা জনগনের মাঝে জনপ্রিয় ও সহজলোভ্য করা। প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার কম করা আমাদের অভ্যাসে পরিনত করা। পলিথিন ও প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরী পন্য উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি করে পরিবেশকে সুস্থ্য ও ভালো রাখা যায় ভালো রাখা যায় এর জীব বৈচিত্রকে।
এসময় তিনি আলোচনা করেন।এসময় বক্তরা বলেন, প্লাস্টিক দূষণ একটি অভিশাপ। প্লাস্টিকের বর্জ্য জলবাযু পরিববর্তনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সুন্দরবরে ভ্রমণ কিংবা জিবিকা নির্বাহের জন্য বনের মধ্যে প্লাস্টিক সামগ্রী ফেলে আসছে। সুন্দরবনের যেখানে সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্য না ফেলে নির্দষ্ট স্থানে ফেলতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। জেটি বোর্ড মালিক সমিতি, বোর্ড চালকরা তাদের ভ্রমণশেষে প্লাস্টিক বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে বুঝে দিলে সুন্দরবনে প্লাস্টিক দুষণ কমানো যাবে।
এসময় বক্তরা বলেন, সুন্দরবন আমাদের সকলের আসুন আমরা সকলে সুন্দরবনের খাল ও নদী থেকে প্লাস্টিক সামগ্রী অপসারন করি ও অন্যকে উৎসাহিত করি। আসুন সুন্দরবনের খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধ করি ও অন্যকে উৎসাহিত করি। সুন্দরবন ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকবো। সুন্দরবনের পরিবেশ, জীব-বৈচিত্র রক্ষায় এগিয়ে আসি। সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে সরকার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করলেও সেই এলাকার মধ্যে অর্ধশতাধিক ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দেখা যায়, খাদ্য বিভাগের বিশাল খাদ্য গুদাম, সিমেন্ট কারখানা, এলপি গ্যাস প্লান্ট, অয়েল রিফাইনারি, বিটুমিন, সি ফুড প্রসেসিং ফ্যাক্টরিসহ বহু কারখানা রয়েছে। এসব শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে পশুর নদে, যা বনের মাটি ও নদীতে মিশছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here