আজ মহান বিজয় দিবস , পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ভূখন্ডের নাম জানান দেয়ার দিন।

0
252

স্টাফ রিপোর্টার : আজ মহান বিজয় দিবস, বাঙালি জাতির হাজার
বছরের শৌর্যবীর্য এবং বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিন।
বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দিন। পৃথিবীর মানচিত্রে
বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ভূখন্ডের নাম জানান দেয়ার দিন।
১৯৪৮ থেকে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান,
২৫ মার্চে গণহত্যা শুরু হলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার
ঘোষণা, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং রক্তক্ষয়ী
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ শহীদ ও দু’লাখ মা-বোনের
আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ১৬
ডিসেম্বর পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত
বিজয় অর্জিত হয়। সেই হিসেবে বিজয়ের ৫৩ বছর পূর্তির দিন
আজ। দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও গণপ্রজাতন্ত্রী
বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস
পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।
প্রত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা করবে
যশোর প্রশাসন। এরপর বিজয় স্তম্বে পুস্পস্তবক অর্পন, সকল
সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত এবং বেসরকারি ভবনে
আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, মুক্তিযোদ্ধা ভিক্তিক
চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, ক্রীড়া অনুষ্ঠান/গ্রামীণ খেলা, চারু,
কারু ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের সমারোহে বিজয়মেলা, বীর
মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, সকল মসজিদ, মন্দিও
গীর্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে দেশের
শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও উপাসনার
আয়োজন করা হয়েছে। এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, হাসপাতাল,
জেলখানা, শিশু বিকাশ কেন্দ্রসহ অনুরূপ প্রতিষ্ঠানসমূহে
উন্নতমানের খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া বীর
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, চিকিৎসা প্রদান ও
ঔষধ সরবরাহ, সবশেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা
হয়েছে ।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি পরাধীনতার শেকল ভেঙ্গে
প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করে। ২৪ বছরের নাগ পাশ ছিন্ন
করে জাতির ভাগ্যাকাশে দেখা দেয় এক নতুন সূর্যোদয়। প্রভাত
সূর্যের রক্তাভা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।
সমস্বরে একটি ধ্বনি যেন নতুন বার্তা ছড়িয়ে দেয় পূর্ব
দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল। মহামুক্তির আনন্দ ঘোর
এই দিনে এক নতুন উল্লাস জাতিকে প্রাণ সঞ্চার করে সজিবতা
এনে দেয়। যুগ যুগ ধরে শোষিত বঞ্চিত বাঙালি চোখে আনন্দ
অশ্রু আর ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যায় সামনে।
বিন্দু বিন্দু স্বপ্নের অবশেষে মিলিত হয় জীবনের মোহনায়। বিশ্ব
কবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী
বাংলা, রূপের তাহার নেইকো শেষ, বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।
বাঙালি যেন খুঁজে পায় তার আপন সত্তাকে। আদি বাঙালির
সাংস্কৃতিক ও আর্থ-সামাজিক জীবন এবং ক্রমবিকাশের
চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে বাঙালির শৌর্য-বীর্য যেন আর একবার ধপ
করে জ্বলে উঠে। প্রথম আগুন জ্বলে ’৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি।
ফাগুণের আগুনে ভাষা আন্দোলনের দাবি আর উন্মাতাল গণমানুষের
মুষ্টিবদ্ধ হাত একাকার হয়ে যায় সেদিন। ভাষার জন্য প্রথম বলীদান
বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করে। সেই থেকে শুরু হয়ে যায়
বাঙালির শেকল ভাঙার লড়াই। পাকিস্তানিদের সাথে হিসেব-
নিকেশের হালখাতার শুরুতেই রক্তের আঁচড় দিয়ে বাঙালি শুরু করে
তার অস্তিত্বের লড়াই। পলাশীর আম্রকাননে হারিয়ে যাওয়া সেই
সিরাজদ্দৌলা আবার এ লড়াইয়ে সেনাপতি হিসেবে আবির্ভূত
হন। ’৫২ সালে যে আগুন জ্বলেছিল রাজধানী ঢাকা শহরে, সে আগুন
যেন ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশের আনাচে-কানাচে
সবখানে। বাঙালির বুকের ভেতর জ্বলে উঠা আগুন যেন সহস্র
বাঙালির মধ্যে প্রবাহিত হতে থাকে। বাষট্টি, ঊনসত্তর এবং সত্তর
শেষ করে একাত্তরে বাঙালি জাতি হিসাব করতে বসে। হিসেব-
নিকেশ আর দেনা-পাওনায় পাকিস্তানিরাও বসে নেই। তারাও অংক
কষতে থাকে কিভাবে বাঙালি জাতিকে যুগ যুগ ধরে পরাধীনতার
শেকল পরিয়ে রাখা যায়। তাদের কাছে এই অলংকারই বাঙালির শ্রেষ্ঠ
প্রাপ্য। ঘড়ির কাঁটার টিক টিক শব্দ জানিয়ে যায় সময় আসছে
হিসেব নিকেশ চুকিয়ে দেয়ার পালা। অবশেষে গভীর কালো নিকষ
আঁধার থেকে জেগে উঠে হিরন্ময় হাতিয়ার। চূড়ান্ত লড়াইয়ের
প্রস্তুতি নিতে থাকে বাঙালি। বাঙালি বুঝে যায়, শেষ কামড়
দেয়ার সময় আসন্ন। পাকিস্তানিরাও আর বসে থাকে না। পুরো
জাতিকে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে মারাত্মক মারণাস্ত্র নিয়ে ২৫ মার্চ
একাত্তরে ঘুমন্ত জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় বাঙালি নিধন
যজ্ঞ। বাতাসে লাশের গন্ধ, বারুদে বারুদে আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন
আকাশ। এ যেন এক প্রেতপুরী। আকাশে শকুনের উদ্যত থাবা,
নিচে বিপন্ন মানুষের বিলাপ। হায় বাংলাদেশ। একি বাংলাদেশ। এ
যেন এক জ্বলন্ত শ্মশান। কিন্তু ঠিকই হাড়ের আর খুলির স্তুপ একদিন
পাললিক হয়। মুক্তি পাগল বাংলার দামাল ছেলেরা স্বাধীনতার রক্ত
সূর্যকে ছিনিয়ে আনবে বলে একদিন অস্ত্র কাঁধে তুলে নেয়।
ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার সবাই
শরিক হয়ে থাকে এ লড়াইয়ে। যতই দিন অতিবাহিত হতে থাকে
আরো শাণিত হয় প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার অস্ত্র। লক্ষ্য স্থির রেখে শত্রু
হননে দৃঢ়তায় এগিয়ে যায় বীর বাঙালি। ইতোমধ্যেই বাঙালির
স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন স্পষ্ট হয়ে
উঠে। প্রতিবেশী ভারতও জড়িয়ে পড়ে বাঙালির ভাগ্য যুদ্ধে।
ডিসেম্বর শেষ পর্যায়ে এসে চূড়ান্ত রূপ নেয় এই যুদ্ধের। অবশেষে
ন’মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে
আসে নতুন প্রভাত। ১৬ ডিসেম্বর সূর্যোদয়ের সাথে সাথে
সূচিত হল মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য বিজয়। এর মধ্য দিয়ে এলো
হাজার বছরের কাঙ্খিত স্বাধীনতা। বাঙালি জাতি এদিন অর্জন
করে তার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকার। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ২ লাখ
ধর্ষিতা মা-বোনের সম্ধসঢ়;ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা ধরা দেয়
বাঙালির জীবনে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here