তৌহিদ উদ দৌলা রেজা, মেহেরপুর : দেশ জুড়ে সবজি গ্রাম হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার সাহারবাটি গ্রামের। বছরের বেশির ভাগ সময় মাঠ জুড়েই আবাদ হয় বিভিন্ন ধরনের সবজির। এ জেলায় উৎপাদিত সবজি নিজ এলাকার চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী শহর ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, বরিশাল, ভোলা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে সরবরাহ করা হয়। তবে এ মৌসুমে সবজি গ্রাম সাহারবাটির কৃষকগণ ফুলকপি চাষেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রায় দুই কোটি টাকা। গ্রীষ্মকালীন সবজির শেষে বর্তমানে শীতকালীন সবজি হিসেবে এখন মাঠ জুড়ে রয়েছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, সিম, টমেটো, বেগুন, মরিচসহ নানা জাতের সবজি। অন্যান্য বছরে চাহিদা থাকলে এবার ফুলকপি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় খরচ তো দূরের কথা মূলধন হারাতে বসেছে চাষিরা। তবে কৃষি বিভাগ বলছে চাহিদার তুলনায় বেশি চাষ হওয়ায় সবাই একসাথে সব ফুলকপি না তুলে পর্যায়ক্রমে তুলতে তবেই লোকসান কিছুটা কম হবে।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, মেহেরপুর জেলার মাটি ও আবহাওয়া সকল ধরনের সবজি চাষের উপযোগী। মেহেরপুরের তিন উপজেলা সদর, মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলায় মৌসুমে ১ হাজার ২শ ৪০ হেক্টর ফুলকপির চাষ হয়েছে। শীতকালে সবজির দর স্বাভাবিকভাবেই গ্রীষ্মকালের চেয়ে কম থাকে। তবে এবারের চিত্রটা ভিন্ন। মেহেরপুরসহ সারাদেশে ব্যাপকভাবে কপি আবাদ হওয়ায় বাজারে বিরুপ প্রভাব পড়েছে। ক্ষেত থেকে প্রতি পিচ ফুলকপি ২ টাকা থেকে তিন টাকাই বিক্রি হচ্ছে। এই দামে ক্ষেত থেকে কপি তোলার খরচই উঠছে না কৃষকের।
মাঠঘুরে কৃষকের সাথে কথা বলে জানাগেছে, সবজি গ্রাম সাহারবাটিতে মাঠের পর মাঠ শুধুই ফুলকপি এই গ্রামেই রয়েছে ১৬০ হেক্টর ফুলকপি। এবছর প্রচন্ড শীত ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আশানুরুপ ফলন হলেও বাজার মূল্য না পাওয়ায় হতাশ চাষিরা। যেখানে শীতকালীন সবজি ওঠার শুরুতেই অল্প কিছু ফুলকপি ওঠাতে প্রতি পিস কপি বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা দরে। সেখানে গত এক সপ্তাহে কৃষকের জমি থেকে প্রতি পিস কপি সাইজ অনুযায়ী ১ থেকে ২ টাকা এবং খুব ভালো ও বড় কপি ৩ টাকা দরে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন আড়ৎ মালিকেরা। পাইকারী বাজার ক্রেতাশুন্য হয়েছে পড়েছে, ফলে ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে ফুলকপি সবজি। দাম না থাকায় অনেকেই গরু-ছাগলের খাবার হিসেবে ছেড়ে দিচ্ছেন আবার কেউ জমিতেই চাষ করে মাটিতেই মিশিয়ে দিচ্ছেন। চাষিদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যে ১ বিঘা জমিতে ৪ হাজার চারা লাগানো যায়। প্রতি বিঘা জমিতে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। ১৬০ হেক্টর জমিতে খরচ হয়েছে ৩ কোটি টাকা। অধ্যবধি যে দামে ফুলকপি বিক্রয় হচ্ছে তাতে গড় হিসেবে দেখা গেছে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে এসকল চাষিদের।
এ গ্রামের ফুলকপি চাষি আনারুল ইসলাম জানান, গতবছর ভালো দাম পাওয়ায় আমি তিন বিঘা জমিতে ফুলকপির চাষ করেছি। শীতকালীন চাষে প্রতি বিঘা ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকা করে খরচ হয়েছে। বড় বড় কপি বড় হলেও বিক্রি না হওয়ায় গরু-ছাগলকে খাওয়ানোর জন্য ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু গরু ছাগলের জন্যও কেউ নিচ্ছে না তাই আমি ফুলকপিসহ জমি চাষ করে ফেলছি। এদিকে অন্য আবাদের সময় পার হয়ে যাচ্ছে তাই চাষ করে ভুট্টা বপন করছি।
বতর্মানে জমিতে যে পরিমাণ কপি আছে তা তুলতে ঘর থেকে বিঘাপ্রতি ছয় হাজার টাকা লোকসান দিতে হবে। সারের দোকানের বাকী টাকা পরিষোধ করা নিয়েও বিপাকে পড়েছেন তিনি। একদিকে কপি বিক্রি করতে না পারা অপরদিকে সার সিন্ডিকেটে পড়ে মূলধন হারাতে বসেছেন তারা। তিনি সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করেন।
চাষি আমানুর রহমান চাষ করেছেন ১৪ বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করে এবার পরিবার নিয়ে পথে বসার জোগাড়। বাজারে চাহিদা তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় আড়ৎ মালিকদের ফুলকপি কিনতে আগ্রহ নেই। তাই বাধ্য হয়ে ফুলকপির জমি পরিষ্কার করার জন্য এক ট্রাক ফুলকপি মাত্র ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। একই কথা জানালেন ফুলকপি চাষি খলিলুর রহমান, আলামিন হোসেনসহ অনেকেই।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিজয় কৃষ্ণ হালদার বলেন, ভৌগলিক কারণে মেহেরপুর জেলা অনেকটাই প্রাকৃতিক দুর্যোগমুক্ত। ফলে সারা বছরই সবজি আবাদ হয়ে থাকে। চলতি মৌসূমে ফুলকপিসহ শীতকালীন সবজি রয়েছে ৪ হাজার ৯৩৫ হেক্টর জমিতে। সারাদেশে একই সাথে উঠছে শীতকালীন ফুলকপিসহ বিভিন্ন সবজি। এতে স্বাভাবিকভাবেই দর পতন হয়েছে। তাই কিছুটা লোকসান পুশিয়ে নিতে একই দিনে সব সবজি না তুলে পর্যায়ক্রমে তোলার আহবান জানালেন এই কৃষি কর্মকর্তা।















