মিশকাতুজ্জামান,নড়াইল:নড়াইলে সম্প্রতি দু’টি হত্যাকাণ্ডের জেরে কমপক্ষে দেড়’শ একর জমির ধান ঘরে তোলা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
কালিয়ার সিলিমপুরে হাসিম মোল্যা হত্যাকান্ডে আসামি পক্ষের অভিযোগ বোরো ধান কাটতে গেলে তাদের বাঁধা দেয়া হচ্ছে। কাটতে হলে মোটা অংকের চাঁদা দিতে হবে।
লোহাগড়ার লাহুড়িয়ায় মুক্তিযোদ্ধা আকবর শেখ হত্যাকান্ডের ঘটনায় শতাধিক পরিবার বাড়ি ছাড়া। এলাকায় আসামি পক্ষের কাওকে ঢুকতেই দেয়া হচ্ছে না। গত ১৫ মার্চ কালিয়ার হামিদপুর ইউনিয়নের সিলিমপুর গ্রামের হাসিম মোল্যা খুন হয়।
জানা যায়,সিলিমপুর ও গাজীরহাট এলাকার আধিপত্য বিস্তার ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় হামিম মোল্যা ও মফিজুল ইসলাম ঠান্ডু গ্রুপের সাথে জনি মোল্যা গ্রুপের দ্বন্দ্বের জেরে এ খুনের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় নিহতের পিতা কাদের মোল্যা বাদি হয়ে কালিয়া থানায় নড়াইল-১ আসনের সাবেক এমপি আ’লীগ নেতা কবিরুল হক মুক্তিকে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে এবং গাজীরহাট ইউপি চেয়ারম্যান মফিজুল ইসলাম ঠান্ডু মফিজুল ইসলাম ঠান্ডকে প্রধান আসামি করে ৩১ জনের বিরুদ্ধে কালিয়া থানায় মামলা হয়েছে। হত্যাকান্ডের পর আসামি পক্ষের প্রায় ২৫টি পরিবারের ১০টি বাড়িতে আগুন এবং ৩০টি বাড়ি ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
আসামি রউফ শেখের ছেলে আউলিয়া শেখ বলেন, আমাদের বংশেরই কমপক্ষে ২০ একর জমির পাকা বোরো ধান কাটতে পারছে না। ধান কাটতে কৃষি শ্রমিক পাঠালে বাদি পক্ষের মুস্তাক মোল্যাসহ অনেকে তাদের জমি থেকে উঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। বলছে প্রতি বিঘা জমির ধান কাটতে গেলে ১০ হাজার টাকা দেওয়া লাগবে। সব মিলিয়ে প্রায় এক’শ একর জমির পাকা ধান এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সিলিমপুর ও গাজীরহাটের প্রায় ৪০টির মতো মাছের ঘের ও পুকুরের মাছ লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আমাদেরই ১০টি ঘের রয়েছে।
নিহত হাসিমের বাবা মামলার বাদী কাদের মোল্যার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ফোন রিসিভ করলেও সাংবাদিক পরিচয় পেলে ফোন রেখে দেন। পরে আবার ফোন করলে এক নারী ফোন ধরে পরে কথা বলবেন বললেও আর তাদের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি৷
কালিয়া থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন,‘জমি থেকে ধান কাটার বিষয়টি কি আমাদের দেখার বিষয় ? এ বিষয়ে কোন মতামত দেওয়া সম্ভব নয়।’
এদিকে লোহাগড়ায় গত ঈদুল ফিতরের দিন ৩১ মার্চ মুক্তিযোদ্ধা আকবর শেখ (৭৫) নিহতের ঘটনায় শতাধিক বাড়ি ভাংচুর- মালামাল ও গবাদিপশু লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এখন বোরো ধান কাটা শুরু হলেও আসামি পক্ষের কাওকে গ্রামে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। আসামি পক্ষের কমপক্ষে ৩০ একর জমির বোরো ধান কাটা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৩০ একর জমির পাট পরিচর্যার অভাবে নষ্টের পথে।
লোহাগড়া উপজেলার লাহুড়িয়া ইউনিয়নের লাহুড়িয়া গ্রামে মনিরুল জমাদ্দার ও একই গ্রামের মিল্টন জমাদ্দার গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারে এ খুনের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ৩ এপ্রিল নিহতের স্ত্রী আকলিমা বেগম বাদী হয়ে লাহুড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান কামরান সিকদারকে প্রধান আসামি করে একটি হত্যা মামলা হয়েছে।
লাহুড়িয়া পশ্চিমপাড়া গ্রামের ভূক্তভোগি নুরুল ইসলাম বলেন, তার আপন ভাই আকবর হত্যা মামলার আসামি জাকির হোসেন মাষ্টারের ৫০ শতাংশ জমিতে বোরো ধান পাকলেও তা কাটা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ২ একরের পাটের জমিতে সেচ ও পরিচর্যার অভাবে নষ্টের পথে। প্রতিবেশী ফারুক হোসেন তার ভাইয়ের ৫ শতাংশ জমিতে কয়েকটি গাছ কেটে এখন শুনছি সেখানে ঘর তৈরি করবে।
লোহাগড়া উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হান্নান সিকদার রুনু বলেন, বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে আসামি পক্ষের কাওকে এলাকায় কাওকে ঢুকতেই দেয়া হচ্ছে না, ধান কাটবে কিভাবে। বাদি পক্ষ হত্যাসহ ৪ টি মামলায় দেড় শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। ফলে কমপক্ষে শতাধিক পরিবারই বাড়ি ছাড়া। সে কারণে জমির ধান কাটা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
তবে নিহত মুক্তিযোদ্ধা আকবর শেখের ভাতিজা শরিফুল ইসলাম বললেন, আমাদের পক্ষের কেউ কোন বাড়ি ভাংচুর বা মালামাল লুটের সাথে জড়িত নয়। এলাকায় আসতে কাওকে বাঁধা দেয়া হচ্ছে না। যার ধান সেই কাটবে সেখানে আমাদের বাঁধা দেওয়ার কি আছে।
এ বিষয়ে লোহাগড়া থানার লাহুড়িয়া ক্যম্প ইনচার্জ ইন্সপেক্টর তুহিন বলেন, এলাকার পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো। যাদের নামে মামলা রয়েছে তারাতো এলাকায় ঢুকতে পারছে না। এ ছাড়া আসামি পক্ষের এলাকায় প্রবেশ এবং জমির ধান কাটার বিষয়ে স্থানীয়ভাবে দু’পক্ষের সমঝোতা হলে ভালো হয় বলে মন্তব্য করেন।















