কালের বিবর্তনে চাহিদা নেই মাটির তৈরি তৈযষপত্রের; দই বসানো খুরি আর ভাড় তৈরিতে ঠেকে আছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের “মৃৎশিল্প’টি!

0
152

রাসেল মাহমুদ : কালের বিবর্তনে এখন বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার ইতিহাস আর ঐতিহ্য ঘেরা “মৃৎশিল্প”টি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ন্যায় যশোর সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ নানা সমস্যায় র্জজরিত।একটা সময় মাটির জিনিসপত্র তৈরিতে কুমার পাড়ার মহাকর্মযজ্ঞ। সে সময় গ্রাম বাংলায় ধান কাটার মৌসুমে এশিল্পের সাথে জড়িতদের কর্মকান্ডও বেড়ে যেত বহুগুনে। প্রত্যেহ ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হাতে গড়ানো রান্নাবান্না সহ দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন রকমারি হাঁড়ি-পাতিল, সরা, থালা, দোনা, ঝাঁজর, মটকি, গরুর খাবার দেওয়ার চাড়ি, কোলকি, কড়াই, কুয়ার পাট, মাটির ব্যাংক, বাহারি নকশার খেলনা, মাটির তৈরি পশুপাখি, পুতুল নিয়ে বাড়ি বাড়ি ও গ্রামগঞ্জের হাটবাজারে পশরা সাজাতো। কিন্তু এখন আধুনিকতার সংস্পর্শে কাঁচ, অ্যালুমিনিয়াম, মেলামাইন ও প্লাস্টিকের তৈরি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় গ্রামবাংলার চিরোচেনা এই শিল্পটি বিলুপ্তির পথে। দেশের অন্যান্য যায়গার মত যশোর সদর উপজেলার কচুয়া পালপাড়ায় অবস্থিত মৃৎশিল্পীর সংখ্যা এখন আর মাত্র কয়েকজনে গিয়ে ঠেকে আছে। তাদের সাথে কথা বলে জানাযায়, একটা সময় মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, পানি রাখার কলস, রং বে রংয়ের ফুলদানি, ফুলের টপ, খেলনা হাতি-ঘোড়া, নানা রঙের পুতুলসহ বিভিন্ন ধরনের খেলনা সামগ্রী নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরলেও বেশ ভালোই বেঁচাবিক্রি হত। কিন্তু যুগের বিবর্তনে; প্লাস্টিক ও অ্যালুমেনিয়ামের চাপে এক সময়ের দাপুটে ব্যবসা এখন শুধু বইপুস্তকে সীমাবদ্ধ। সব কিছু হারিয়ে এখন শুধু দই বসানো খুরা তৈরিতে গিয়ে ঠেকে আছে। সদর উপজেলার কচুয়া পালপাড়ার নকুল পাল বলেন, মৃৎশিল্পির তৈরি জিনিষপত্রের চাহিদা, আগের মত নেই তাই বাধ্য হয়ে গুটিয়ে নিয়েছি আদি ও পূর্বপুরুষের এই পেশা। কচুয়া পালপাড়া মৃৎশিল্পী দুলাল পাল (৪৫) জানান, এমন একসময় ছিল যখন এ এলাকায় অনেকের মৃৎশিল্পের উপর নির্ভর করে জীবিকা চলাত। বর্তমানে এ এলাকায় ২৫-৩০টি পরিবার বসবাস করলেও প্রায় তিন ভাগের আড়াই ভাগ পরিবার তাদের বংশীয় পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশা শুরু করেছে। বর্তমানে আমরা যারা দু’য়েকজন এই পেশা ধরে রেখেছি তা অতিকষ্টে ধরে আছি। মৃৎশিল্পী অন্ত পাল, নেপাল পাল ও সুবাশ পাল বলেন, পিতা-মাতার কাছ থেকে দেখে দেখে এ মাটির কাজ শিখেছিলাম। যখন এ কাজ শিখেছিলাম, তখন মাটির তৈরী জিনিষপত্রের চাহিদা ছিল ব্যাপক। ভাত, তরকারির পাতিল, বড় কলস, মটকিসহ বিভিন্ন ধরনের হাঁড়িপাতিল আর বাচ্চাদের খেলনা মিলিয়ে ৪০-৫০ প্রকার জিনিষ তৈরি করতাম। কিন্তু যুগের সাথে এসব জিনিসের চাহিদা না থাকা ও এসব তৈরিতে খরচ বৃদ্ধি হওয়ায় এখন আর আগের মত কার্যক্রম চলেনা।তারা আরো জানান একসময় তাদের গ্রামের পাশের বিভিন্ন জমি থেকে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা গাড়ি মাটি ক্রয় করতে পারতেন। তবে, এখন দেশে বেড়েছে ইটের ভাটা। যার কারণে ২ থেকে ২৫’শ টাকা গাড়ি মাটি ক্রয় করতে হয়। আগে জ্বালানি বা খড়ি ৮০ থেকে ১’শ টাকা মণ ক্রয় করলেও তা বর্তমানে ২’শ ৫০ টাকা থেকে ৩’শ টাকা। অথচ মাটির তৈরী জিনিসপত্রের দাম তুলনামূলক বাড়েনি; আবার এসবের চাহিদা নেই বল্লেই চলে। এর ফলে বেশি দামে মাটি ও জ্বালানী ক্রয় করে এসব জিনিসপত্র তৈরি করে আগের মতো লাভ হয় না। যে কারনে এখন শুধু দইয়ের খুরা/মালসা/হাড়ি তৈরি করে কোনো মতে টিকে আছে এই অঞ্চলের মৃৎ শিল্পটি। তবে যদি এই পেশার উপর সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায় তবে হারিয়ে যাওয়া এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয় এসব মৃৎশিল্পীরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here