‘মৃত্যুর পাড়ে চৌগাছা: এক বছরে ১৭টি আত্মহত্যা, নিঃশেষ স্বপ্ন আর পরিবার! বিষ, ফাঁস আর বিষণ্নতায় হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক জীবন

0
119

রায়হান হোসেন, চৌগাছা পৌর প্রতিনিধি : যশোরের সীমান্তবর্তী চৌগাছা উপজেলায় আত্মহত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিগত প্রায় এক বছরের ব্যবধানে (২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত) এই উপজেলায় আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন অন্তত ১৭ জন নারী-পুরুষ। তাঁদের কেউ বিষপান করে, কেউ গলায় ফাঁস দিয়ে, কেউবা গ্যাস ট্যাবলেট বা ইঁদুর মারা বড়ি খেয়ে নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছেন। প্রতিটি মৃত্যুই একটি পরিবারে সৃষ্টি করেছে চিরস্থায়ী শোক আর সামাজিক আলোড়ন।
এই এক বছরে চৌগাছার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে কমপক্ষে একটি করে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষই এই ভয়াবহতার শিকার হয়েছেন। বয়স, লিঙ্গ বা ধর্ম কিছুই যেন আর আত্মরক্ষার ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারছে না।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, চলতি বছরের ৩ জুন, উপজেলার সিংহঝুলী গ্রামের আমিন (১৫) নিজ ঘরে গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। একই দিন সদর ইউনিয়নের মনমথপুর গ্রামে গৃহবধূ সুরাইয়া আক্তার (৩০) গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহনন করেন। এর দুই দিন আগে, ১ জুন বিষপানে মৃত্যুবরণ করেন তজবীজপুর গ্রামের মনিরুল ইসলাম (২২) এবং সদর ইউনিয়নের মনমথপুর গ্রামের দুই সন্তানের জননী জেসমিন খাতুন (৩৫)। ৩১ মে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী সলুয়ার মারিয়া খাতুন (১২) পারিবারিক অভিমান থেকে আত্মহত্যা করেন।
গত ২৯ মে এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় উপজেলার কলেজপাড়া সদর ইউনিয়নের ছাত্রদল নেতা আল-মামুন (২২) শখের মোটরসাইকেল না পাওয়ার অভিমানে বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। এর মাত্র নয় দিন আগে, ২০ মে সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের দৌলতপুরের পায়েল আক্তার (১৮) ও বল্লভপুরের বৃদ্ধ বদর উদ্দিন (৭০) আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁরা মারা যান।
এ বছরের এপ্রিল মাসে কয়ারপাড়ার মোমেনা বেগম (৬০) আত্মহত্যা করেন। ২৭ এপ্রিল ঋণের চাপ ও স্ত্রীর সাথে সম্পর্কের অবনতিতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন জলকা মাধবপুর গ্রামের নিমাই হালদার (২৮)। ২০ ফেব্রুয়ারি ইছাপুরে আত্মহত্যা করেন মানসিক ভারসাম্যহীন তরুণী চম্পা খাতুন (২০)। ২৬ জানুয়ারি ঢাকার একটি ছাত্রাবাসে আত্মহত্যা করেন উপজেলার শামখালী গ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী সাবরিনা রহমান শাম্মী।
এর আগে, ৮ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে মোবাইল ফোন না পাওয়ায় বাদেখানপুরে আত্মহত্যা করেন কলেজছাত্র লাবিব হাসান (২০)। ১৬ নভেম্বর প্রেমঘটিত বিষয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্বে আত্মহত্যা করেন থানা পাড়ার গৃহবধূ শিলা খাতুন (২৫)। ৩১ অক্টোবর বিয়ের ২৯ দিনের মাথায় পান্টিপাড়ার ঋতু বিশ্বাস (২২) ইঁদুর মারা বড়ি খেয়ে আত্মহত্যা করেন। ১ জুলাই ২০২৪ সালে পাতিবিলায় দীর্ঘদিনের পায়ের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন মোহাম্মদ আলী খাঁ (৯০), পরে মৃত্যুবরণ করেন হাসপাতালে।
এছাড়া এসব ঘটনার আগেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন আরও অনেকে, যাঁদের মধ্যে কেউ কেউ প্রাণে বেঁচে গেলেও স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানুল মিজান রুমি বলেন,
“আত্মহত্যার পেছনে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাই বড় ভূমিকা রাখে, যেটা এখনও আমাদের সমাজে গুরুত্ব পায় না। অনেকে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আতঙ্ক বা পারিবারিক মানসিক চাপে থাকেন কিন্তু কাউকে বলতে পারেন না। ব্যাপক সচেতনতা ছাড়া শুধু চিকিৎসা দিয়ে এই সমস্যা রোধ সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এ সমস্যা রোধে পরিবার ও সমাজকে সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।”
চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন বলেন, “প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহ, প্রেমে ব্যর্থতা, আর্থিক সংকট বা মানসিক অবসাদ এর পেছনে কারণ হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে। চৌগাছার মানুষ আবেগপ্রবণ হওয়ায় অনেক সময় সামান্য কারণে চরম সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আত্মহত্যা রোধে পারিবারিক সম্প্রীতি, সামাজিক বন্ধন ও সচেতনতা জরুরি। ঈদের পর বিভিন্ন স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক সভা-সেমিনারের আয়োজন করা হবে, যাতে সবাই বিষয়টি নিয়ে আরও সচেতন হন।”
চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ইসলাম বলেন,”এই আত্মহত্যার প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের আর কোনো পথ নেই। প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসলেই এই সামাজিক ব্যাধি রোধ করা সম্ভব হবে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here