ডি এইচ দিলসান : সর্বনিম্ন কত টাকায় তিন বেলার খাবার জোটে?
কত টাকায় শিক্ষা কিংবা চিকিৎসা? নিম্ন আয়ের মানুষেদের এই
হিসাবগুলো কখনোই মেলে না সরকারি হিসাবের সঙ্গে। পণ্যের দাম
বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতিও বাড়ে। এটা অর্থনীতির হিসাব, কিন্তু আয়ের
অভাবে যে দিনমজুর বাবা ঘরে ফেরে না, তার কাছে মূল্যস্ফীতি ক্ষুধার
চাইতে বড় নয়। এর মধ্যেই নতুন করে আরেক দফা বাড়ল চালের দাম। তেল,
চিনি, ডালের দাম আগেই বাড়তি। ১০০ টাকার নিচে ছোয়া যাচ্ছে
না সবজি। ভরা মৌসুমেও যশোরে ইলিশের বাজার চড়া, সবজিতেও আগুন।
কী করবে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষ? বলছিলেন অবসারপ্রাপ্ত শিক্ষক আলী
হোসেন।
ভরা মৌসুম চলছে ইলিশের। নদী-সমুদ্রে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়লেও
যশোরের খুচরা বাজারে এর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে
গেছে। অপরদিকে সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই প্রায় সব ধরনের সবজিই
কেজি প্রতি ৭০ থেকে ১৬০ টাকার নিচে মিলছে না। এতে ভোগান্তি
বাড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের।
যশোরের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৩০০-৫০০ গ্রামের ইলিশ মাছ বিক্রি
হচ্ছে কেজিপ্রতি ১,২০০ থেকে ১,৮০০ টাকায়। ৭০০-৮০০ গ্রামের
আকারের ইলিশ কিনতে ক্রেতাদের দিতে হচ্ছে ১৮০০ থেকে ২৪০০ টাকা
পর্যন্ত। পাইকারি পর্যায়ে কিছুটা কম হলেও খুচরায় দাম কমার কোনো
লক্ষণ নেই। মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন খরচ ও চাহিদা বৃদ্ধির
কারণে দাম বেশি রাখতে হচ্ছে। দেশীয় প্রজাতির মাছের দামও ক্রেতাদেও
নাগালের বাইওে প্রায়। অন্যদিকে সবজির বাজারেও চলছে অস্থিরতা। বেগুন,
ঢেঁড়শ, বরবটি, উচ্ছে কিছুর দামই ৭০-১৫০ টাকার ওপরে। শসা সাইজ ও
প্রকার ভেদে ৮০-১২০, টমেটো ১৫০-১৬০, করলা বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০
টাকায়। কাঁচামরিচ ১৮০ থেকে-২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে,
বেগুন ১৪০ থেকে ১৬০। শুধু মিষ্টি কুমড়া কিছুটা সস্তা, তবে কেজি
হিসেবে বিক্রি হওয়ায় ক্রেতার কাছে এর দামও কম মনে হচ্ছে না।
যশোর বড় বাজারের খুচরা বিক্রেতা রুম্মন জানান, বাজারে সবজির
আমদানি খুব কম। তিনি রোববার প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি করেছেন
১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, গাজর ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, টমেটো ১৪০
থেকে ১৬০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বরবটি ৮০ থেকে ১০০
টাকা, শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঢেঁড়স ৭০ থেকে ৮০ টাকা, ঝিঙে
৭০ থেকে ৮০ টাকা, পটল ৭০ টাকা, লাউ প্রতিটি ৭০ টাকা।
এদিকে এ সপ্তাহে পেঁয়াজের কেজিতে আরও ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি
হচ্ছে ৭৫ টাকা। অবিরাম বৃষ্টির কারণে যশোর জেলার বিভিন্ন
হাটবাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় যশোরে গত সপ্তাহে প্রতি
কেজিতে ১৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হয়েছিল ৭৫ টাকায়।
বড় বাজার কালীবাড়ি মার্কেট এলাকার আড়ত ‘নিতাই গৌর ভান্ডার’-
এর অন্যতম স্বত্বাধিকারী নিতাই সাহা জানান, তিনি রোববার তার
আড়তে প্রতি কেজি পেঁয়াজ পাইকারি দর ৬৫/৬৬ টাকায় বিক্রি
করেছেন। এ সময় বাজার করতে আসা জনৈক ক্রেতা হাফিজ উদ্দিন
জানান, বাজার তদারকিতে সরকারি সংস্থাগুলোর গাফিলতার কারণে খুচরা
বিক্রেতারা পেঁয়াজের দাম বেশি নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। আরেক ক্রেতা
রবিউল ইসলাম জানান, বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম বেশি, এত বেশি
দাম দিয়ে সবজি কিনে খাওয়ার মতো আর পরিস্থিতি নেই। বাজারে এ
সপ্তাহে ফের বেড়েছে ডিমের দাম। প্র হালিতে ২ টাকা বেড়ে বিক্রি
হয়েছে খামারের মুরগির লাল ডিম ৪৮ টাকা। বেড়েছে খামারের মুরগির
দামও। এ সপ্তাহে সোনালি ও লেয়ার মুরগির কেজিতে ২০ টাকা করে
বেড়ে বিক্রি হয়েছে ৩২০ টাকা।
ক্রেতা সিয়াম আহমেদ জানান,“ইলিশের মৌসুমে ইলিশ খাবো এই
স্বপ্ন নিয়ে বাজারে আসি। কিন্তু দাম শুনে কিনতেই পারি না। আবার
সবজি কিনতে গেলেও ৮০ টাকা ছাড়া কোনো কিছু পাওয়া যাচ্ছে
না। এ অবস্থায় সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে।”
সবজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে সরবরাহ কমেছে।
স্থানীয় উৎপাদন কম হওয়ায় বাইরে থেকে সবজি এনে বিক্রি করতে হচ্ছে।
এতে দাম বেশি পড়ছে।
যশোর জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে
রাখতে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বাজার মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা
হয়েছে। তবে সরবরাহ না বাড়লে খুব দ্রুত দামের লাগাম টানা কঠিন
হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরাও।
উল্লেখ্য ক্রয়মুল্যের কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ানোর
কথা বলা হয়। কিন্তু শাকসবজি সহ অন্যান্য দেশজ দ্রব্যাদির মূল্য বৃদ্ধির
কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করি। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা
প্রতিষ্ঠান (বি আইডিএস), পিপিআরসি ও সাউথ এশিয়ান
নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর গবেষণা ও জরিপে
দেখা গেছে, করোনাকালে দেশে দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য
সংখ্যায়। তাদের মতে, দারিদ্র্যের এই হার করোনাপূর্ব ২১ শতাংশ থেকে
বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। যদিও সরকার বারবারই বলছে, এ হার অনেক কম।
কিন্তু সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কাছে
এর সমর্থনে কোনো তথ্য নেই। ২০২০ সালের অক্টোবরের বিবিএস-এর
এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষের আয় ২০ শতাংশ কমে গেছে।
একদিকে আয় কমেছে ২০ শতাংশ, অপরদিকে ব্যয় বেড়েছে ৩৬ শতাংশ।
তার মানে হলো, ১০০ টাকার আয় কমে ৮০ টাকা হয়েছে আর ১০০ টাকার
ব্যয় বেড়ে ১৩৬ টাকা হয়েছে। আয়-ব্যয়ের ব্যবধান হলো ৫৬ শতাংশ। এ
বিশাল ঘাটতি মেটানোর উপায় সাধারণ মানুষের জানা আছে কি?















