“ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট: ৪ লাখ মানুষের ভরসা ভেঙে পড়েছে”

0
115

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ : যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা ভেঙে পড়েছে। চিকিৎসক সংকটে রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে এক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগী নিয়ে গেলে হাসপাতালে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়।
জরুরি বিভাগের সামনে শতাধিক রোগীর ভিড় সামলাতে মূল ফটক বন্ধ করে একে একে রোগী ঢোকাচ্ছিলেন এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। এসময় দায়িত্বরত চিকিৎসক উপস্থিত না থাকায় স্বাস্থ্য সহকারী রুহিতকে চিকিৎসা দিতে দেখা যায়। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কিছুক্ষণ পর জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. হাসান আরিফ আসেন এবং চিকিৎসা শুরু করেন। একই সময়ে ৪১ নম্বর কক্ষে থাকা ডা. ফারহানাকেও ৩৯ নম্বর কক্ষে এসে রোগী দেখতে দেখা যায়। ফলে প্রায় ৪ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবায় কার্যত মাত্র দুইজন ডাক্তারই রোগী সামলাচ্ছিলেন। এদিকে জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি) ডা. আঞ্জুমানআরা ও জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেসথেসিয়া) ডা. সুচিন্ত কৃষ্ণ দত্ত অপারেশন থিয়েটারে ব্যস্ত ছিলেন।
হাসপাতালের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে—উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আব্দুর রশিদ পৌরসভায় মিটিংয়ে, আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মেহেদী হাসান ছুটিতে, গাইনি কনসালটেন্ট ডা. আঞ্জুমানআরা সপ্তাহে তিনদিন যশোরে ডেপুটেশনে, অর্থোপেডিক্স কনসালটেন্ট ডা. কামরুজ্জামান ও সার্জন ডা. তাহামিদুর রহমান সপ্তাহে ছয়দিন যশোরে ডেপুটেশনে, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আবু ইউসুফ অনুপস্থিত, সহকারী সার্জন ডা. হালিমাতুজ জোহরা ও ডা. মনিরা আক্তার যশোর পুলিশ হাসপাতালে ডেপুটেশনে, ডেন্টাল সার্জন ডা. মিনাক্ষী বিম্বাস ছুটিতে, মেডিকেল অফিসার ডা. নাজমুন সুলতানা মুনমুন অন-ডিউটিতে ছিলেন না, ডা. বিকাশচন্দ্র পালসহ আরও দু’জন ট্রেনিংয়ে, হোমিও মেডিকেল অফিসার ডা. সৌমেন বিশ্বাস সপ্তাহে ছয়দিন যশোরে ডেপুটেশনে, সহকারী সার্জন ডা. রাফেজাতুন জান্নাত এদিন আসেননি তবে ছুটিও নেননি এবং ডা. পার্থসারতী রায়কেও পাওয়া যায়নি। এছাড়া হাসপাতালে জুনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি), (রিহ্যাবিলিটেশন), (চক্ষু), (শিশু), (চর্ম ও যৌন), (কার্ডিওলজি) এবং একজন মেডিকেল অফিসারের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে।
শুধু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নয়, ইউনিয়ন পর্যায়েও চিকিৎসক সংকট প্রকট। গঙ্গানন্দপুর, অমৃতবাজার ও বাঁকড়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তিনজন চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। নাভারন ইউনিয়ন বাদে মাগুরা, শিমুলিয়া, গদখালী, পানিসারা, ঝিকরগাছা, নির্বাসখোলা, হাজিরবাগ, শংকরপুর ও বাঁকড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও চিকিৎসক ও একটি সিএইচসিডি পদ শূন্য রয়েছে।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মাসুদ রানা ও ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আব্দুর রশিদ বলেন, ডাক্তার সংকটের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। একই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসকদের ডেপুটেশনে পাঠানো এবং অফিস আওয়ারে ট্রেনিং ও মিটিংয়ে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তারা বিষয়টি সরকারি সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দুর্ঘটনায় আহত রোগীর স্বজনরা জানান, জরুরি বিভাগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চিকিৎসা পাওয়া যায়নি। কয়েকজন বয়োবৃদ্ধ রোগী বলেন, সকাল ৮টা থেকে লাইন ধরেও দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ডাক্তার দেখাতে পারেননি তারা। রোগীদের অভিযোগ—চিকিৎসকদের সকাল ৮টা থেকে উপস্থিত থাকার নিয়ম থাকলেও অনেকেই দেরিতে আসেন এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে যান।
ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এ চিত্রে স্পষ্ট ডাক্তার সংকট, ডেপুটেশন ও পদ শূন্যতার কারণে প্রায় ৪ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবা এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here