নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোরে গণতান্ত্রিক ধারাকে সুসংহত করতে এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ : নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ মঙ্গলবার যশোর শহরের জয়তি সোসাইটির মিলনায়তনে সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে বেলা দেড়টা পর্যন্ত এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক ও বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক যশোর জেলা কমিটির আয়োজনে এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের সহযোগিতায় এ সভায় জেলার সুধীজনরা তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন।
এ সংলাপে যশোর জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন। মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক যশোর জেলা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট সালেহা বেগম এবং সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ফিরোজা বুলবুল কলি, সভাপতি বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক। সভায় অতিথি হিসেবে আলোচনা করেন ড. মোস্তাফিজুর রহমান, প্রাক্তন প্রফেসর, এমএম কলেজ যশোর, মো: মোদাচ্ছির হোসেন, অধ্যক্ষ যশোর কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ, মো: জাকির হোসেন, সভাপতি যশোর জেলা ইমাম সমিতি, আনোয়ারুল কবির নান্টু, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক দৈনিক লোকসমাজ, খায়রুল আনাম, অধ্যক্ষ এমএসটিপি স্কুল এন্ড কলেজ, অর্চনা বিশ্বাস, নির্বাহী পরিচালক, জয়তী সোসাইটি সহ সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক যশোর জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ। আলোচনার বিষয়সমূহের সমন্বয় করেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট যশোর অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো: খোরশেদ আলম এবং জেলা সমন্বয়কারী মো. গিয়াস উদ্দিন। এছাড়া বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মোট ৮০ জন প্রতিনিধি এই সভায় তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন যশোর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান নান্নু।
সভায় বক্তারা গণতন্ত্রের বিকাশে সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব নয়; বরং এতে নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য। তাঁরা আরও উল্লেখ করেন, ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করতে নাগরিকদের সচেতন ও সংগঠিত ভূমিকা পালনের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে তরুণ ও নতুন ভোটারদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। আলোচনায় উঠে আসে যে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এবং ঝুকিমুক্ত পরিবেশ তৈরী করা না গেলে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা তৈরি হওয়া সম্ভব নয়।
সভা শেষে গণতান্ত্রিক উত্তরণের লক্ষ্যে বেশ কিছু সুপারিশ উত্থাপন করা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে উঠে আসে—দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতাই সুষ্ঠু নির্বাচনের মূল ভিত্তি, গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেই সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে মানবিক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে এবং কাউকে সংখ্যালঘু হিসেবে আলাদা করে দেখার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা যাবে না। ভোটের আগে ও পরে সহিংসতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। অপরাধীদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না—এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে। এই শঙ্কা দূর করতে নাগরিক পর্যবেক্ষণ জোরদার করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী সহিংসতা ও অনিয়ম রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ ছাড়াও তরুণ, নারী ও হিজড়া ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করা, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের অবাধ ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতা ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
সমাপনী পর্বে মুক্তিযোদ্ধা সালেহা বেগম বলেন, গণতন্ত্র শুধু ভোট নয়; দায়িত্ব, জবাবদিহিতা এবং সরকারি কর্মচারীদের জনগণের কর্মচারী হিসেবে কাজ করার চেতনার ওপরই সুষ্ঠু নির্বাচনের ভিত্তি গড়ে ওঠে।















