স্টাফ রিপোর্টার, যশোর থেকে: যশোরের মনিরামপুরের কপালিয়া বাজারে প্রকাশ্য
গুলি ও গলা কেটে দৈনিক বিডি খবর পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রানা প্রতাপ বৈরাগী
(৩৫)কে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ছয়টার
দিকে উপজেলার কপালিয়া বাজার এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঘটনার
সময় ছোড়া একটি গুলি পাশের একটি ক্লিনিকের কাঁচ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে
পড়লে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হত্যাতান্ডের পর খুনিরা গুলি ছুড়তে
ছুড়তে মোটর সাইকেল যোগে স্থান ত্যাগ করে ডুমুরিয়ার দিকে চলে যায়।
এদিকে এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় পুলিশ এখনো সন্দিগ্ধ কাউকে আটক করতে
পারেনি। ময়না তদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পর সামাজিক ও ধমীয়
আনুষ্ঠানিকতায় লাশের সৎকার করা হয়েছে স্থানীয় কলাগাছি শ্মশানঘাটে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকান্ডের ৫ মিনিট আগে খুনি চক্রের ২ অজ্ঞাত নামা
সন্ত্রাসী কপালিয়া বাজারে অবস্থিত রানা প্রতাপ বৈরাগীর মালিকানাধীন বরফকল
থেকে তাকে ডেকে বাজারের পাশের গলির মধ্যে নিয়ে যায়। পরে বরফকল থেকে
আনুমানিক ১০০ গজ পশ্চিমে কপালিয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার
সংলগ্ন ঝুম বিউটি পার্লারের গলিতে নিয়ে তাকে লক্ষ্য করে একাধিক রাউন্ড গুলি
ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। গুলিবিদ্ধ হয়ে মুহুর্তে রাস্তার ওপর পড়ে যায় রানা প্রতাপ
বৈরাগী। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে হত্যাকারীরা
গুলি ছুড়তে ছুড়তে উল্লাস প্রকাশ করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এসময় খুনি
চক্রের ছোড়া একটি গুলি কপালিয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের
রিসিপশনের সামনের কাঁচ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে ক্লিনিকের ভেতরে
থাকা রোগী ও স্বজনদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এতে কেউ হতাহত
হয়নি বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ তিনটি তাজা গুলি ও পাঁচটি গুলির খোসা উদ্ধার করেছে।
নিহতের বাম কান, মাথা ও বুকে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। শীতকালীন আবহাওয়ার
কারণে ওই সময় বাজার এলাকায় লোকসমাগম তুলনামূলক কম থাকায় প্রত্যক্ষদর্শীর
সংখ্যা সীমিত ছিল।
নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী এক ছেলে সন্তানের জনক। একমাত্র ছেলে রাজ প্রতাপ
বৈরাগী বাবার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। স্বজনদের ভাষ্য,
বাবার মরদেহ দেখার পর থেকে সে প্রায় পাগলপ্রায় অবস্থায় রয়েছে।
নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী যশোরের কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামের বাসিন্দা
এবং স্কুল শিক্ষক দুর্গাপদ বৈরাগীর সন্তান। তিনি নড়াইল জেলা শহর থেকে
প্রকাশিত দৈনিক বিডি খবর পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের
পাশাপাশি তিনি কপালিয়া বাজারে একটি বরফ কলের মালিক ছিলেন।
সূত্র বলছে, রানা প্রতাপ বৈরাগী দীর্ঘ দিন চরমপন্থি পূর্ব বাংলা কমিউনিষ্ট
পার্টির আঞ্চলিক নেতা মৃনাল গ্রুপের সক্রিয় সশস্ত্র ক্যাডার হিসেবে কাজ
করেছেন। পরবর্তীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী যুবলীগের সুফলাকাটি ইউনিয়ন
কমিটির জয়েন্ট সেক্রেটারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পুলিশ বলছে নিহত
রানা প্রতাপ বৈরাগীর বিরুদ্ধে যশোরের অভয়নগর থানায় শ্রমিকলীগ নেতা ওলিয়ার
রহমান হত্যাকান্ডসহ কেশবপুর, ডুমুরিয়া ও মণিরামপুর থানায় একাধি হত্যা
মামলা, অস্ত্র মামলা এবয় গুম ও অপহরণ মামলা রয়েছ্ধেসঢ়; ধারনা করা হচ্ছে এসব ঘটনার
পরম্পরায় পূর্ব পরিচিতরাই রানা প্রতাপ বৈরাগীকে টার্গেট কিলিং করেছে।
নিহতের স্ত্রী সীমা বৈরাগী জানান, কপালিয়া বাজারে অবস্থিত অপর একটি
বরফকলের মালিক জিয়ার সঙ্গে তার স্বামীর দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। ওই
বিরোধের জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে বলে তিনি সন্দেহ প্রকাশ
করেন এবং বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করেছেন।
এছাড়া তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, তার স্বামীকে কপালিয়া বাজার এলাকার
ঝুম বিউটি পার্লারের মালিক ঝুমুর মন্ডল (পিতা: সুভাষ চন্দ্র মন্ডল, গ্রাম:
কালিচরণপুর, উপজেলা: কেশবপুর, জেলা: যশোর) নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে হয়রানি
করতেন। তাকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে এনে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন
এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ঝুমুর মন্ডলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে হত্যাকান্ডের পর পরই গত সোমবার রাতেই নেহালপুর পুলিশ ফাঁড়ি,
মনিরামপুর থানা পুলিশ, যশোর জেলা পুলিশ, র্যাব ও ডিবি পুলিশের একাধিক টিম
ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ ও তদন্ত শুরু করে। ঘটনার পরপরই মনোহরপুর
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তার ফারুক মিন্টু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
এ সময় ইউপি চেয়ারম্যান আক্তার ফারুক মিন্টু বলেন, “এটি একটি অত্যন্ত
নৃশংস ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। প্রকাশ্য স্থানে এমন ঘটনা এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে
বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
জানাচ্ছি।”
যশোর পুলিশের ক্রাইম এন্ড অপস এর দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল
বাশার জানান, এটি একটি পূর্ব পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। অবস্থা দৃষ্টে ধারনা করা
হচ্ছে খুনিরা ভিকটিমের পূর্ব পরিচিত। কারন তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে
ভিকটিম নিজের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে বাইরে বের হন এবং খুনিদের সাথে
কথাবার্তা বলতে থাকেন। সেই সুযোগে খুব কাছ থেকে খুনিচক্রের ২ সদস্য
রানা প্রতাপ বৈরাগীর মাথা ও ভুক লক্ষ্য করে পর পর ৫ রাউন্ড করে। এতে মাথা ও বুকে
গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রানা প্রতাপ বৈরাগী।
মনিরামপুর থানা পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের
পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের
কাছে হস্তান্তর কারা হয়েছে। এলাকায় বাড়তি পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
হত্যার রহস্য উদঘাটনে পুলিশ, র্যাব ও ডিবি তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে গতকাল বিকেলে নড়াইলের বিডি খবর পত্রিকার বার্তা সম্পাদক রিপানুল
হোসেন রিপন ও মফস্বল সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমেদ বাঁধনের নেতৃত্বে পত্রিকা
পরিবারের সদস্যরা পুষ্পার্ঘ অর্পন করে মরদেহের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।















