হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে শার্শায় দাপট দেখাচ্ছে অবৈধ ইটভাটা

0
110

শহিদুল ইসলাম : পরিবেশ ধ্বংস, কৃষিজমি দখল, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও ভয়াবহ বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে অবৈধ ইটভাটা। হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও যশোরের শার্শা উপজেলায় একাধিক ইটভাটা অবৈধভাবে চালু রয়েছে। এতে একদিকে যেমন আইনের শাসন উপেক্ষিত হচ্ছে, অন্যদিকে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে স্থানীয় পরিবেশ, কৃষি ও জনজীবন। হাইকোর্টের নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা ও জনবসতি থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বের (সাধারণত তিন কিলোমিটার) মধ্যে কোনো ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। একই সঙ্গে কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন, কাঠ বা জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করে ইট পোড়ানো এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ভাটা পরিচালনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব শর্ত লঙ্ঘনকারী ইটভাটা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
এই প্রেক্ষাপটে গত ১২ মার্চ ২০২৪ তারিখে হাইকোর্টে দায়ের করা একটি রিটের ভিত্তিতে গঠিত পরিদর্শন কমিটি শার্শা উপজেলার ২৩টি ইটভাটা সরেজমিনে পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।২৩টির মধ্যে ২০টি ইটভাটাই কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইট পোড়ানো ও কাঁচা ইট তৈরিসহ সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন এবং ভাটা মালিকদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা গ্রহণ করেন।
তবে প্রশাসনিক নির্দেশনার পর বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লক্ষণপুর ইউনিয়নের সাংবাদিক পরিচয়ধারী সবুজ হোসেনের মালিকানাধীন মেসার্স কে এ এ ব্রিকস, বাগআঁচড়া ইউনিয়নের টেংরা জামতলার সিরাজুল ইসলামের মেসার্স রিফা ব্রিক্স, একই এলাকার তৌহিদুর রহমানের মেসার্স বিশ্বাস ব্রিক্স, কুচেমোড়া হাড়িখালির মিজানুর রহমানের টাটা ব্রিক্স, গোগা ইউনিয়নের হযরত আলীর মেসার্স রাজ ব্রিকস, ইছাপুরের শফিউর রহমানের মেসার্স এস টি ব্রিকস, কায়বা ইউনিয়নের পশ্চিমকোটার হাজরাতলা এলাকার আরফাত ইসলামের মেসার্স নাইস ব্রিকস, পিঁপড়াগাছীর শহিদুল ইসলামের মেসার্স সাফা ব্রিক্সসহ প্রায় ২০টি ইটভাটা এখনও প্রকাশ্যে অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, শার্শা উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল কবিরের মালিকানাধীন মেসার্স প্রাইম ব্রিক্স লাইসেন্স নবায়ন না থাকায় চলতি মৌসুমে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া আর্থিক সংকট ও লাইসেন্স জটিলতার কারণে আরও তিনটি ইটভাটা বর্তমানে বন্ধ আছে বলে জানা গেছে।
ভাটা মালিকদের দাবি, অতীতে সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করেই ‘হাওয়া ভাটা’ ও ‘ঝিকঝাক ভাটা’ পদ্ধতিতে লাইসেন্স নেওয়া হয়েছিল। তবে নীতিগত ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে নতুন লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। তাদের মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার ইটভাটা চালু রয়েছে, যার মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ অবৈধ। এসব ভাটার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জীবিকা জড়িত। লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দিলে তারা পরিবেশ আইন ও শ্রম আইন মেনে ভাটা পরিচালনা করবেন বলে দাবি করেন মালিকরা।
তবে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অবৈধ ইটভাটা বন্ধে প্রশাসনের শিথিলতা আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তারা দ্রুত উচ্চ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন, নিয়মিত মনিটরিং এবং অবৈধ ইটভাটা স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে শার্শা উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল কবির বলেন,একসময় সরকারি নিয়ম মেনেই আমরা লাইসেন্স নিয়েছিলাম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নবায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় অনেক ভাটা সংকটে পড়েছে। নবায়নের সুযোগ পেলে আমরা পরিবেশ ও শ্রম আইন মেনে ভাটা চালাতে প্রস্তুত।
শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে ওয়াহিদ বলেন,হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ নির্দেশ অমান্য করলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমান বলেন,পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ইটভাটা পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি। আদালতের নির্দেশ অমান্যকারী ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here