চারা ও সবজি উৎপাদনে যশোরের কৃষক লাভবান

0
367

মালেকুজ্জামান কাকা, যশোর : যশোর জেলার সদর উপজেলার চুড়ামনকাঠি, লেবুতলা, আব্দুলপুর, বিজয়নগরসহ আমে পাশের গ্রামে বিস্তৃর্ণ মাঠ জুড়ে এবছর উৎপাদিত হয়েছে বিভিন্ন সবজি। একই সাথে উৎপাদন করেছে কৃষক সবজির চারা। এখানকার উৎপাদিত সবজি ও সবজির চারা রাজধানীসহ দেশের ৩৫ জেলার কৃষক ক্রয় করছেন।
এবছর সবজির উচ্চমূল্য ও প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে চারাগাছের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই মৌসুমে দেড়গুণ বেশি দামে চারাগাছ বিক্রয় করেছে চাষী। অতিবৃষ্টি ও ঝড়ে মাঠের সবজিতে নষ্ট হয়েছে চলতি বছরের প্রথমে। বাধ্য হয়ে আশপাশের জেলার কৃষক নতুন চারাগাছ ক্রয় করেছেন যশোর থেকে। ফলে বেশি পরিমাণে চারাগাছ যেমন বিক্রি হয়েছে তেমনি উৎপাদিত সবজি রাজধানী ঢাকাসহ বগুড়া, রাজশাহী, শরিয়তপুর, বরিশাল, মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়েছে। সবজির বাজারমূল্য বৃদ্ধির কারনে কৃষকেরা প্রচুর সবজি উৎপাদন করছেন। গত মৌসুমে শুধু সবজি বিক্রি হয়েছিল। এবার তার সাথে বিক্রি হয়েছে সবজির চারাগাছ। প্রতি হাজারে যেসব চারাগাছ নয় শত টাকা থেকে একহাজারে বিক্রি হয়েছিল সেখানে এবার প্রতি হাজারে পনেরো শত থেকে দু হাজার টাকায় বিক্রয় হয়েছে বলে জানায় কৃষক। যশোর সদর উপজেলার উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, এক মৌসুমে একটি বীজতলায় (সেডে) পাঁচবার চারাগাছ উৎপাদন করা যায়। এক বিঘা জমিতে বিভিন্ন চারাগাছ ভেদে পুরো মৌসুমে পাঁচবারে ১৫ ল থেকে ২০ ল চারাগাছ উৎপাদিত হয়েছে। এক বিঘা জমিতে খরচ হয় ৮ ল থেকে ১০ ল টাকা।
যেসব চাষীরা প্রক্রিয়া সঠিকভাবে মেনে চলে তারা লাভবান হয়ে থাকেন। আব্দুলপুরের বিস্তৃণ মাঠ জুড়ে বিভিন্ন সবজির নানা জাতের চারাগাছ উৎপাদিত হয়েছে চলতি মৌসুমে। এরমধ্যে বাঁধাকপির জাত কেকে ক্রস, আরশি, গ্রীণ ৬০, এটম কুইন, ফুলকপির জাত টপিক্যাল ১১, স্নো বক্স, স্নো হোয়াইট, নিনজা, লাউয়ের জাত মার্শাল, টিয়া সুপার, মার্টিনা, টমেটোর জাত হাইটম, বারি-৪,৮, মিন্টু সুপার, সবচেয়ে দামী সবজি বকলির জাত ম্যারোডোনা, টপিক্যাল কুইক, নিনজা, ওল কপির জাত ০০৫, চ্যালেঞ্জার, বেগুণের জাত চ্যাগা, ভাঙ্গর, মরিচ বগুড়া, মাগুরা, বারোমাসি প্রজাতি, ড্রাগন চারা, আপেল কুল, চায়না পেয়ারার চারা বিক্রি হয়েছে। চাষীরা জানান, এই এলাকায় ২০/৩০ বছর ধরে ব্যাপকভাবে সবজি চাষ হয়। কেউ কেউ নিজ জমিতে আবার কেউ বর্গাচাষ করে। সবজির পাশাপাশি সবজির চারা উৎপাদনে অনেকের সংসার বেশ ভালোভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে। কৃষি দপ্তর থেকেও সহযোগীতা সঠিকভাবে মিলছে। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শহিদুল ইসলাম জানান, তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করেছিলেন। এখন কপির সিজন প্রায় শেষ। এবছর ভালো মূল্য মিলেছে সবজির। তবে এজন্য আব্দুলপুর থেকে সবজির চারা ক্রয় করেছিলেন। কৃষকরা জানান, এবছর প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে প্রথম সিজনে অনেক কৃষকের চারাগাছ নষ্ট হয়েছিল এজন্য একই কৃষক দ্বিতীয়বার সবজির চারা কিনেছে যশোর থেকে। এই ২য় বার কেনাতে চাহিদা বেড়েছে। যশোরের সর্ববৃহৎ সবজির পাইকারি হাট চুড়ামনকাঠী ও সাতমাইল বারীনগর বাজারে দেখা গেছে, বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন সবজিতে ঠাসা বাজার। চাষিরা জানান, শীতকালীন সবজি প্রথম থেকে বাজারে আসায় কৃষক দাম বেশি পেয়েছে। তবে পাইকারি বাজারে তাদের কাছ থেকে যে টাকায় সবজি কেনা হয় তার দ্বিগুণ দামে খুচরা বাজারে সবজি বিক্রি করা হয়েছে। সবজি চাষিরা জানান, সবজির মূল্য পাইকারি বাজারে বেশিদিন থাকায় বর্ষার তি তারা কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পেরেছেন। সাতমাইল বারীনগর বাজারে শীতকালীন প্রথম সিজনে সবজি পাতাকপি প্রতিকেজি পাইকারি বিক্রি হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৫/৭ টাকা দরে। সিম প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১১০ হলেও বর্তমান বাজার দর ১০ থেকে ২০ টাকা। মুলা ৩৫ থেকে ৩৮ প্রথমে বিক্রি হলেও এখন পাঁচ থেকে ১০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচ প্রথম সিজনে ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও এখন তা প্রতি কেজি ২৫/৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বেগুন ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি বিক্রি হলেও এখন তা ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্চে বাজারে। লাউ প্রতিটি ২০ থেকে ৩০ তখনো বিক্রি হয়েছে এখনো বিক্রি হচ্ছে। ডাঁটা কেজিপ্রতি আট থেকে ১০ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা যায়। উচ্ছে করলা ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে আগে এখনো তা ৩০ টাকার বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁকরোল ৩০ থেকে ৩২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে অনেক দিন থেকেই। টমাটো প্রথম দিকে ৮০ টাকা দরে কেজি বিক্রি হলেও এখন ২০ থেক ৫০ টাকার মধ্যে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হচ্ছে। সকল সবজি চাষী দর ভালো পেয়েছে এক নাগাড়ে প্রায় তিন মাস। এই সময়ে তারা প্রথম সিজনের বষার লোকসান এড়িয়ে লাভের মুখ দেখেছেন।
গত বছরের তুলনায় এ বছর যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি, হৈবতপুর ও কাশিমপুর, আরবপুর ও চাঁচড়া ইউনিয়নের সবজি চাষিরা দ্বিগুণ শীতকালীন সবজি চাষ করেছিলেন। বর্ষা মৌসুমে অনেক চাষির সবজি নষ্ট হওয়ায় লোকসানে থাকা সত্ত্বেও তারা শীতকালীন সবজি চাষ করেন। কিন্তু জুলাই-আগস্টের ভারি বর্ষণে সবজির অনেক তি হয়েছিল। সবজির আবাদে তাদের বাড়তি টাকা খরচ হয়। এতে তারা হতাশ ছিলেন। কিন্তু মৌসুমের শুরু থেকে চাষিরা সবজির মোটামুটি দাম পাওয়ায় তারা খুশি। তাদের আবাদ করা সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন বাজারে যায়। আগের তুলনায় এখন পরিবহন খরচ দ্বিগুণ। এছাড়া আরও নানা খরচ তো রয়েছেই। এজন্য নিজেরা একটু লাভবান হতে অনেক সময় সিন্ডিকেট করে সবজি কিনতে হয়। তবে চাষিদের বিষয়টি মাথায় রেখেই তারা সবজির দাম নির্ধারণ করেন।
কৃষকরা জানায়, এ বছর সর্বোচ্চ দাম মিলেছে মুলার। পাইকারি প্রতি কেজি মুলা বিক্রি করেছেন ৩৭ টাকায়। বর্তমানে তা কম কিন্ত বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি দও পাওয়া গেছে। একজন বেগুন চাষি জানান, এ বছর সবজি চাষিদের জন্য খুবই ভালো। তার মতে, বাজার ব্যবস্থায় বর্ষা মৌসুমের তি অনেকটা পুষিয়ে নিতে পেরেছে চাষিরা। এমন অবস্থা চললে কৃষক সবজি চাষে আরো আগ্রহী হবে এটাই স্বাভাবিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here