স্টাফ রিপোর্টার : ইজিবাইকের চাকার মতো ঘুরছে জায়েদার জীবন। সংসারের অভাব দূর করতে জীব জীবিকার অবলম্বন হিসেবে সে হাতে তুলে নিয়েছে ইজিবাইকের স্ট্রিয়ারিং। আর ১০ জন মেয়ের মতো যে বয়সে স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে ঘর সংসার করার কথা সেই বয়সে জায়েদার জীবন কাটছে ইজি বাইকের সিটে চালকের আসনে বসে। কাক ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যশোর শহর ও শহরতলীর অলিগলিতে যাত্রী টেনে যা আয় হয় তার সিংহভাগ চলে যায় এনজিও’র কিস্তি পরিশোধ করতে। বাকি টাকা দিয়ে চলে জায়েদার জীবন সংগ্রাম। তারপরও জায়েদা খুশি। তার সাফ জবাব সৎ পথে পরিশ্রম করে যা পাচ্ছি তাতে বরকত আছে। এখন আর কেউ তাকে চোরাকারবারি বলে ডাকে না। সবাই সম্মান করে ডাকে জায়েদা আপা। অনেকে আবার জায়েদা ড্রাইভার বলেও ডাকে।
১৯৬৭ সালে যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সালামতপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জায়েদা বেগমের জন্ম। বাবা মা মারা যাওয়ায় মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় জায়েদা বেগমের। বিয়ের এক বছর পর যৌতুক না পেয়ে স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যায়। দুই বছর পর আবার বিয়ে করেন জায়েদা। কপালে বেশি দিন সুখ সহ্য হয়নি। ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যায় স্বামী। এরপর সংসার চালাতে জায়েদা বেনাপোল বন্দর এলাকায় গিয়ে জড়িয়ে পড়ে কালোবাজারিতে। তৃতীয় বার আব্দুর রহমান নামের একজনকে বিয়ে করেন জায়েদা। বিয়ের এক বছরের মাথায় ধারদেনা করে২ লাখ টাকা খরচ কওে স্বামীকে বিদেশ পাঠায় জায়েদা। একটু সুখের আশায় সে স্বামী রহমানকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়ে নিজে বেনাপোলে একটি চেরাকারবারী চক্রের সদস্য হয়ে এপার ওপার করতে থাকে। ৫ বছর পর বিদেশে পাঠানো সেই স্বামী দেশে ফিরে বিচ্ছেদ ঘটায় তাদের সম্পর্কের। ভাংগা গড়া জীবনের বাকি পথটুকু চলতে কালোবাজারির অন্ধকার জগত ছেড়ে নেমে পড়েন ইজিবাইক নিয়ে। এই ইজিবাইকের স্টিয়ারিং তাকে খুজে দিয়েছে সাফল্য। জায়েদা বেগমের ইজিবাইকের চাকার সঙ্গে ঘুরছে ‘স্বচ্ছলতার চাকা’। কালোবাজারীর দাগ ধুয়ে গেছে, এখন সবাই সম্মান করে ডাকে ‘জায়েদা ড্রাইভার’ বলে। জায়েদা যশোর শষহর ছাড়াও ঝিকরগাছা ও মনিরামপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ইজিবাইক চালান। জায়েদা বেগম নির্যাতনের বিভীষিকা দাগ মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা নারী হিসেবে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তিনবার জয়িতা পুরষ্কার পেয়েছেন।
গল্প প্রসঙ্গে জায়েদা বেগম বলেন, “বারবার দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মনস্থির করি ইজিবাইক চালাবো। একটি সমিতির সদস্য হয়ে সেখান থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এক লাখ ষাট হাজার টাকা দিয়ে একটি ইজিবাইক কিনি। ২০১৭ সালে জুন মাসের দিকে ইজিবাইকের স্টিয়ারিং ধরে রাস্তায় নেমে পড়ি। ইজিবাইকের স্টিয়ারিংয়ে দেওয়া হাত আর কালোবাজারির কাজে লাগায়নি । ফিরে আসি অন্ধকার থেকে আলোর পথে। গত পাঁচ বছর ইজিবাইকের চাকার সাথে ‘স্বচ্ছলতার চাকাও’ চালু রেখেছি।” জায়েদা বেগম জানান, ‘আমি এখন অনেক ভালো আছি। প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ শ টাকা আয় হয়। পাঁচ বছরের আয়ের টাকায় চার শতক জমিও কিনেছি। মাথা গোঁজার জন্য একটি ঘর তৈরির কাজ শুরু করেছি। তবে জায়েদা আপে করে বলেন, ‘আমি নারী হয়ে ইজিবাইক চালাই বলে অনেকে বিশেষ করে পুরুষ চালকেরা নানা কটু কথা বলেন। হেনস্থা হতে হয় পুরুষ চালকদের কাছে। তবে যে যাই বলুক আর কোনো দিন অন্ধকার জগতে ফিরে যেতে চাই না। অনেক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি এই পথ চলায়। এই ভালোবাসা নিয়েই বাকি জীবন কাটাতে চাই।’ যশোর জেলা ট্রাক ও ট্যাংকলরী চালক শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সমাজকল্যাণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এ জেলায় একমাত্র নারী ইজিবাইক চালক জায়েদা বেগম। তিনি আগে কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেখান থেকে ইজিবাইক চালক হওয়া এটা একটা দৃষ্টান্ত। তাকে সহযোগিতা করা আমাদের দায়িত্ব।’
এদিকে অন্ধকার জীবন থেকে আলেঅর জগতে ফিরে আসায় জায়েদাকে জয়তী নারী হিসেবে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে। জায়েদার স্বপ্ন তার ২ ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ বানানো। তিনি জানান, তার এক ছেলে পলিটেকনিক কলেজে পড়ে। আর একজন মাদ্রাসায় লেখাপড়া করছে। এই ইজিবাইক চালিয়ে তিনি ছেলেদেও লেখাপড়া শিখাচ্ছেন। তার স্বপ্ন ছেলে দুটি বড় হলে তার দুঃখ লাঘব হবে। তিনি জানান, প্রথম প্রথম ছেলেরা ইজিবাইক চালানোকে ভালেঅ ভাবে নেয়নি। কিন্তু সময়ের আবর্তে তারাও মেনে নিয়েছেন। তারা এখন বোঝে তার মা কোন অন্যায় করছে না। পরিশ্রম কওে সৎপথে উপার্জন করছে।















