স্টাফ রিপোর্টার : পানি উন্নয়ন বোর্ড ও লুটেরা সিন্ডিকেটের কারণে ভবদহ স্লুইচ গেট থেকে ৬০ কিলোমিটার নদী ভরাট হওয়ায় বিল সংলগ্ন ২০০ গ্রামের প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ আজ মহাবিপর্যয়ের মুখে। সংকট মোকাবেলায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে আজ মঙ্গলবার সাংবাদিক সম্মেলন করেছে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি । সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রনজিত বাওয়ালী। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ, যুগ্ম আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আব্দুল হামিদ ও সদস্য সচিব অধ্যাপক চৈতন্য কুমার পাল। এসময় উপস্থিত ছিলেন- উপদেষ্টা জিল্লুর রহমান ভিটু, তসলিমুর রহমানসহ বীর মুক্তিযোদ্ধা নারায়ন চন্দ্র মল্লিক, শিবপদ বিশ্বাস, রাজু আহমেদ, শিশির মন্ডল, আব্দুল মজিদ, অমিতাব মল্লিক, কিংকর বিশ্বাস, রবি মল্লিক প্রমুখ। সম্মেলন থেকে ঘোষনা দেওয়া হয় উদ্ভুত সমস্যার সমাধানের দাবিতে আগামী ২ সেপ্টেম্বর যশোরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হবে।
সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “ আমরা গভীর উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ও ক্ষোভের সাথে জানাচ্ছি যে, ভবদহ জনপদের ২০০ গ্রামের প্রায় প্রত্যক্ষ ও অ-প্রত্যক্ষভাবে ১০ লক্ষ মানুষ একটি কুচক্রী সিন্ডিকেট কর্তৃক লুটপাটের লালসার শিকার হয়ে পানি তলে তলিয়ে যেতে বসেছে। উদ্ভব হয়েছে মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতি। অথচ পানি উন্নয়ন বোর্ড, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, ঠিকাদার, স্থানীয় সরকার ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী, রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত ও ঘের মালিকেরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলে প্রতি বছর জনগণকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা লুটের স্থায়ী ব্যবস্থা করে নিয়েছে। ভবদহ হলো- ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ‘নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে’। এই চক্র এতই ক্ষমতাবান যে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর ধৃষ্টতা দেখিয়ে ভবদহ স্লুইচ গেট থেকে মোহনা পর্যন্ত ৫০/৬০ কিলোমিটার নদী ভরাট করে ফেলেছে। পানি বেরোবার পথ রুদ্ধ। এই পরিনতির কথা বারবার বলা সত্বেও পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও তাতে কর্ণপাত না করে গণ-দুশমনের ভূমিকায় অবর্তীণ হয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পানি সম্পদ মন্ত্রীর উপস্থিতিতে সরকার আয়োজিত এক কনভেনশনে নীতিগতভাবে পর্যায়ক্রমের বিলগুলোতে টি.আর.এম প্রকল্প গ্রহনের সিদ্ধান্ত হয়। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০২ সালে বিল কেদারিয়ায় এবং পরবর্তী বিল হিসাবে ২০০৬ সালে বিল খুকশিয়ায় টি.আর.এম এর সফলতায় ¯্রােতের ভরবেগ বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্রুত নদীগর্ভের পলি কেটে কাট পয়েন্ট থেকে নদী ২৫/৩০ ফুট গভীর ও মোহনা সচল হয়েছিল। পরবর্তী নির্ধারিত বিল কপালিয়ায় টি.আর.এম কার্যকর করতে গেলে প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র আক্রমণে ২০১২ সালে হুইপ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা আহত হন এবং সরকারি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে টি.আর.এম প্রকল্প বাতিল করে দেয়। ফলে ঐ চক্র ও সিন্ডিকেট স্থায়ী লুটপাটের সরকারি মদদ পেয়ে বসে। সরকারের সিদ্ধান্ত সরকারি দলের একাংশের প্রত্যক্ষ সন্ত্রাসী ভূমিকায় বানচাল হয়ে যায়। এর সাথে যারা জড়িত সকলেই তাদেরকে চেনেন।
সম্মেলনে দাবি করা হয়, পুনরায় ব্যাপক আন্দোলনের মুখে ২০১৭ সালের ১৬ই মার্চ যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রীসহ উর্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একটি জাতীয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এবং ও.ড.গ কর্তৃক ব্যাপক জরিপ ও জনমত যাচাই করে প্রস্তাবিত বিল কপালিয়া ও পর্যায়ক্রমে বিলে বিলে টি.আর.এম প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সে প্রকল্প ঐ চক্রের প্রভাবেই বাস্তবায়নে তালবাহানা শুরু হয়। ২০১৭ সালের ১০ই ডিসেম্বর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রী ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে পুণঃপর্যালোচনার পর পানি সম্পদ মন্ত্রী টি.আর.এম প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। কিন্তু কোনো এক রহস্যজনক কারণে তা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের রোষালনে পড়ে। সে ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচিত হয়। ২০১৮ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর আকর্ষিকভাবে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ঐ প্রকল্প বাতিল করে নতুন প্রকল্প প্রণয়নের নির্দেশ দেন। এরপর হঠাৎ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ভবদহ গেটে এসে টি.আর.এম হবে না এই বিলগুলোকে জলাভূমি হিসাবে ঘোষণা দেন। উপস্থিত জনগণের মধ্যে আপত্তি উঠলে তিনি তাদের সাথে অশোভন আচরণ করেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড জনমত যাচাই করার নীতি লঙ্ঘন করে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ৮০৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করে। যা জনগণের আন্দোলনের মুখে স্থগিত রয়েছে। আপৎকালীন পানি সরাবার নামে বিনা টেন্ডারে স্থানীয় এমপি ও এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রীর সন্তানের ঠিকাদারিতে বেশুমার লুটপাটের সুযোগ করে দেয়া হয়। সাংবাদিক বন্ধুরা সে মুখোশ উন্মোচিত করে রির্পোট করেছেন। সে সকল অনিয়মের আপত্তি করায় সে সময়ে নির্বাহী প্রকৌশলীকে স্টান্ডরিলিজ করা হয়। এবং বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী তার ঠুটো জগন্নাথের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করছেন এবং নদী মেরে ফেলার ষড়যন্ত্রে সামিল হয়েছেন। তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর সমন্বয়ে নদী, পানি বিজ্ঞানকে লঙ্ঘন করে পাম্প দিয়ে পানি সেচে সমস্যা সমাধানের নামে সরকারি টাকা লুটপাটে সামিল হয়েছেন। মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন যে, সেচের মাধ্যমে ব্যাপক ফসল উৎপাদন করা গেছে। প্রকৃত সত্য হলো সিংহভাগ বিলে ফসল হয়নি। বিলগুলো তলিয়ে ছিল। ২০১৯ সালের ১৯শে ডিসেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আহ্বানে স্থানীয় আন্দোলনকারী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় ঐক্যমত হয় যে, টি.আর.এম ছাড়া বিকল্প নেই। ফলে সিদ্ধান্ত হয়- ১) ৮০৮ কোটি টাকার প্রকল্প জনমত যাচাই বহির্ভূত অবাস্তব প্রকল্প বাতিল করতে হবে; ২) বিল কপালিয়ায় টি.আর.এম করার জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। টি.আর.এম ছাড়া সমাধানের বিকল্প কোনো পথ নেই। সেটি কার্যকরীর জন্য নিদের্শনা দেন; ৩) আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের জন্য ৪৯ কোটি টাকার প্রকল্প প্রণয়ন করে দ্রুত কাজ শুরু করা; ৪) এলাকার বিলগুলো জলাভূমি ছিল না ফলে বাস্তবতা বহির্ভূত প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য; এছাড়া ৫) পাম্প করে পানি বের করার প্রস্তাব পাশ করা। এ প্রস্তাবে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ আপত্তি দিয়ে বলেন এ টাকাটা সম্পূর্ণ অপচয় হবে। ঘটেছেও তাই। প্রতিমন্ত্রী বলেন দ্রুতই তিনি এ সকল প্রকল্প পাশ করিয়ে আনবেন।
পানি নিষ্কশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ দাবি করেন,দুঃখজনক হলো পানি সেচ বাদে আর একটি সিদ্ধান্তও কার্যকরি হয়নি। এটাই সত্য যে, সে সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত ছিল স্পষ্টতই প্রতারণা। সে প্রতারণার ফলে অনিবার্যভাবে জনপদ আবারও ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের মুখে। ইতোমধ্যে নদী বাঁচানোর বিপরীতে রাষ্ট্রের টাকা লুটপাটের জন্য ৫০ কোটি টাকার সেচ প্রকল্পের জন্য টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে যা প্রক্রিয়াধীন। সেচ করে সে পানি সরানোর পথ এখন বন্ধ এবং বিল কপালিয়ার শেষ প্রচেষ্টাও যে ব্যর্থ তা প্রমাণিত। আমডাঙ্গা খাল উজানের পানি মাত্র ২৫% মত নিষ্কাশন করতে পারে। আমডাঙ্গা খালই জলাবদ্ধতার সমাধান জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য কুচক্রি মহল ঐ তত্ব ফেরি করে জনগণের আন্দোলনকে লক্ষহীন করে দিতে চায়। ২০০৭ সালে আন্দোলনকারী জনগণ স্বেচ্ছাশ্রমে আমডাঙ্গা খাল খনন করেছিলেন। তখন খালটি পরিপূর্ণ সংস্কারের দাবি করা হয়। ভৈরব নদের সাথে সংযোগ খালের প্রশস্ততা বৃদ্ধি, অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ এবং সংযোগ স্থলে অবস্থিত বসতবাড়ির নিরাপত্তার জন্য মজবুত কাঠামো নির্মাণের দাবি করা হয়। সে দাবি মেনে নেওয়া হলেও তা কার্যকরী করা হয়নি। এখন বাড়িগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঐ সকল বাড়ির মালিকেরা সম্মিলিতভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চেয়ে ব্যর্থ হয়ে খাল বন্ধ করে দেবার উদ্যোগ নিয়েছেন। ফলে বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাত সৃষ্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা সরকার কর্তৃক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও বাড়িঘর সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
এমত পরিস্থিতিতে যদি দ্রুত টি.আর.এম চালু ও আমডাঙ্গা খাল প্রশস্ত করে সংস্কার না করা হয় তাহলে ২০০ গ্রামের প্রত্যক্ষ ও অ-প্রত্যক্ষভাবে ১০ লক্ষ মানুষ শুধু পানিবন্দি হবে। শুধু তাই নয়- এলাকার হাটবাজার, বাড়ী-ঘর, স্কুল-কলেজ, কবরস্থান-শ্মশান, মসজিদ-মন্দির পানির তলে চলে যাবে। জনপদের মানুষকে রোহিঙ্গাদের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে। এসমস্যা নিরসনে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে নিমোক্ত ৬ দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবি গুলো হচ্ছে :-১। এই মুহূর্তে বিল কপালিয়ায় টি.আর.এম চালু করে নদীকে রক্ষা করতে হবে ; ২। অবিলম্বে বিল কপালিয়ায় টি.আর.এম বাস্তবায়ন, হরি শ্রী নদীতে পড়া পলি অপসারণ করতে হবে। পলি মাটি নদীগর্ভে নয়- নদী পাড়ের বাইরে ফেলতে হবে ; ৩। পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়া টেকা-মুক্তেশ্বরী নদী সংস্কার করতে হবে ; ৪। আমডাঙ্গা খাল প্রশস্থ ও গভীর করতে হবে। আমডাঙ্গা খালের স্লুইচগেটের পূর্বাংশে অবিলম্বে খালের দুই পাশে স্থায়ী টেকসই প্রাচীর নির্মাণ করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ; ৫। লুটপাটের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ৫০ কোটি টাকার সেচ প্রকল্প বাতিল করতে হবে ও ৬। সমগ্র কাজ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে কার্যকরী করতে হবে। এবং আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোকে কাজ মনিটরিংয়ের সুযোগ দিতে হবে।














