শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে যশোরে আফ্রিকান রাক্ষুসে মাগুর মাছ চাষ হুমকিতে দেশী মাছ খলিষা ছোটচান্দা পুঁটি রয়না ফলই

0
259

মালিক্জ্জুামান কাকা, যশোর : আফ্রিকান মাগুর মাছ কে হাইব্রিড মাগুর লেবেল লাগিয়ে তার চাষে ঝুঁকছে চাঁচড়ার চাষীরা। তাকে মৎস্য খাতের জন্য তিকর উল্লেখ করে উৎপাদনে নিরুৎসাহিত করছে মৎস্য বিভাগ কিন্ত তা কোন কাজেই আসছে না। যশোর শহরের সব্জীবাগস্থ চাঁচড়া মাগুর পট্টিতে প্রতিদিন এই ক্ষতিকর পোনামাছটি বিক্রি হচ্ছে। অবাধে তা চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। মাগুর সরবরাহে শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলাডাঙা কাজীপুর ও চাঁচড়ায়। এই খাদক মাছের কারনে ইতিমধ্যে দেশী বিভিন্ন মাছ কমে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে খলিষা, পুঁটি, ফলই, ছোট চান্দা, রয়না, চ্যাং, উল্কা, শিং, দেশী কৈ, রুই, কাতলা, মৃগেল, কাল বাউশ, স্বরপুঁটি, বাইন, কাকিলা প্রভৃতি। যশোরের মৎস্য পল্লী চাঁচড়া, বলাডাঙা ও কাজীপুরে হাইব্রিড মাগুর চাষ হচ্ছে বহু দিন ধরে। ১৯৮৭/৮৮ সাল থেকে হাড়িতে স্বল্প আকারে মাগুরপোনা বিক্রি শুরু হয় সব্জীবাগ কৎবেল তলায়। প্রথম ২০ বছর বিনা বাঁধায় তা আফ্রিকান মাগুর বা কান মাগুর নামে পরিচিত ছিল। পরে সরকারের নিষেধাজ্ঞায় তাকে হাইব্রীড আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এই বাজারে গড়ে উঠেছে শক্ত সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট আফ্রিকান মাগুর ও পাঙাশ পোনা পাচারে জড়িত। চাষীদের দাবি থাই ও দেশি মা মাগুরের সঙ্কর প্রজননের মাধ্যমে তারা উৎপাদন ও বিপণন করছেন। যদিও এর পক্ষে তার কোন প্রমান তাদের কাছে নেই। তবে মৎস্য বিভাগ এটাকে আফ্রিকান মাগুর বলে অভিহিত করে চাষের স্বীকৃতি দিচ্ছে না। এমনকি এ ধরণের মাছ চাষে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছে। সূত্র মতে, শ্রাবণ মাসের শেষের দিকে কার্প জাতীয় মা মাছের ডিম উৎপাদন কমে যায়। তখন এখানকার প্রায় সব হ্যাচারি, খামার মালিকরা আফ্রিকান মাগুর উৎপাদনে ঝুঁকে পড়ে। উৎপাদিত সেই পোনা বিক্রির জন্য যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠেছে মাগুর পোনা মাছের বিরাট বাজার। প্রায় দুই শতাধিক খুচরা মাগুর বিক্রেতা এখানে মাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে মৎস্য বিভাগের দাবি এ হাইব্রিড মাগুর উৎপাদন ও বিপণনে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। এ ধরণের সঙ্করায়নের মাধ্যমে যেমন দেশিয় জাতের তি হয়, তেমনি পরিবেশের জন্য তিকর এ ধরণের মাছ চাষ। সংশ্লিষ্ট বিভাগের দাবি নিষিদ্ধ আফ্রিকান মাগুর মাছ চাষীরা হাইব্রিড মাগুর বলে প্রচার চালাচ্ছে। এ ধরণের মাছ চাষে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০১৪ সালের জুন থেকে আফ্রিকান মাগুরের আমদানি, উৎপাদন, বিপণনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিস রুলস, ১৯৮৫ এর কয়েকটি ধারা সংশোধন করে আফ্রিকান মাগুরের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এছাড়া বিদেশ থেকে আফ্রিকান মাগুর ও পিরানহা মাছ, মাছের রেণু ও পোনা আমদানি করলে জেল জরিমানার বিধান রেখে মৎস্য সংঘ নিরোধ আইন-২০১৭ এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিপরিষদ। এই আইন অমান্য করলে দুই বছরের জেল ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কারণ এই দুই প্রজাতির মাছ চাষের ফলে দেশি প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। কোনওভাবে যদি পুকুর বা অবরুদ্ধ জলাশয় থেকে এই মাছ দুটি নদীতে বা মুক্ত জলাশয়ে চলে আসে তাহলে বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ বন্যা প্রবণ দেশ। এখানে পুকুরে বা ঘেরে যদি আফ্রিকান মাগুর মাছ চাষ করা হয়। এবং সেই মাছ যদি পানিতে ভেসে অবরুদ্ধ স্থান থেকে মুক্ত জলাশয় যেমন নদী, খাল বিলে চলে আসে। তখন তাদের আক্রমণে দেশীয় ছোট বড় সব মাছ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও এসব মাছ প্রকাশ্যেই উৎপাদন ও খোলা বাজারে বিক্রি হতে দেখা যায়। যা বেশিরভাগ সময় দেশি মাগুর বা হাইব্রীড মাগুর নামে বিক্রি হয়। এর ছোট আকারের আফ্রিকান মাগুর মাছ, দেশি মাগুর মাছ বলেও বিক্রি হতে দেখা যায়। দামে কম হওয়ায় সেইসঙ্গে অন্য মাছের নামে বিক্রি করায় প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। এই মাছ খেলে কোনও স্বাস্থ্য ঝুঁকি নেই তবে পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে অনেক। কৃষি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আফ্রিকান মাগুর মাছের উৎপাদন, বিপণন, বিক্রি ও সংরণ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা না গেলে বাংলাদেশের ২৬০ প্রজাতির স্বাদু পানির মাছ এবং ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ অধিকাংশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। হ্যাচারি আইন অনুযায়ী এ ধরণের মাছ উৎপাদন ও বিপণন বৈধ নয়। এ কাজে জড়িত প্রতিষ্ঠানকে ৫ লাখ টাকা জরিমানার আইন রয়েছে। তবে বিপুল সংখ্যক মানুষ এ মাছের ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত থাকায় আপাতত কোন পদপে নেওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি এ মাছ চাষের স্বীকৃতি চেয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বরাবর জেলা মৎস্য কর্মকর্তার মাধ্যমে আবেদন করেছে যশোর জেলা হাইব্রিড মাগুর চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতি। তবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ধরণের সঙ্কর প্রজনন পরিবেশের জন্য তিকর। তারা হাইব্রিড মাগুর চাষে চাষিদের নিরুৎসাহিত করে দেশি শিং, মাগুর, চিতল মাছের চাষে চাষিদের অনুপ্রাণিত করছি। যশোর জেলা মৎস্য বিভাগ ব্যবসায়ীদের ওই আবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়নি। আফ্রিকান মাগুর পোনা বড় হলে তার আকার ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি এবং দেখতে প্রায় দেশি মাগুরের মত। এগুলোর ওজন ২০০ থেকে ২৫০ গ্রামের মধ্যে। সঙ্করায়নের মাধ্যমে উৎপন্ন এ মাগুর নিজে খাবার সংগ্রহ করতে পারে না। ফিশ ফিড দিয়ে মানসম্পন্নভাবে এ মাছ উৎপাদন ও বিপণন করেন চাঁচড়ার হাজার হাজার মাছ চাষি। তাদের দাবি, এ মাগুর উদ্ভাবনের পর কার্প জাতীয় খাদ্যের মৌসুম ফুরালেও কাউকে এখন আর বসে থাকতে হয় না। এখানকার হাইব্রিড মাগুর উৎপাদনকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে মোডিফাই (রূপান্তরিত) করতে করতে এ মাছের ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। রাুসে ভাব কেটে গিয়ে এর আচরণ দেশি জাতের মাগুরের মত পরিবর্তিত হয়েছে। তবে কঠিন বাস্তবতা এই, আফ্রিকান মাগুরের সাথে হাইব্রিড মাগুরের কোন মিল নেই। আফ্রিকান মাগুর চাষী ও বাজারের বিক্রেতারা বলেন, হাইব্রিড মাগুর সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় এটাকে অনেকে আফ্রিকান মাগুর বলে মনে করছেন। আসলে এটি সঙ্করায়নের মাধ্যমে উৎপাদিত এক নতুন জাত। এরা এই মাগুর মাছ চাষের স্বীকৃতি দাবি করেন। আফ্রিকান মাগুর বাজারের পুরাতন ব্যবাসায়ি কাজী রইসুল, বলাডাঙার চুন্নু, ডালমিলের সেলিম, চোরমারা দিঘীর পাড়ের পাকলু শরীফ, শহীদ, কামরুল, মিনজুর, নাজমুল, মনু। এরা বলেন, বর্তমানে হাইব্রিড মাগুর উৎপাদন ও বিপণনের সাথে বিভিন্নভাবে চাঁচড়ার পাঁচ হাজার মানুষ জড়িত। এ ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। পরিবার পরিজন নিয়ে এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হবে বলে এরা দাবি করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here