চেক জালিয়াতির মাধ্যম আড়াই কোটি টাকা আতœসাতের ঘটনায় যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মোল্যা আমির ও সচিব আলী আর রেজাসহ ৫জনকে আসামী করে দুদকের মামলা দায়ের

0
361

বিশেষ প্রতিনিধি : চেক জালিয়াতির মাধ্যমে আড়াই কোটি টাকা আতœসাতের অভিযোগে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিবসহ ৫জনকে অভিযুক্ত করে দুদক মামলা করেছে। গতকাল সোমবার বিকেলে দুদক সমন্বিত যশোর জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহফুজ ইকবাল বাদী হয়ে দুদক কার্যালয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় অভিযুক্ত অপর আসামীরা হচ্ছে শিক্ষা বোর্ডের হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম, শাহী লাল স্টোরের মালিক আশরাফুল আলম ও ভেনার্স প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং এর মালিক শরিফুল ইসলাম বাবু। বাদী তার এজাহারে দাবি করেছেন আসামীরা পরস্পর যোগসাজসে বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯/৪৭৭ (ক) তৎসহ ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অপরাধ করেছেন।
এজাহার সূত্রে জানা গেছে, বাদী গতকাল ১৮ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়, ঢাকার স্মারক নং০০.০১.০০০০.১০৯.০২.০০১.২০.১৩৫০ মোতাবেক নির্দেশিত হয়ে এই মর্মে এজাহার দায়ের করছেন যে, অভিযুক্ত যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোল্লা আমীর হোসেন, যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এ. এম. এইচ আলী আর রেজা, যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম, যশোর নতুন উপশহরের হাইকোর্ট মোড়, জামরুল তলা রোডের শাহী লাল স্টোরের প্রোপাইটর আশরাফুল আলম ও মেসার্স ভেনাস প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং এর প্রোপাইটর শরিফুল ইসলাম বাবু পরস্পর যোগসাজস, প্রতারনা, অপরাধমূলক বিশ^াস ভংগ ও হিসাবপত্র সমূহে মিথ্যা বর্ণনার মাধ্যমে সরকারী ২,৫০,৪৪,০১০/- টাকা আত্মসাত করে দন্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯/৪৭৭ (ক) তৎসহ ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অপরাধ করেছেন।
এজাহারে বাদী উল্লেখ করেছেন যে, অভিযোগের প্রেক্ষিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে দুদক যশোর জেলা সমন্বিত টিম যশোর শিক্ষা বোর্ডে এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে। অভিযান পরিচালনাকালে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ২০২০-২১ অর্থ বছরে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাজেটের সম্মানি প্রদানের জন্য ১২ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির মধ্যে চেয়ারম্যান মহোদয়ের একান্ত সচিব (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে কর্মরত হারুন-অর-রশিদ কে বোর্ডের ২০১৯-২০ অর্থ বছরের সংশোধনী এবং ২০২০-২১ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রস্তুত কমিটির সদস্য হিসাবে ২৫,০০০/- টাকা সম্মানি প্রদান করার জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সে মোতাবেক বোর্ডের অডিট শাখা হতে ই-নথির মাধ্যমে নথি উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে হারুন-অর-রশিদের অনুকূলে ২৫,০০০/- টাকা সম্মানি এবং উহা হতে ২,৫০০/- টাকা আয়কর কর্তনের জন্য নথি উপস্থাপন করা হয়; যার বিল আইডি নং- ১১৭৫৭। সে মোতাবেক ২টি ভাউচার প্রস্তুত করা হয়; ভাউচার নং- ২০২১০০০০০৫বি, চেক নং- ০৫১৬৫২৪, তারিখ- ০৭/০৮/২০২০খ্রিঃ মোতাবেক হারুন-অর-রশিদ এর অনুকূলে কর্তন বাদে ২২,৫০০/- টাকার বিল এবং ভাউচার নং- ২০২১০০০০০৫টি, চেক নং- ০৫১৬৫২৫, তারিখ- ০৭/০৮/২০২০খ্রিঃ মোতাবেক উক্ত বিলের বিপরীতে আয়কর কর্তন বাবদ ২,৫০০/- টাকার চেকের মুড়ি বহি প্রস্তুত করা হয়। অভিযুক্ত বোর্ডের অটিড শাখার হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম একই নম্বরের অর্থ্যাৎ চেক নং- ০৫১৬৫২৫, তারিখ- ০৭/০৮/২০২০খ্রিঃ এর মূলকপিতে ২,৫০০/- টাকার পরিবর্তে ২৫,৮০,০১০/- টাকা লিখে কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন করেন। চেকের মুড়ি বহিতে ২,৫০০/- টাকা লেখা থাকলেও মূল কপিতে আয়কর কর্তৃপক্ষের স্থলে মেসার্স ভেনাস প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং এর অনুকূলে ২৫,৮০,০১০/- টাকা প্রদানের জন্য অসৎ উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে লাভাবান হওয়ার মানসে দুর্নীতি, প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহারপূর্বক শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এ. এম. এইচ আলী আর রেজো, আইডি নং- ৬০৬২ এবং চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোল্লা আমীর হোসেন, আইডি নং- ৬০৬৯ চেকে স্বাক্ষর করেন। উক্ত প্রতিষ্ঠানের মালিক শরিফুল ইসলাম বাবু তার নামীয় ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিঃ, যশোর শাখা, যশোরে থাকা হিসাব নং- ০১৪১১১১০০০০৫৫২৯ তে জমা করে উত্তোলনপূর্বক বর্ণিত আসামীদের সাথে পরস্পর যোগসাজসে উক্ত টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এমনিভাবে চেক নং- ০৫১৬৬৮২, তারিখ- ১২/০৮/২০২০খ্রিঃ মোতাবেক ভ্যাট বাবদ কর্তনকৃত ১,২০৭/- টাকার স্থলে ১৫,৪২,০০০/- টাকা লিখে, চেক নং- ০৫১৭২৫৪, তারিখ- ১৯/১১/২০২০খ্রিঃ মোতাবেক ভ্যাট বাবদ কর্তনকৃত ৬০০/- টাকার স্থলে ১৫,৯৮,০০০/- টাকা, চেক নং- ০৫১৮৫৫৫, তারিখ- ০৬/০৫/২০২১খ্রিঃ মোতাবেক ভ্যাট বাবদ কর্তনকৃত ৯৯৬/- টাকার স্থলে ৩৫,৯৮,০০০/- টাকা, চেক নং- ০৫১৮৭৫৫, তারিখ- ২৯/০৬/২০২১খ্রিঃ মোতাবেক ভ্যাট বাবদ কর্তনকৃত ১,৭২৫/- টাকার স্থলে ৪২,৯৮,০০০/- টাকা, চেক নং- ০৫১৮৭৭৫, তারিখ- ৩০/০৬/২০২১খ্রিঃ মোতাবেক ভ্যাট বাবদ কর্তনকৃত ১,৫৮০/- টাকার স্থলে ৩৫,৯৮,০০০/- টাকা, চেক নং- ০৫১৯০০৮, তারিখ- ১৩/০৯/২০২১খ্রিঃ মোতাবেক ভ্যাট বাবদ কর্তনকৃত ৬৫০/- টাকার স্থলে ১৬,৯৮,০০০/- টাকা এবং শাহী লাল স্টোর এর অনুকূলে চেক নং- ০৫১৬৭৮৭, তারিখ- ২৪/০৬/২০২০খ্রিঃ মোতাবেক আয়কর বাবদ কর্তনকৃত ৬০০/- টাকার স্থলে ৩৫,৯০,০০০/- টাকা ও চেক নং- ০৫১৭২৪৩, তারিখ- ১৬/১১/২০২০খ্রিঃ মোতাবেক আয়কর বাবদ কর্তনকৃত ৬৭৮/- টাকার স্থলে ২৫,৪২,০০০/- টাকা; ৯টি চেকের মাধ্যমে ১০,৫৩৬/- টাকার স্থলে ২,৫০,৪৪,০১০/- উত্তোলনপূর্বক অভিযুক্তগণ উক্ত টাকা আত্মসাৎ করেছেন ।
সার্বিক পর্যালোচনায়, আসামীগণ পরস্পর যোগসাজস, প্রতারনা, অপরাধমূলক বিশ^াস ভংগ ও হিসাবপত্র সমূহে মিথ্যা বর্ণনার মাধ্যমে সরকারী ২,৫০,৪৪,০১০/- টাকা আত্মসাত করে দন্ডবিধির ১০৯/৪০৯/৪২০/৪৭৭ (ক) তৎসহ ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অপরাধ করায় (১) মোঃ আব্দুস সালাম, হিসাব সহকারী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোর;পিতা- মোঃ আব্দুস সামাদ, ই/১৪১, উপশহর, যশোর (২) শেখ শরিফুল ইসলাম বাবু, প্রোঃ ভেনাস প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং, রাজারহাট, (৩) মোঃ আশরাফুল আলম, প্রোঃ শাহী লাল স্টোর, হাইকোর্ট মোড়, জামরুল তলা রোড,নতুন উপশহর, যশোর; পিতা- মৃত সিদ্দিক আলী বিশ^াস, গ্রাম- শেখ হাটি, থানা- কোতয়ালী, যশোর। (৪) অধ্যাপক এ. এম. এইচ আলী আর রেজা, সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোর; পিতা- মৃত ইউনুছ আলী লস্কর, গ্রাম- বাঐসোনা, উপজেলা- কালিয়া, নড়াইল; বর্তমানে- ৪১/১, সরকার পাড়া, টুটপাড়া, খুলনা (৫) অধ্যাপক ড. মোল্লা আমীর হোসেন, চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোর; পিতা- মৃত আব্দুর রশিদ মোল্লা, গ্রাম- সিংড়াবুনিয়া, ডাক- বুকাবুনিয়া, থানা- বামনা, জেলা- বরগুনা এর বিরুদ্ধে বর্ণিত ধারায় আপনার কার্যালয়ে বিজ্ঞ সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত, যশোর এর অধিক্ষেত্রাধীনে একটি মামলা রুজু করার জন্য অনুরোধ করা হলো। দুনীতি দমন কমিশন যশোরের উপ পরিচালক নাজমুচ্ছাদাত এজাহারটি গ্রহণ করে মামলটি রেকর্ড করেন। এ বিষয়ে উপ পরিচালক সাংবাদিকদের জানান, প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক নিশ্চিত যে, যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে চেক জালিয়াতির মাধ্যমে পরস্পর যোগসাজগের মাধ্যমে আসামীরা ২ কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ১০ টাকা আতœসাৎ করেছে। এ ঘটনায় প্রাথমিক তদন্ত শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক মাহফুজ ইকবাল আসামীদের নামে দুদক যশোর জেলা সমন্বিত কার্যালয়ে একটি এজাহার দাখিল করেন। আমরা মামলটি রেকড করে প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শেষ করেছি । এখন এজাহারে প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে অধিকতর তদন্ত সম্পন্ন করে অভিযুক্ত আসামীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। এখানে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরো বলেন, যশোর শিক্ষা বোর্ডে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ প্রমানিত হলে আরো অনেকের বিরুদ্ধে দুদক আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে নির্ভরশীল একাধিক সূত্রে জানা গেছে, যশোর শিক্ষা বোর্ডের কতিপয় কর্মকর্তা কর্মচারীর আয় বর্হিভূত কোটি কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পেয়েছেন দুদক। অবৈধ পন্থায় কোটি কোটি টাকা উপার্জনের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে সহসাই অভিযান পরিচালনা করবে দুদক। বিশেষ করে শিক্ষা বোর্ডের কতিপয় চতুর্থ ও তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদের রাতারাতি গাড়ি বাড়ির মালিক বনে যাওয়া, লাখ লাখ টাকার জমাজমি ক্রয় করা, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে পার্টনারশীপ নেওয়া, লাখ লাখ টাকার শেয়ার ক্রয়, ব্যাংক, বীমা ও পোষ্ট অফিসে লাখ লাখ টাকার ডিপোজিট, পেনশন স্ক্রিমে লাখ লাখ টাকা খাটানো ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে মাঠে নামছে দুদক। এছাড়া বোর্ডের বহু কর্মচারী ও কর্মকর্তা অনৈতিক ভাবে নিজেদের বয়স সংশোধন কওে ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ দিয়ে চাকুরি করছে বলেও দুদকের কাছে তথ্য আছে। আর এসব বিষয়ে উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here