মাসের পর মাস হেঁটেও মেলেনা জন্মসনদ

0
232

মেহেদী হাসান, মণিরামপুর : মালয়েশিয়ায় আটকে পড়া স্বামী শামীম হোসেনকে দেশে আনতে জন্মসনদের প্রয়োজনে মনিরামপুরের খেদাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদে যান কাশিপুর গ্রামের রুমি খাতুন। তিন বছর আগে ৩৬৫ টাকা জমা দিয়ে স্বামীর জন্য আবেদন করেন তিনি। শামীম ঠিকই দেশে পৌঁছেছেন। কিন্তু জন্মসনদ হয়নি তাঁর। অবশেষে সোমবার (১ নভেম্বর) রুমি জানতে পারেন তাঁর আবেদনের কোন তথ্য নেই পরিষদে। নতুন আবেদন করতে হবে তাঁকে। দুই মেয়ে তাকিয়া ও তাবাস্মসুমের জন্মসনদের জন্য ৮ মাস আগে আবেদন করেছেন একই গ্রামের মাহফুজা খাতুন। আজও মেয়েদের সনদ পাননি তিনি। একমাস আগে স্ত্রী ও সন্তানেরসহ নিজের জন্মসনদের আবেদন করেন মাহমুদকাটি গ্রামের নাজিম উদ্দিন। গেল ২৩ সেপ্টেম্বর আবেদন করে ওই দিনই মোবাইলে সফল বার্তা পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সনদ হাতে পাননি। ১০ দিন আগে একই পরিষদে জন্মসনদের আবেদন করেন ইমন হোসেন। সোমবার (১ নভেম্বর) পরিষদে গিয়ে জানতে পারেন তাঁর ফাইল উধাও। জন্মসনদ দেওয়ার কথা বলে গত রোববার (৩১ অক্টোবর) খেদাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাশিপুর গ্রামের আল আমিনকে বসিয়ে রাখেন সচিব। পরে তাকে খালি হাতর ফিরিয়ে দেন। জন্মসনদ নিয়ে ভোগান্তির এমন বহু অভিযোগ রয়েছে খেদাপাড়া ইউনিয়নের আবেদনকারীদের। সবার অভিযোগ, পরিষদের চাহিদামত টাকা এবং সব কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করেও মাসের পর মাস ঘুরতে হয় পরিষদে। কিন্তু সনদ মেলেনা। আবার বারবার টাকা নিয়ে একই নামে একাধিরবার ভুল সনদ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এ পরিষদের সচিব ও উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে। গত সোমবার (১ নভেম্বর) সরেজমিন খেদাপাড়া পরিষদে গেলে এসব অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। রুমি খাতুন বলেন, স্বামীর জন্মসনদের জন্যি তিন বছরে বহুবার পরিষদে আইছি। সচিবের কাছে গেলি উদ্যোক্তারে দেখায়। আবার উদ্যোক্তার কাছে গেলি সচিবেরে দেখায়। কাজ করে দেয়না কেউ। ৩৬৫ টাকা দিয়ে কাগজপত্র জমা দিছি। এখন বলতেছে, আমার আবেদনই হয়নি। তিনি বলেন, স্বামীর জন্য সনদ আর কাজে না লাগলেও সামনে মেয়েরে স্কুলে ভর্তি করাব। সেজন্যি জন্মসনদ লাগবে। মাহফুজা খাতুন বলেন, ৮ মাস হাঁটিছি। আজ (সোমবার) আইসে বলিছি, আমার টাকা ফেরত দিতে। জন্মসনদ করাব না। যদিও উপজেলা সহকারী প্রগ্রামার প্রহল্লাদ দেবনাথ বলেন, আমি সপ্তাহে দুই দিন জন্মসনদের আবেদন দেখি। নতুন বা সংশোধনী যে আবেদনই হোক ৩-৪ দিনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জন্মসনদের জন্য ৫০ টাকা আবেদন খরচ হলেও খেদাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদে আবেদনকারীর কাছ থেকে প্রতি আবেদনে ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়। এ টাকা দিয়ে আবেদন করেও মাসের পর মাস হাঁটতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। অভিযোগ মিলছে যারা এর চেয়েও বেশি টাকা দেন তাঁদের কাজ হয়ে যায় দ্রুত। রাতে অফিস করে সচিব মৃনালকান্তি ও উদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেন তাঁদের কাজ করে দেন। আর যারা টাকা দিতে পারেন না তাঁদের হাঁটতে হয় মাসের পর মাস। এ েেত্র পরিষদের দফাদার সোহরাব হোসেনকে ব্যবহার করেন সচিব। আবেদনকারীর কাছ থেকে বেশি টাকা নিয়ে দ্রুত জন্মসনদের কাজ করিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেন সোহরাব। মাহমুদকাটি গ্রামের ইউসুফ আলী বলেন, আমার ভাগ্নির জন্মসনদের জন্য দফাদার সোহরাবকে ৭০০ টাকা দিছি। এক সপ্তাহের মধ্যে সে আমার কাগজ বাড়ি পৌঁছে দেছে। অভিযোগ স্বীকারও করেছেন সোহবার। তিনি বলেন, অনেকের জন্মসনদে ভুল থাকে। তাঁরা জরুরিভাবে সংশোধনী চায়। আমি বাড়তি দুই একশ’ টাকা নিয়ে সচিবরে কিছু দিয়ে তাড়াতাড়ি কাজ করিয়ে নিই। এদিকে গত রোববার (৩১ অক্টোবর) খেদাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদে সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জন্মসনদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন রঘুনাথপুর গ্রামের নফর আলী। তিনি বলেন, আমার ছেলে ও মেয়ের জন্য একসাথে জন্মনিবন্ধন করতে দিই। অনেকদিন ঘুরানোর পর সনদ দেছে। তাতে ছেলের নামের জায়গায় মেয়ের নাম আর মেয়ের নামের জায়গায় ছেলের নাম দিয়ে ফেলেছে। আবার টাকা দিয়ে সংশোধনীর জন্য আবেদন করি। সেবারও আমার স্ত্রীর নামে ভুল করে। সচিবের কাছে গেলে বাড়তি টাকা চান। পরে টাকা দিয়ে আবার কাজ করাতে হয়েছে। এসব বিষয়ে উদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, অনেকে ঠিকমত তথ্য দেননা। আবার কাজ সম্পন্ন হলে নিতে আসেননা। তাই দেরি হয়। সচিব মৃনালকান্তি বলেন, ২০০ টাকার অতিরিক্ত নেওয়া হয় না। অনেক সময় তথ্যের ত্রুটি থাকে। চেয়ারম্যান স্বার করতে দেরি করেন। এ জন্য জন্মসনদ দিতে দেরি হয়। সচিব বলেন, উদ্যোক্তা আনোয়ারও ঠিকমত কথা শোনেন না। তিনি নিজের ইচ্ছামত কাজ করেন। মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জাকির হাসান বলেন, কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here