মালিক্জ্জুামান কাকা, যশোর : দেশীয় প্রজাতির মাছ মলা। স্থানীয়রা বলেন চুনো মাছ। এটি খেতে যেমন সুস্বাদু তেমনি এ মাছ স্বাস্থ্যের জন্য বেশ পুষ্টি সমৃদ্ধ। একই সাথে তা ব্যাপক জনপ্রিয়। ডাক্তাররা মলা মাছ খেতে রোগীদের নিয়মিত পরামর্শ দেন। আমাদের চারিপাশের খাল-বিল কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে এখন মলা মাছ কমেছে। তবে আশার কথা মাছ চাষে কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ায় এই মলা মাছের এখন বানিজ্যিক চাষাবাদ শুরু হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে স্থানীয় পোনা বা বাজারে মাছচাষীরা এই মাছ চাষে আগ্রহী হয়েছেন। এক বা দুই ফসলি নীচু জমিতে এরা এই মাছ চাষের প্রকল্প করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। পোনা মাছের রাজধানি যশোর। দেশের প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ পোনা মাছ এখান থেকে সরবরাহ হয়। এখানে রয়েছে মলা বা চুনো মাছের বিশাল প্রাপ্তী খাত। বাজারে দাম চড়া, সু-স্বাস্থ্য বজায়ে রাখতে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন বিষয়টি এই মাছের বানিজ্যিক উৎপাদনে পোনা মাছ চাষীদের আগ্রহী করেছে। বাজারে এক কেজি মলা মাছ এই মুহুর্তে বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। অর্থাৎ বড় রুই কেজি মৃগেল কালবাউশের থেকে তার দাম বেশি। পোনা মাছচাষীরা জানান, এই মুহুর্তে স্থানীয় বাজারে চুনো বা মলা মাছের উচ্চ মূল্য। তবে মলা মাছের পোনা পরিবহন করা একটা জটিল পদ্ধতি এবং রেনু পরিবহন করা অত্যন্ত সহজ তাই রেনু নিয়ে নিজে পোনা তৈরি করে নার্সারী প্রক্রিয়ায় তার চাষাবাদ করাই উত্তম। এতে খরচ ও ঝুঁকি দুটোই কম হয়। যারা অল্প খরচে মলা মাছ চাষ করতে চান তাদের জন্য রয়েছে চাষ পদ্ধতি। চাহিদা ও বানিজ্যিক বিধায় যশোরের পোনা ও মাছ চাষীরা মলা বা চুনো মাছ চাষে আগ্রহী। মলা মাছ চাষীরা জানান, মাছ ছাড়ার আগে পুকুর প্রস্তুত করণ করতে হবে ভাল ভাবে। প্রথম দিন হতে ৭ থেকে ৮ দিন পর রেনু ছাড়ার ল্য নির্ধারণ করে প্রথমে পুকুরে বিষটোপ ব্যবহার করে সব রাুসে মাছ মেরে ফেলতে হবে। তারপর পুকুরের সব পানি সেচ দিয়ে ফেলে দিতে হবে। যদি পুকুর আকৃতিতে বড় হয় তাহলে সব পানি অপসারণ করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার হবে। এেেত্র অর্ধেক পানি ফেলে দিয়ে পরিস্কার পানি দিয়ে ভরে দিতে হবে। যদি কোনো পানি পরিবর্তন করার সুযোগ না থাকে তাহলেও যে চলবে না তা নয়। সেেেত্র চুনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে। বিষটোপ প্রয়োগের দ্বিতীয় দিন শতাংশ প্রতি আধা কেজি চুন পানিতে গুলে ছিটিয়ে দিতে হবে। যদি পুকুর বেশি পুরাতন হয় এবং পানি পরিবর্তন করার সুযোগ না থাকে সেেেত্র শতাংশ প্রতি ১ কেজি পরিমাণ চুন দেয়া ভালো হবে। বিষটোপ প্রয়োগের ষষ্ঠ দিনে হাস পোকা মারার জন্য সুমিথিয়ন ব্যবহার করতে হবে পুকুরে। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে ০.৩ পিপিএম মাত্রায় সুমিথিয়ন ব্যবহার করতে হবে। অনেকেই হাসপোকা মারার জন্য অন্য ঔষধ ব্যবহারের জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন। মলা মাছের েেত্র সুমিথিয়ন ভালো। সুমিথিয়ন সন্ধ্যা বেলায় পুকুরে প্রয়োগ করতে হবে। এর দুইদিন পর পুকুরে রেনু ছাড়তে হবে। পুকুরে রেনু ছাড়ার পদ্ধতিও জানা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে নিয়ম এই, প্রথমে পানি ভর্তি রেনুর ব্যাগ পুকুরের পানিতে আধাঘণ্টা ভাসিয়ে রাখতে হবে পুকুরের পানির তাপমাত্রা সামঞ্জস্য হওয়ার জন্য। আধা ঘণ্টা পর ব্যাগের মুখ খুলে ব্যাগের পানির ভিতর হাত ঢুকিয়ে এবং পরে পুকুরের পানিতে হাত ঢুকিয়ে ব্যাগ ও পুকুরের পানির তাপমাত্রা একই মনে হবে তখন পুকুরের পানি দিয়ে অল্প অল্প করে ব্যাগে ঢুকিয়ে আবার বের করে এভাবে রেনু ধীরে ধীরে ছাড়তে হবে। এভাবেই রেনু ছাড়ার কাজ শেষ করতে হবে। রেনুর জন্য খাবার প্রয়োগ পদ্ধতি: রেনু ছাড়ার ঠিক দুই ঘণ্টা পর খাবার দিতে হবে। দিনে দুইবার খাবার দিতে হবে। সকাল ১০টার দিকে এবং বিকাল ৫টার সময় নিয়ম মানাই সেক্ষেত্রে ভালো। খাবার হিসেবে প্রথম ২ দিন ডিম ( সাদা অংশসহ) খেতে দিতে হবে। এ জন্য প্রথমে হাঁসের ডিম সিদ্ধ করে ব্লেন্ডার দিয়ে ভালো করে ব্লেন্ড করে পলেস্টার কাপড় দিয়ে ছেঁকে মিহি করে পানির সাথে মিশিয়ে পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। প্রতি ৫ শতাংশে একটি করে ডিম দিতে হবে। তৃতীয় দিন থেকে নার্সারি পাউডার ৩-৬ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। প্রতি ১০ শতাংশে ১ কেজি খাবার দিতে হবে দিনে দুইবার ভাগ করে। ১০ দিন পর খাবার প্রতি ১০ শতাংশে ১.৫ কেজি খাবার দিতে হবে। এভাবে চলবে ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত। এরপর খাদ্য প্রয়োগ কৌশল বদলাতে হবে। পরিবর্তিত খাদ্য প্রয়োগ পদ্ধতি ২৫ দিন পর থেকে এক সপ্তাহের খাবার এক সাথে পুকুরে ভিজিয়ে রেখে খাওয়াতে হবে। যেহেতু মলা মাছ ফাইটো প্লাংকটন ভোজী তাই একটু ভিন্ন ভাবে খাবার দেয়া দরকার। এক্ষেত্রে এক সপ্তাহের জন্য ১০০ কেজি খাবার প্রয়োজন পড়বে। তবে কোথাও কোথাও কিছু ব্যতিক্রম হতে পারে। নার্সারি পাউডারের মতো দামি খাবার খাওয়ানো যাবেনা মলা মাছকে। তাই ১০০ কেজি সরিষার খৈলকে সাত বস্তায় সমান ভাগ করে প্রতি বস্তায় চার কেজি ইউরিয়া সার খৈলের সাথে মিশিয়ে পানিতে খুঁটিতে বেঁধে রাখলে তিনদিন পর এই খৈলের বস্তা পানিতে ভেসে উঠবে। এরপর এক এক বস্তা খৈল প্রতিদিন দুই বেলা দিতে হবে। এতে প্লাংকটন বৃদ্ধির পাশাপাশি মাছের খাবার ভালো মানের হবে। এভাবে সাড়ে তিন মাস থেকে চার মাসে বাজার জাত করা যাবে মলা বা চুনো মাছ। এখন শীত কাল আসন্ন। তাই এতদ অঞ্চলের নীচু ও বিলের জমির পানি কমে যাবে। বিশেষ করে ভবদহের পানি প্রভাবিত এলাকায় এখন ব্যাপক হারে মলা মাছ চাষ করা যেতে পারে। বিগত ২/৩ বছরে মলা না হলেও বিভিন্ন মাছ চাষ প্রকল্প সেখানে গড়ে উঠেছে। ঐ এলাকার মাছচাষীরা জানান, ভবদহে মলা চাষ নার্সারী গড়ে ওঠাটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এখানকার মাছ চাষীরা এ বিষয়ে বিভিন্ন স্থানে কর্ম কৌশল যাচাই বাছাই করছেন।
চাঁচড়ার মৎস্য চাষী ইদ্রিস আলী (৪৫) বলেন, চুনো (মলা) মাছের বাজারে উচ্চ মূল্য। এক পোয় আধা পোয়া করে মানুষ তা ক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে। প্রতিদিনের বাজারের মেন্যুতে বাড়ির মা বউরা এই মাছ আনার তাগিদ দেয়। চোখের জ্যোতি ঠিক রাখতে, হার্ট ভালো সহ কয়েকটি রোগের প্রতিকার পেতে ডাক্তার চুনো মাছ খাওয়ার পরামর্শ দেন। আর তাই আগামি সিজনে তিনি চুনো মাছ চাষ করবেন মনস্থির করেছেন। প্রথমে স্বল্প জলাশয়ে পরে একটু বুঝে ব্যাপক পরিসরে তিনি চুনো বা মলা মাছ চাষ করবেন বলে জানান। জেলার শার্শা উপজেলার বেড়ী গ্রামের সাহাবুদ্দীন (৪২) বলেন, তিনি বাড়ির দুইটি বড় পকুরে চুনো মাছ চাষ করেছেন। এমনকি তার পুকুরে এই ধারার কুঁেচা চিংড়ীও ব্যাপক ভাবে উৎপাদন হচ্ছে। বড় বা বাজারে মাছ থাকলেও মলা মাছের কোন ক্ষতি সেখানে হচ্ছেনা বলে তিনি জানান। তার মলা মাছের মধ্যে রয়েছে কুঁচো চিংড়ী, দেশী পুঁটি, খলিষা, ছোট চান্দা, দেশী কৈ, শিং, জিওল, উল্কো, চ্যাং, শৈল, ছোট ফলই, বাইন, গুতেল, বেলে, রয়না, কাকলের ২/৩ ঝাঁক, দেশী ছোট ট্যাংরা, জাপানী পুঁটি, মৃগেল, মিরর কার্প, রুই ও কাতলা। তিনি বলেন, উল্লেখিত মাছের মধ্যে কেবল শোল, চ্যাং ও উল্কো মাছ খাদক। তবে এরা সেভাবে চুনো মাছের ক্ষতি করতে পারেনা। ওদের জন্য পোকা মাকড়ের ব্যবস্থা আছে। ফলে মাছ খেতে তাদের আগ্রহ কম। এটি একটি পজিটিভ দিক।















