আগাম জাতের শিম চাষে প্রস্তুত যশোরের কৃষক

0
371

মালিকুজ্জামান কাকা,যশোর: গত কয়েক বছর যশোরে আগাম জাতের শিম চাষ করে লাভবান হয়েছেন কৃষক। চলতি মৌসুমের শুরুতেই এখন শিম বীজ রোপনের জন্য মুখিয়ে আছে কৃষক। তেমনি, সড়কের দুইধারের শত শত জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে। জৈষ্ঠ মাসেই আগাম শীম বীজ রোপণ করা শুরু হয়ে যাবে। যশোর জেলায় অন্তত ৫/৬ হাজার কৃষক শিম চাষে লাভবান হন। সবজি চাষের রাজধানীখ্যাত যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের দুই ধারে গ্রাম সদর উপজেলার চুড়ামনকাঠি, বারীনগর, সাতমাইল, বাঘারপাড়া খাজুরা ও বন্দবিলা এলাকায় আগাম শিম চাষের জন্য মুখিয়ে আছে কৃষক। বাজারে ভালো দাম থাকায় আগাম শিম তে পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক। গত মৌসুমে শুধুমাত্র বাঘারপাড়ার বন্দবিলা গ্রামের শতাধিক কৃষক শিম চাষ করে চমক সৃষ্টি করেছেন। স্থানীয় কৃষকরা জানায়, জৈষ্ঠ্য মাসে আগাম জাতের শিম বীজ বপন করা হয়। বপরেনর আড়াই মাস পরে গাছে শিম ফলন হতে শুরু করে। প্রথমদিকে ১১০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে শিম বিক্রি হয়। তবে দিন যতো যাচ্ছে ততোই শিমের ফলন বাড়ছে। একই সাথে শুরু হয়ে যায় শীত মৌসুমের প্রস্তুতি। যশোরাঞ্চলে উৎপাদিত আগাম জাতের শিম ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। গতবারের মতো এবারও জানুয়ারি থেকে তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদিআরবসহ কয়েকটি দেশে শিম রফতানি শুরু হয়েছে। এটি কৃষকদের জন্য আশাপ্রদ। যশোর সদর উপজেলার দৌলতদিহি গ্রামের কৃষকরা জানান, একবিঘা জমিতে আগাম শিম চাষে খরচ হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। মাঘ মাস পর্যন্ত কমপে তিন হাজার কেজি শিম বিক্রি করা যায়। প্রতিকেজি ৪০ টাকা দর ধরলে বিক্রি হবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। আগের আমলের দেশি শিম যেমন ঘি-কাঞ্চন, হাতিকানি, বানতোড়া, কাকিলা ও পুটুলে প্রভৃতি শিমের চাষ করে এই লাভটা পাওয়া যেতো না। সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি গ্রামের পুরাতন শিমচাষী ওলিয়ার রহমান, হাফেজ বখতিয়ার ও জালাল উদ্দিন জানান, আগাম শিম চাষে কিছুটা প্রযুক্তিগত জ্ঞানের দরকার হয়। পরাগায়ণের পর সৃষ্ট ুদ্র শিম ফুল দিয়ে আবৃত থাকে। ফুল সরিয়ে না দিলে সেটি পূর্ণাঙ্গ শিমে পরিণত হতে পারে না। বেশির ভাগ েেত্র বৃষ্টির পানিতে অথবা শিশিরে ফুল ভিজে পচে যেত। কিন্তু বর্তমানে শিমের উন্নত জাতের উদ্ভাবনে ওই সমস্যা নেই। এখন কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই শিম চাষ করা যায়। যশোর সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এসএম খালিদ সাইফুল্লাহ জানান, আসন্ন মৌসুমে সদর উপজেলায় ৭০০ হেক্টর জমিতে শিম চাষ হতে পারে। এতে কয়েক হাজার কৃষক লাভবান হবেন। আগাম শিম চাষের জন্য কৃষকের যেন আর তর সইছে না। এবার আবহাওয়া এখনো পর্যন্ত অনুকূলে। এ কারনে কৃষকের আশা আরো বেড়েছে। মৗসুমী শিম চাষের থেকে আগাম চাষে বেশি লাভবান হন কৃষক। তবে চলে যাওয়া জানুয়ারি মাসে গতবছরের মতো কয়েকটি দেশে শিম রপ্তানীতে কৃষক ন্যায্য দাম পেয়েছেন। যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্র জানিয়েছে, দেশের সবজির একটি বড় অংশ উৎপাদিত হয় যশোরে। গ্রীষ্মকালিন, আগাম শীতকালিন ও শীতকালিন এই তিন ভাগে বারো মাস সবজির চাষ হয়ে থাকে। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সবজির চাষ হয় যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি, হৈবতপুর ও কাশিমপুর ইউনিয়নে। নতুন করে বাঘারপাড়া ও মণিরামপুরের কিছু এলাকা যোগ হয়েছে। এবার যশোর সদর উপজেলায় আগাম শীতকালিন সবজির চাষ টার্গেট ৩০০০ হেক্টর। এরমধ্যে সবজি খ্যাত হৈবতপুর ইউনিয়নে ১৩৫০ হেক্টর, চুড়ামনকাটি ইউনিয়নে ৪৫০ হেক্টর ও কাশিমপুর ইউনিয়নে ২৮৫ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালিন সবজির চাষ হবে ধারনা করা হচ্ছে। এই এলাকার সবজির সুনামের পাশাপাশি ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা জাকির হোসেন। চুড়ামনকাঠি, আব্দুলপুর, ছাতিয়ানতলা, শানতলা, নুরপুর, বাগডাঙ্গা, দোগাছিয়া, সাজিয়ালী, শ্যামনগর ও কমলাপুরস হৈবতপুর, তীরেরহাট, মানিকদিহি, মথুরাপুর, শাহাবাজপুর, মুরাদগড়, কাশিমপুর, বিজয়নগর, দৌলতদিহি, বালিয়াঘাট, ললিতাদাহ, বালিয়াডাঙ্গা, বেনেয়ালী, ডহেরপাড়া, লাউখালী, নাটুয়াপাড়া, সাতমাইল, বারীনগরসহ বিভিন্ন মাঠ এখনো আগাম সবজিতে ভরা। যেদিকে নজর যায় সেদিকেই দেখা মিলছে নানা প্রকারের সবজি েেতর। এর মধ্যে, টমেটো, শাক, কাঁচা ঝাল, বেগুন, পটল, পুঁইশাক, লালশাক, ডাটা শাক, লাউ উল্লেখযোগ্য। সবজি চাষি অনেকেই জানান, এবারের মৌসুমে সব ধরণের সবজিতে বাম্পার ফলন হয়েছে। বর্তমান বাজার মূল্য বেশি থাকায় তারা প্রতিদিনই সবজি বাজারজাত করছেন। গতবার বৃষ্টিপাতের কারণে আর্থিকভাবে তিগ্রস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এবার সময়োপযোগী আবহাওয়া ও পরিমান মতো বৃষ্টির কারণে ফলন হয়েছে। এখন বাজার দর ভালো হওয়ায় আগাম শীতকালিন সবজি চাষে এবার লাভবান হবেন বলে আশাবাদী। যশোর শহরের বড় বাজারের সবজি বিক্রেতারা জানান, আগাম শীতকালিন সবজির ভালো দাম পায় চাষিরা। পাইকারী হাটে এসময় প্রতি কেজি সিম ১৪০ টাকা ও ফুল কপি ১৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। এছাড়া টমেটো ৪০ টাকা, মুলা ৫০ টাকা ও বাঁধা কপি ৫০/৬০ টাকা কেজি বিক্রি হয়।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস জানান, যশোর সবজির জেলা হিসেবে সারা দেশে পরিচিত। এখানকার সবজির সুনাম অনেক। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ছে দেশ বিদেশের বাজারে। দুটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সবজি বিদেশ যাচ্ছে। বর্তমানে গ্রীষ্মকালিন সবজির ভরা মৌসুম চলছে। চাষ হয়েছে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে। বাম্পার ফলন। দাম পাচ্ছেন ভালই। এতে চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হন। কিছু দিন পরে আগাম শীত কালিন সবজির চাষ শুরু হবে। ১০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ করার ল্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এরপর ১৬/১৭ হাজার হেক্টর জমিতে শীতকালিন সবজির আবাদ করবেন চাষিরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here