স্টাফ রিপোর্টার : সুবিধা বঞ্চিত দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের দোয়ার আজ উšে§াচন হচ্ছে । এ অঞ্চলের মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে চলেছে বছরের পর বছর অথচ সেই তুলনায় মুখে সাফল্যের হাসি লেগেছে খুবই কম। তাদের পরিশ্রমের সঠিক মুল্য পায়নি একমাত্র যোগাযোগের ব্যবস্থার কারনে। এ অঞ্চলের মানুষের উৎপাদিত মাছ সবজি ফুল দেশের ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মানুষের চাহিদা মেটায়। অথচ সে সব পণ্যের প্রকৃত দাম পায় না তারা একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য। এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে রাজধানীতে যেতে মধ্যবিত্তদের পোহাতে হত অসহ্য যন্ত্রনা। ঘন্টার পর ঘন্টা ফেরী জ্যামে পড়ে ছটফট করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকতো না। কোন কোন ক্ষেত্রে ঢাকায় পৌছাতে যশোর থেকে ১০ থেকে ১৫ ঘন্টা লেগে যেত। সেসব সমস্যার সমাধান হবে আজ। ইচ্ছা করলে সকালে যেয়ে সন্ধ্যার মধ্যেই কাজ সেরে আসা যাবে। এটা স্বপ্ন না এটা বাস্তব। যেটা দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যে ঘটলো। সেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু, সেই ভাগ্যের,দোয়ার আজ উšে§াচন হচ্ছে তাও আবার নিজেদের টাকায়। বাংলাদেশের জন্য এটা বিশাল অর্জন। পৃথিবী আরেকবার দেখলো বাঙ্গালী ইচ্ছা করলে সব পারে। এতো বড় অর্জন নিয়ে এখনও এক শ্রেণীর মানুষ সমালোচনা করছে। এটা কি উচিৎ। এখানে কোন রাজনৈতিক পরিচয় না দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ হিসাবে যদি দেখা যায় তাহলে নি:সন্দেহে এর কোন তুলনা নেই। শধুই প্রশংসা আর প্রশংসা। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহি জেলা যশোর । এখানকার উৎপাদিত ফুল দেশের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ চাহিদা মেটায়। কিন্ত ফুল চাষিরা একমাত্র যোগাযোগের জন্য সঠিক মুল্য পায়না। এছাড়া ফেরী জ্যামের কারনে ঘন্টার পর ঘন্টা গোয়ালন্দ ঘাটে আটকে থাকতো হয়েছে। তাতে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌছাতে পারেনি। আবার অনেক সময় ফুল নষ্ট হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে বেপারীর সাথে ফুলের মূল্য নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। এখন তারা স্বাধীনভাবে ফুল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে সহজেই পাঠাতে পারবে। থাকবে না তাদের আর ভোগান্তী। তাই পদ্মা সেতু নিয়ে ফুল চাষিদের মাঝে বইছে আনন্দের জোয়ার। কথা হয় যশোরে ফুল ব্যবসায়ি বাংলাদেশ ফাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিমের সাথে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ভাগ ফুল যশোরের গদখালি থেকে সরবরাহ করা হয়। যোগাযোগের ব্যবস্থা ভালো ছিলোনা । ফেরীর কারনে কোন কোন ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ ঘন্টা পরিবহন আটকা পড়ে থাকতে হয়েছে। সেত্রে নির্দিষ্ট সময় ব্যবসায়ির কাছে ফুল পৌছানো কঠিন হয়ে পড়তো। পদ্মা সেতু উদ্বোধনে গদখালি এলাকার ফুল চাষিদের মাঝে আনন্দের বন্যা বইছে। এই সেতুর কারনে অবশ্যই অল্প সময়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে ফুল সহজেই পৌছাতে পারবো। ফাওয়ার সমিতির সভাপতি অভিযোগ করে বলেন, বর্তমানে এক বান্ডিল ফুল ঢাকায় পৌছাতে লাগে ৩শ’টাকা। পদ্মা সেতুর টোলের কারনে পরিবহন যদি ভাড়া বাড়িয়ে ৫শ’ টাকা করে তাহলে চাষিরা বিপদে পড়বে। কারন ইচ্ছা মত আমরা ফুলের দাম বাড়াতে পারিনা।
ফুলের পাশাপাশি যশোরের মাছ দেশের অর্থনৈতিক বাজারে প্রভাব ফেলে চলেছে আবার দেশের পুষ্টির চাহিদার একটা বিরাট অংশ পূরন করলেও এখানকার মৎস্যচাষিদের যোগাযোগ নিয়ে ভোগান্তির শেষ ছিলোনা। সেই সাথে ভোগান্তিতে ছিল বাংলার সাদা সোনা নামে খ্যাত সাতক্ষীরার চিংড়ি চাষীরা। তাদের একটাই চাওয়া ছিল ফেরীর ঝামেলা বাঁচিয়ে কিভাবে রাজধানীতে মাছ পৌছানো যায়। আজ তাদের স্বপ্ন সফল হয়েছে। স্বপ্ন আজ তাদের হাতে এসে ধরা দিয়েছে। এখন থেকে প্রসার ঘটবে সব ক্ষেত্রে এ প্রসংগে যশোর হ্যাচারী মালিক সমিতির সভাপতি দুইবার স্বর্ণপদক প্রাপ্ত ফিরোজ খান বলেন রাজধানীর বাজারে মাছ পৌছাতে যশোরের মাছ চাষিদের রীতিমত হিমশিম খেতে হয়েছে। ঘন্টা পর ঘন্টা ফেরিঘাটে আটকে মাছের ক্ষতি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে লাভের পরিবর্তে বেশীর সময় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। স্বপ্নে পদ্মা সেতু দনি পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের দোয়ার ,উšে§াচন করে দিয়েছে। প্রচার ঘটবে ব্যবসায়ির সকল সেক্টরে। তবে যশোরের মাছ চাষিরা হাতে পেয়েছে সোনার হরিণ। যশোর জুড়ে উৎপাদন হয় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম সবজি। যা স্থানীয় মানুষের চাহিদা মিটিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌছে যায়। বাধা ছিল ফেরী। আজ যা সমাধান হলো
সবজি চাষি আহম্মদ আলী বলেন, সবজি ঢাকায় পাঠানোর সময় চিন্তায় থাকি সময়মতো ঘাট পার হওয়া নিয়ে। কারণ সময়মতো পার হতে না পারলে সঠিক সময়ে ঢাকার আড়তে সবজি পৌঁছাবে না। এতে সবজির মান কমে যাবে। দামও কম হবে। এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে ফেরি বন্ধ থাকে। সে সময় আরও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। দেরির কারণে সবজি বাসি হয়ে গেলে দাম তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসে। এমন বিড়ম্বনায় অনেক টাকার লোকসানও হয়েছে।
সবজি চাষি নুর হোসেন বলেন , কেজি পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ১৩ থেকে ১৫ টাকায়। ঢাকার কারওয়ান বাজারে সেই পেঁপের দাম ৪০ টাকা। অন্য সবজির দামও এমনই। পদ্মা সেতু চালু হলে দু-তিন কৃষক মিলে একটি ট্রাক ভাড়া করে সবজি নিয়ে ঢাকার বাজারে সরাসরি দিতে পারলে প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা সম্ভব। কিন্তু ফেরিঘাটের কারণে এটি সম্ভব ছিল না। কারণ ঘাটের জ্যাম, পরিবহন ব্যয়, সবজি পচে যাওয়ার শঙ্কা ইত্যাদি। কিন্তু পদ্মা সেতু চালু হলে এ সমস্যা কেটে যাবে।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নূরুজ্জামান বলেন, যমুনা সেতু চালুর ফলে উত্তরাঞ্চলে কৃষিখাত বিপ্লব ঘটেছে। তেমনি পদ্মা সেতু চালু হলে উত্তরের মতো কৃষি বিপ্লব ঘটবে যশোর অঞ্চলেও।’ তার মতে, যশোরে মোট ৩৩ ধরনের সবজি উৎপাদন হয়। হেক্টর প্রতি সবজির গড় ফলন ২৩-২৫ টন। যা অন্য জেলার চেয়ে বেশি। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিপুল পরিমাণ সবজি রাজধানীসহ পদ্মার ওপারে বিভিন্ন জেলায় যায়। ফেরিঘাটে সময় বেশি লাগায় অনেক সবজি নষ্ট হয়। পদ্মাসেতু চালু হলে সবজি নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও ভালো পাওয়া যাবে।
যশোর জেলাতে দুটি বন্দর রয়েছে। একটি দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল ও অপরটি নওয়াপাড়া নৌ-বন্দর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা সেতুকে ঘিরে ঘুরে দাঁড়াবে এই দুটি বন্দর। বাড়বে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। তবে পূর্ণ বাণিজ্যিক সুবিধা পেতে বন্দর দুটিকে সমতা বাড়াতে হবে অভিমত ব্যবসায়ীদের। বেনাপোল কাস্টম সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পণ্য আমদানি করা হয়েছে ২০ লাখ ১১ হাজার ৬ মেট্রিক টন পণ্য, ২০১৯-২০ অর্থবছরে পণ্য আমদানি করা হয়েছিল ২০ লাখ ৩৮ হাজার ৬৪ মেট্রিক টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ২৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬০৬ মেট্রিক টন। আমদানি ও রফতানি থেকে বন্দর ও কাস্টমস রাজস্ব আদায় করে কমপে ৮ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতু চালুর পর আরও গতি বাড়বে বেনাপোল বন্দরে। পদ্মা সেতু চালুর পর নওয়াপাড়া বন্দর দিয়ে বাণিজ্যিক সুবিধা দ্বিগুণ হবে। এই সেতুকে ঘিরে যশোর ও মোংলায় শিল্প প্রতিষ্ঠান হবে। তখন মোংলা সুমদ্র বন্দর দিয়ে আমদানি বাড়বে। আর মোংলায় জাহাজ বাড়লে নওয়াপাড়া নৌবন্দর ব্যবহার বাড়বে। সেতু ঘিরে যশোর ও মোংলায় শিল্প প্রতিষ্ঠান হবে। তখন মোংলা সুমদ্র বন্দর দিয়ে আমদানি বাড়বে। আর মোংলায় জাহাজ বাড়লে নওয়াপাড়া নৌবন্দর ব্যবহার বাড়বে। এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা ছোট বা বড় কার্গো জাহাজে করে পণ্য আনবে। এই বন্দর দিয়ে মূলত সার, সিমেন্ট, কয়লা, গমসহ বিভিন্ন পণ্য এসে থাকে। পদ্মা সেতুর কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ-ব ঘটলে এ বন্দর ব্যবহার বেড়ে যাবে। কারণ এখান থেকে খালাসকৃত পণ্য কম সময়েই ট্রাকে ঢাকায় পাঠানো সম্ভব হবে। পদ্মা সেতুর কারণে সড়ক পথে কম সময় লাগবে ঢাকায় যেতে। এতে সবাই আগ্রহ দেখাবে বেনাপোল বন্দর দিয়ে মালামাল নিতে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে, বেনাপোল বন্দরের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর জানান, পদ্মা সেতুর কারণে বন্দর দিয়ে বাণিজ্য গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে। ইতিমধ্যে বন্দরে ৩৬৫টি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ৪শ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলমান। প্রয়োজনে আর একশ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এসব উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত হলে এ বন্দরে বাণিজ্যে আরো গতি বাড়বে।















