ঝিকরগাছায় দলিলের কারসাজিতে আটকে গেলো সাড়ে ২৪কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাংলাদেশ-আমেরিকা সৌহার্দ্য ফুল বিপণন কেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

0
201

মোহাম্ম্দ আলী জিন্নাহ, ঝিকরগাছা (যশোর) প্রতিনিধিঃ যশোরের ঝিকরগাছার ফুলের রাজ্যখ্যাত পানিসারা-গদখালিতে সাড়ে ২৪কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাংলাদেশ-আমেরিকা সৌহার্দ্য ফুল বিপণন কেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে! আমেরিকান জনগণের অর্থায়নে নির্মিত প্রতিষ্ঠানটির জমিদাতা পক্ষের কারসাজিমূলক সৃষ্ট দলিলে অসংগতিপূর্ণ শর্তজুড়ে দেওয়ায় এই সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি জানাজানির পর এলাকার ফুলচাষি ও ফুল ব্যবসায়ীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। জমির দাতাপক্ষের সৃষ্ট অসংগতিপূর্ণ দলিলের চাঞ্চল্যকর বিষয়টি নজরে এসেছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের। ইতোমধ্যে বিষয়টি ঘিরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। নড়েচড়ে বসেছেন প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানাগেছে, জমির দলিলে একটি অংশে বলা হয়েছে ‘জমির লিজমানি দিতে হবে এবং জমির বাজারমূল্য অনুযায়ী দাম পরিশোধ করতে হবে। সেই দাম যদি ২০বছরে পরিশোধ করা না হয়, তাহলে জমির স্থাপনাসহ মালিকানা জমির মালিকদের অনুকূলে চলে যাবে। এমন একটি শর্ত দিয়ে জমির মালিকানা হস্তান্তর করা হয়েছে; যা এক পর্যায়ে তা জানতে পেরেছেন প্রশাসন। এই শর্তটি সংশোধন করা না হলে কেন্দ্রের মালিকানার বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়ে যেতে পারে। কেন্দ্রটি নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ফুল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, ফুল ও বীজের গুণগতমান উন্নয়ন, ফুল ও ফলের বীজ সংরক্ষণ অর্থাৎ সেগুলো শটিং, গ্রেডিং ও প্যাকেজিং করা। এর মাধ্যমে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করা। মূলত, ফুল ও চাষিদের উন্নয়নে কেন্দ্রটি ভূমিকা রাখবে। কিন্তু, সুক্ষ্মকারচুপির মাধ্যমে সৃষ্ট দলিলে শর্তজুড়ে দেওয়ার ঘটনা ফাঁস হয়ে পড়ায় কেন্দ্রটির ভবিষৎ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে, এলাকার হাজার-হাজার কৃষকের স্বপ্ন ভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে, প্রতিষ্ঠানটি উদ্বোধনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় ঝিকরগাছার গদখালি, পানিসারা, নাভারণ ও নির্বাসখোলাসহ অত্র উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের অন্তত ১০সহস্রাধিক ফুল ও সবজি চাষী চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পাশাপাশি ফুলের বাজার কেন্দ্রীক ১০হাজার ফুলচাষির পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে আরো অন্তত ১৫হাজার মধ্যস্বত্বভোগি কৃষি পরিবার। যাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ হয়ে থাকে ফুলের চাষ ও ব্যবসাকে কেন্দ্র করে। কারণ, প্রতিষ্ঠানটি চালু হলে গ্লাডিউলাক্স, জারবেরা, টিউলিপ, লিলিয়াম, সূর্যমুখী, চন্দ্রমল্লিকাসহ নানা জাতের ফুল ও ফুলের বীজ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারতো। ফলে, মানসম্মত ফুল উৎপাদনের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পেত অত্র এলাকার ২৫/৩০হাজার কৃষক পরিবার। অথচ, প্রতিষ্ঠানটি চালু না হওয়ায় সুবিধা বঞ্চিত হতে চলেছে এখানকার ফুল চাষিরা। বিশ^স্ত একাধিক সূত্রে জানাগেছে, যশোরের জেলা প্রশাসক মোঃ তমিজুল ইসলাম খান ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহবুবুল হক’কে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সাবেক সভাপতি জমিদাতা আঃ রহিমসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছেন। অতঃপর এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহবুবুল হক জমিদাতাপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের তার অফিস কক্ষে ডেকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করেছেন। তবে, বিষয়টির এখনও কোন চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানাগেছে। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সাবেক সভাপতি ও জমিদাতা আব্দুর রহিম দাবি করেন, তিনি কোন অসৎ উদ্দেশ্য কিংবা দূরভিসন্ধীমূলক দলিল করে দেননি। দলিলের ৯টি শর্তের মধ্যে একটি শর্তের ব্যাপারে যে আপত্তি তোলা হচ্ছে ভবিষ্যতেও এব্যপারে মূল দাতাদের কেউ কোন প্রকার আপত্তি তুলবেনা। আমি এই বিষয়টি ডিসি সাহেবকে আশ^স্ত করেছি। কিন্তু তিনি আমার কথায় আশ^স্ত হতে পারছেন না। তাছাড়া প্রকল্প শুরুর আগে ফ্লাওয়ার সোসাইটির তখনকার সকল সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এখন তারা অস্বীকার করছেন এটা খুব দুঃখজনক। জানাগেছে, গদখালি-পানিসারা এলাকার ফুলচাষি ও ফুল ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিলো ফুল প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক ফুল বাজার তৈরি করার। এরই প্রেক্ষিতে পানিসারা এলাকায় ২০১৮সালের ৬মে এক একর জমিতে কেন্দ্রটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২৪কোটি ৫০লাখ টাকা ব্যয়ে গত বছরের ৩০জুন কাজ শেষ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
কেন্দ্রটি আদৌ চালু হবে কিনা জানতে চাইলে ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহবুবুল হক বলেন, চালু হবে। তবে, এব্যাপারে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির বর্তমান নেতৃবৃন্দ ও ইউএসএআইডির প্রতিনিধিবৃন্দ অতিসম্প্রতি আমার কাছে এসেছিলেন। তারা জানিয়েছেন, কেন্দ্রটি বর্তমানে যে অবস্থায় আছে তা চালু করতে হলে এখনো ৮টি কুলিং চেম্বার বসাতে হবে। তাতে প্রায় ১০কোটি টাকা ইনভেষ্টের প্রয়োজন। এ অবস্থায় ফ্লাওয়ার সোসাইটির প্রস্তাব সরকারী কোন প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে বিএডিসি বা কোন দপ্তর থেকে বিনিয়োগ করলে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক পর্যায়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় তারা বুঝেনিতে চাইছেনা। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানটি চালুর ব্যাপারে কয়েকদিন আগে ইউএসআইডি ও বিএডিসি’র প্রতিনিধিরা প্রকল্প ভিজিট শেষে আমার কাছে এসেছিলেন। শর্তদিয়ে জমি রেজিষ্ট্রির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ’সেটি ফ্লাওয়ার সোসাইটির সাবেক সভাপতি আব্দুর রহিমের সৃষ্টি আর কি; সেটি রহিম সাহেবের সৃষ্টি’। বর্তমানে যদি প্রতিষ্ঠানটি ফ্লাওয়ার সোসাইটি দ্বারা পরিচালিত না হয় তাহলে জমির ওই শর্তে কোন অসুবিধা হবে না বলে দাবি করেন। প্রতিষ্ঠানটি সরকার পরিচালনা করলে আমরা একটি কমিটি করে দিব। সেক্ষেত্রে জমিদাতা ৫জনকে ওই কমিটির সদস্য করলে তারা বেনিফিটেড হতে পারে বলেও জানান তিনি। এদিকে সরেজমিন পানিসারা এলাকার ফুলচাষিদের অনেকের সাথে এব্যাপারে কথা হয়। এই জনপদের ফুলচাষের জনক শের আলী সরদার, ফুলচাষি ইসমাইল হোসেন, সাবেক ইউপি সদস্য শাহাজাহান কবির, আজিজুর রহমান, মীর ফয়েজ আহম্মেদ, ইমামুল হোসেন, রাতুল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন কৃষক তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, কোল্ড স্টোরেজের অসম ও কারসাজিপূর্ণ দলিলের শর্তের খবর আমরা জানতে পেরে হতবাক ও বিস্মিত। আমরা কল্পনাও করতে পারেনি শর্তের বেড়াজালে কোন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানটির একক কতৃত্ব ও পূণারায় মালিকানা ফিরে পাওয়ার এমন নিন্দনীয় ঘটনার অবতারনা করতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here