যবিপ্রবি হলের কথিত টর্চার সেলে ৫ ঘন্টা আটকে নির্যাতন, দুই ছাত্র সাময়িক বহিষ্কার

0
164

স্টাফ রিপোর্টার : যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি (এনএফটি) বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ইসমাইল হোসেনকে ‘শারীরিকভাবে নির্যাতন ও হলে শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ দায়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শোয়েব আলী ও সালমান এম রহমানকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। একইসাথে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সোমবার বিকেলে যবিপ্রবির রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মোঃ আহসান হাবীবের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে দুপুরে যবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন এনএফটি বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ ইসমাইল হোসেন। ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনায় যবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন ইতিমধ্যে শহীদ মসিয়ূর রহমানের হলের প্রভোস্টকে অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং আক্রান্ত শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। শহীদ মসিয়ূর রহমান হল কর্তৃপক্ষও সহকারী প্রভোস্ট তরুন সেনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বডিকে একটি তদন্ত কমিটি করে আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার রাতেই শহীদ মসিয়ূর রহমান হল কর্তৃপক্ষ মোঃ ইসমাইল হোসেনকে শারীরিকভাবে নির্যাতন ও হলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শোয়েব আলী ও সালমান এম রহমানকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করে। উল্লেখ্য চাঁদার দাবিতে ছাত্রলীগের সভাপতির অনুসারীদের নির্যাতনের শিকার ছাত্র ইসমাইল হোসেনকে গুরুতর অবস্থায় রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ভর্তি করা হয়েছে। এর আগে রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মশিয়ুর রহমান হলের ৫২৮ নাম্বার কক্ষ থেকে অচেতন অবস্থায় ঔ শিক্ষার্থীর সহপাঠীরা তাকে উদ্ধার করে। ভুক্তভোগী ইসমাইল হোসেন ময়মনসিংহ জেলার বলারামপুর গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে ও যবিপ্রবির পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। অভিযুক্তরা হলো যবিপ্রবির কম্পিউটার ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের সালমান এম রহমান ও একই বিভাগের সদ্য বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী সোয়েব আলী। অভিযুক্তরা হলের ৫২৮ রুমের বাসিন্দা ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ শাখার সভাপতি সোহেল রানার অনুসারী হিসাবেই পরিচিত। প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী ইসমাইল যশোর শহরের পালবাড়ি ভাস্কর্য মোড়ে একটি ছাত্রবাসে থাকেন। বিভিন্ন সময়ে ইসমাইলের কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন কম্পিউটার ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সোয়েব আলী ও সালমান এম রহমান। ইসমাইল চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রোববার দুপুরে ডিপার্টমেন্টে ক্লাস চলাকালীন সময়ে সোয়েব ও সালমান তাকে ডেকে হলে নিয়ে যায়। এরপর দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত ইসমাইলকে বেঁধে রেখে রড, পাইপ আর বেল্ট দিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে। পরে সন্ধ্যায় সহপাঠীরা উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর রাতে অবস্থা অবনতি হলে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এপিপিটি বিভাগের মাস্টার্স শিক্ষার্থী আল জুবায়ের রনি জানান, ইসমাইল কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত না। রোববার দুপুরের পর থেকে ইসমাইলকে পাওয়া যাচ্ছিলো না। এমনকি তার ফোনও বন্ধ ছিলো। সে রোজা ছিলো, ইফতারের সময় ইসমাইলকে না পাওয়ায় অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়। ওর ক্লাসমেটরা জানায়, হলের সালমান আর সোয়েব ক্লাস চলাকালীন সময়ে ডেকে নিয়ে গেছে। তারপর আর খোঁজ নেই ইসমাইলের। পরে আমরা সবাই হলে যেয়ে দেখি ৫২৮ নাম্বার কক্ষে অসচেতন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এরপর তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ক্যাম্পাসে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং পরে অবস্থার অবনতি হওয়াতে যশোর হাসপাতালে ভর্তি করি। এদিকে যবিপ্রবি ক্যাম্পাসের একাধিক সূত্র বলছে, ৫২৮ নাম্বার কক্ষটি ৬ জনের থাকার ব্যবস্থা থাকলেও ছাত্রলীগকর্মী সোয়েব আর সালমান দুজনই থাকতেন। কক্ষটিকে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি গাঁজা সেবন ও ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা করার দায়ে সোয়েব বহিষ্কার হওয়ার পরেও ছাত্রলীগের প্রভাবে হলের নিয়মিত বাসিন্দা তিনি। এমনকি এর আগেও এই দুজনের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্রদের শিবির উপাধি দিয়ে চাঁদা দাবি করারও অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ শাখার সভাপতি সোহেল রানার অনুসারী। এই বিষয়ে সোহেল রানা বলেন, ব্যক্তির দায় কখনো সংগঠন নেবে না। চাঁদাবাজদের ছাত্রলীগ কখনো প্রশ্রয় দেয় না। আর ওরা ছাত্রলীগের পদধারি কেউ না। শহীদ মশিয়ুর রহমান হলের প্রভোস্ট ড. মো. আশরাফুজ্জামান জাহিদ বলেন, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর সহপাঠীরা উদ্ধার করে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। ভর্তি করার আগে তার মুখ দিয়ে নির্যাতনের বর্ণনা শুনেছি। ইসমাইলের ভাষ্য – চাঁদার দাবিতে তাকে আটকে রেখে সন্ধ্যা পর্যন্ত নির্যাতন চালানো হয়েছে। আমরা নির্যাতনের কক্ষটি সিলগালা করে দিয়েছি। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থী সালমান এম রহমানকে সাময়িক বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। আর এর আগেই বিশৃঙ্খলা ও গাঁজা সেবনের দায়ে বহিস্কার করা হয়েছিলো সোয়েব আলীকে। বহিস্কার হওয়ার পরেও কিভাবে হলে ছিলো এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সোয়েব মাঝে মধ্যে থাকতো। তারা ছাত্রলীগ করে কিনা এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি তিনি। এ ব্যাপারে যবিপ্রবি উপাচার্য (ভিসি) প্রফেসর ড. মো. আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কক্ষটি তালাবদ্ধ করে দিয়েছি। এমনকি সাথসাথেই তাদের সাময়িক বহিস্কার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশৃঙ্খলাকারীদের যবিপ্রবিতে স্থান নেই। এই ঘটনায় আমরা মর্মাহত। হাসপাতালে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর খোঁজ খবর নিয়েছি। এই ঘটনায় আরোও কারা জড়িত তা তদন্ত কমিটির মাধ্যমে উঠে আসবে। একই সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here