অনলাইনে ফুল বিক্রি করে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছে আল-আমিন

0
238

জসিম উদ্দিন : ২০২০ সালের শুরুতে দেশে ভয়াবহ আকারে চোখ রাঙানী দেয় মহামারী করোনা ভাইরাস। লকডাউনে স্থবির হয়ে পড়ে গোটা দেশ। স্থবির হয়ে পড়ে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ জীবন-জীবিকা। অনেকে কর্ম হারিয়ে পথে বসেছেন আবার অনেকে এমন বিরুপ পরিস্থিতিতে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। করোনা মহামারীর মধ্যে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন এমনই এক সফল উদ্যেক্তা যশোরের ঝিকরগাছার আল-আমিন (২০)। তিনি ফুলের রাজধানী খ্যাত ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীর নিকটস্থ শিমুলিয়া আন্দোলপোতা গ্রামের কৃষক আজিজুর রহমানের ছেলে।
দেশে করোনা মহামারী হানা দিলে বন্ধ হয়ে যায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ঘরে বসে অবসর সময় কাটাতে থাকেন আল-আমিন। শুধু বেকার সময় নয় সংসারে অভাবের তাড়নায় কাজ খুঁজতে থাকেন। তবে করোনার সময় কাজ তো দূরের কথা ঘর থেকে বের হওয়াই ছিল কষ্টসাধ্য। এমন সময় আল-আমিনের মাথায় আসে অনলাইনে বা ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে সারাদেশে ফুল বিক্রি করার আইডিয়া। এমন চিন্তা ভাবনা থেকে পরিকল্পনা করে লক্ষ্য অনুযায়ী পা বাড়ান আল-আমিন। আজ তিনি একজন সফল অনলাইন ফুল ব্যবসায়ী বা উদ্যেক্তা। শুধু যশোর নয় সারাদেশের ৬৪ জেলাতেই তার সরবরাহ করা ফুলের গুনগতমানের প্রশংসা ও পরিচয়ও রয়েছে।
উদ্যেক্তা আল-আমিন বলেন, ২০১৯ সালে মাধ্যমিকের গন্ডি পার করে কলেজে ভর্তি হই। ২০২০ সালের শুরুতে দেশে করোনা হানা দিলে বন্ধ হয়ে যায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠন, শুরু হয় লকডাউন। ছোটবেলা থেকে দেখেছি আমার মামারা সবাই ফুলের চাষ করেন। আমাদের এলাকায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফুল প্রেমী মানুষেরা গদখালীর ফুলের বাগান পরিদর্শনে আসেন। সারাদেশের মানুষেরা একনামেই চিনে থাকেন যশোরের গদখালী ফুল বাজার। প্রতিদিন ভোরবেলায় গদখালীতে ফুলের বাজার শুরু হয়। অনেক দূর-দূরান্তের জেলা থেকে ক্রেতারা এ বাজারে টাটকা ফুল কিনতে আসেন।
আল-আমিন আরও বলেন, লকডাউনে মানুষ ঘর থেকে বাহিরে যেতে পারতো না। ঐ সময় কোনো কাজ বা চাকরি করাও মানুষের জন্য ছিলো দুস্কর। তেমনি আমিও এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের হাল ধরার জন্য কোন আয়ের উৎস বা কাজ পাচ্ছিলাম না। ছোটবেলা থেকেই ইন্টারনেট ব্যবহারে পারদর্শী ছিলাম। স্বপ্ন ছিল নিজে কিছু করার। আমি বাড়িতে বসেই ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে অনলাইনে ফুলের ব্যবসা করতে পারি কিনা তা নিয়ে অনেক চিন্তা ভাবনা শুরু করি, শুরুতে ব্যবসায় নিয়ে সকলের নেগেটিভ কথা শুনে অনেক ভীতি এবং আশঙ্কার মধ্যে ছিলাম। কিভাবে শুরু করবো বা কিভাবে দেশের ৬৪ জেলার মানুষের কাছে ফুল পৌঁছে দেওয়া যায়। পরিবহন ব্যবস্থা সম্পর্কেও কোনো ধারণা ছিলো না আমার। অনেক মানুষের থেকে পরামর্শ নিয়েছি। সবাই বলেছে ফুল কাঁচা পোডাক্ট এটা অনলাইনে সারাদেশব্যাপী করা সম্ভব নয়, ফুল মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যাবে। আর মানুষের ফুল লাগলে নিকটস্থ ফুলের দোকানে যায় অনলাইনে কেউ ফুল খুঁজে না। আরো নানান কথা।তারপরেও মনোবল হারায়নি। আমার পরিবার বলেছিল শুরু করতে, আমিও দৃঢ় মনোবল নিয়ে শুরু করি। ফেসবুকে ফুল বাজার ডটকম নামের একটি পেজ এবং ইউটিউবে একটি চ্যানেল খুলি। ১০০ টাকার মেগাবাইট এবং ৫০০ টাকার ফুল দিয়েই ব্যবসা শুরু করি। দীর্ঘ পরিশ্রমের ফলে অনলাইনে সারাদেশব্যাপী আমার জেলার ঐতিহ্য গদখালীর ফুলের ব্যবসা দাড় করাতে পেরেছি।
আল-আমিন বলেন, আমি প্রতিদিনের ফুল প্রতিদিন বাগান থেকে গোলাপ ফুল, গাঁদা, ফুল, রজনীগন্ধা, জারবেরা, গ্লাডিওলাস , চন্দ্রমল্লিকা, বেলী , জিপসি, রথিষ্টিক ও লিলিয়াম ফুল সংগ্রহ করি। বর্তমানে আমার ফুল কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলাতে সরবরাহ করছি। ফুল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, বা পঁচে যাচ্ছে এমন কোন অভিযোগ আমি এখন পর্যন্ত পাইনি। প্রতিনিয়তই অর্ডার আসে, কখনো ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার আবার কখনো ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, এবছরের শুরুতে তিন দিবসকে ঘিরে এক দিনেই ৫০ হাজার টাকার ফুলের অর্ডার পেয়েছিলাম ঢাকা গাজিপুর থেকে এবং সফলভাবে ডেলিভারি দিতে পেরেছিলাম। বিশেষ করে ঢাকা, বরিশাল, কুষ্টিয়া, খুলনা, বাগেরহাট, মাগুরা, ফরিদপুর, দিনাজপুর থেকে প্রতিনিয়তই ফুলের অর্ডার আসে। ফুলের ব্যবসা থেকে এখন আমার মাসিক আয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। তিন বছরে প্রায় তিন লাখ টাকার ফুল বিক্রি করেছি। সংসার সামলিয়ে, নিজের পড়াশোনা সামলিয়ে আমি এখন অনেক ভালো আছি। আমার ভালো থাকার পেছনে সবটুকু অবদান আমার ক্রেতাদের। তারাও আমাকে প্রতিনিয়ত উৎসাহ দেন।
আল-আমিনের ফুলের একজন ক্রেতা ঢাকার সাতরাস্তার হাসিবুল ইসলাম বলেন, আল-আমিনের থেকে ফুল নিয়ে থাকি। কখনো কোন নষ্ট ফুল পাইনি। ফুল পাঠবার আগে সে আমাদের ছবি দেয়, আমরা ফুল হাতে পাই হুবহু ছবিতে যেমন দেখি তেমনি। প্রত্যেক বিক্রেতার উচিত ক্রেতার বিশ্বস্ততা অর্জন করে সৎ ভাবে ব্যবসা করার। তাহলে সফলতা নিশ্চিত।
বাংলাদেশ ফলোয়ার সোসাইটির সভাপতি ও গদখালীর ফুলচাষী নেতা আব্দুর রহিম বলেন, আল-আমিনকে আমি দীর্ঘদিন ধরে চিনি। সে প্রতিদিন সকালে গদখালির বাজারে এসে ফুল নিয়ে ছোটাছুটি করে। আমাদেরও কাছে খুব ভালো লাগে যে আমাদের যশোর জেলার ঐতিহ্য ফুলের রাজধানী গদখালীর ফুল সে অনলাইনের মাধ্যমে সারাদেশে বিক্রি করছে।
তিনি আরও বলেন, করোনার সময় ফুলের বাজারে ধ্বস্ নামে। এ সময় থেকেই সে বিপুল পরিমাণ ফুল অনলাইনে বিক্রি করা শুরু করে এবং নিজেও লাভবান হচ্ছে। আল-আমিনের দেখাদেখি অনেকেই অনলাইনে ফুলের ব্যবসা করার স্বপ্ন দেখছে।
শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান সর্দর বলেন, আল-আমিনকে আমি চিনি। ছেলেটা ফুলের ব্যবসা করে ঘুরে দাড়িয়েছে। নিজের পড়াশোনা খরচ নিজে চালায় এবং সংসারের খরচও চালায়। আমরা চাই ঘরে ঘরে এমন উদ্যেক্তা সৃষ্টি হোক। আমি তার আরও উচ্চ সফলতা কামনা করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here