রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত সাক্ষীরা/ যুদ্ধাপরাধ মামলায় যশোরের আমজাদ মোল্লাসহ চারজনের ফাঁসি

0
227

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর : একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে যশোরের বাঘারপাড়ার আমজাদ হোসেন মোল্লাসহ চার আসামিকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন আদালত। বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রোববার এ মামলার রায় ঘোষণা করে। দন্ডিত অন্যরা হলেন, ওহাব মোল্লা, মাহতাব বিশ্বাস ও ফছিয়ার রহমান মোল্লা। এদিকে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। একইসাথে তারা দ্রুত রায় কার্যকর করাসহ তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকার কথা প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি আমজাদ মোল্লার বাহিনী এখন আরো বেপরোয়া হয়ে তাদের ও তাদের পরিবারকে হুমকি ধামকি দিচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আইনজীবী সাহিদুর রহমান জানান, এটি ট্রাইব্যুনালের ৫২তম রায়। ট্রাইবুনালের অন্য দুই বিচারক হলেন বিচারপতি মো. আবু আহমেদ জমাদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলম। ১৬৯ পৃষ্ঠার রায়ের প্রথমাংশ পাঠ করেন বিচারপতি হাফিজুল আলম। দ্বিতীয়াংশ পাঠ করেন বিচারপতি আবু আহমেদ জমাদার। রায়ের মূল অংশ পাঠ করেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম। রায়ের পর্যবেণে বলা হয়, ওই সময়ে যারা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে, তারা মানবতার শত্রু। রায় ঘোষণাকালে এ মামলায় গ্রেপ্তার একমাত্র আসামি আমজাদ হোসেন মোল্লা আসামির কাঠগড়ায় ছিলেন। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী, মো. সাহিদুর রহমান, তাপস কান্তি বল, সাবিনা ইয়াসমিন খান মুন্নি ও রেজিয়া সুলতানা চমন উপস্থিত ছিলেন। আর আসামিপে ছিলেন অ্যাডভোকেট গাজী এমএইচ তামিম। আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ছয়জনকে হত্যা, আটক, নির্যাতনের প্রমাণ উঠে এসেছে। এ কারণে ট্রাইব্যুনাল চার আসামিকে ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছে। এর আগে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক সানাউল হক জানিয়েছিলেন, যশোর বাঘারপাড়া থানার প্রেমচারা গ্রামের আমজাদ হোসেন মোল্লা বাঘারপাড়া থানার রাজাকার কমান্ডার ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুসলিম লীগে যুক্ত ছিলেন আমজাদ। তবে কয়েক বছর আগে গ্রেপ্তার হওয়ার সময় তিনি আওয়ামী লীগে যুক্ত ছিলেন। প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়েছে, দন্ডিতদের মধ্যে কেবল আমজাদই গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। বাকি তিনজন পলাতক। এর আগে মামলায় আসামি ছিলেন পাঁচজন। তাদের মধ্যে নওশের আলী নামের একজন মারা গেছেন।
@ যুদ্ধাপরাধ: যশোরের ৫ আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল এ মামলার তদন্ত শুরু হয়, ২০১৮ সালের ১৬ এপ্রিল তা শেষ হয়। যশোর জেলা প্রশাসকের দেয়া রাজাকারদের তালিকাতেও আসামিদের নাম রয়েছে। চলতি বছরের ১১ মে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে যশোরের বাঘারপাড়ার মো. আমজাদ হোসেন মোল্লাসহ চার আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। এরপর রোববার এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। যে চার অভিযোগ প্রমাণিত হলো @
অভিযোগ-১: ১৯৭১ সালের ৩ ভাদ্র বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বাঘারপাড়া থানার উত্তর চাঁদপুর গ্রামের মো. ময়েনউদ্দিন ওরফে ময়নাকে তার বাড়ি থেকে আটক করে প্রেমচারা রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যায় আসামি মো. আমজাদ হোসেন মোল্লা ও তার সহযোগীরা। সেখানে তিনদিন আটক রেখে নির্যাতন করে ৬ ভাদ্র বেলা ১২টার দিকে খুদড়া গ্রামের বিজয় দাশের দেবদারু বাগানে কুয়ার পাশে দাঁড় করিয়ে আসামি মো. আমজাদ হোসেন মোল্লা গুলি করে হত্যা করে ময়নাকে।
@অভিযোগ-২: ১৯৭১ সালের ২০ জুলাই বেলা ১টার দিকে আসামি আমজাদ হোসেন মোল্লা ও তার সহযোগীরা বাঘারপাড়ার খাজুরা বাজার থেকে ডা. নওফেল উদ্দিন বিশ্বাসকে আটক করে প্রেমচারা রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরদিন বেলা ১২টায় থানা সদরের মহিরন গ্রামের মাঠে গুলি করে হত্যা করে।
@অভিযোগ-৩: আমজাদ হোসেন মোল্লা ও তার সহযোগীরা ১৯৭১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সকাল ৮-৯টার দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী সুরত আলী বিশ্বাস, মোক্তার বিশ্বাসকে তাদের বাড়ি থেকে ধরে প্রেমচারা রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে তিনদিন নির্যাতনের পর ২৩ সেপ্টেম্বর বেলা ১২টার দিকে খুদড়া গ্রামের বিজয় দাশের দেবদারু বাগানে কুয়ার পাশে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে লাশ কুয়ায় ফেলে দেয়।
@অভিযোগ-৪: মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের পার করে দেয়ার কারণে মাগুরার শালিখা থানার সীমাখালী বাজার ঘাটের মাঝি রজব আলী বিশ্বাসকে ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট আসামি আমজাদ হোসেন মোল্লা ও তার সহযোগীরা ধরে নিয়ে যায়। পরে প্রেমচারা গ্রামের চিনারাশি আম বাগানে নিয়ে রজব আলী বিশ্বাসকে গলা কেটে হত্যা করে।
@রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত সাক্ষীরা
এদিকে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। একইসাথে তারা দ্রুত রায় কার্যকর করাসহ তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকার কথা প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি আমজাদ মোল্লার বাহিনী এখন আরো বেপরোয়া হয়ে তাদের ও তাদের পরিবারকে হুমকি ধামকি দিচ্ছে। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রজব আলী বিশ্বাসের পুত্র খলিলুর রহমান ওরফে খোকন বিশ্বাস বলেন, এতবছর পর পিতা হত্যার বিচার পেয়ে আমি খুশি। যাদের নিরলস পরিশ্রমে আজকের এ রায় তাদের জন্য দোয়া করি আল্লার দরবারে। তিনি আরো বলেন, মামলা করার পর থেকে বারবার আমজাদ মোল্লার বাহিনীর হামলা মামলার শিকার হয়েছি। দিনের পর দিন পালিয়ে থেকেছি। বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। আজ আমজাদ মোল্লার ফাঁসির রায় হয়েছে এখন আমরা আরো ভয়ে আছি কখন আবার হামলা করে রাজাকারের বাহিনী। আমজাদ মোল্লার হাতে নিহত ডা. নওফেল উদ্দিন বিশ্বাসের পুত্র ডা. এবিএম রুহুল আমিন রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে ও আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে বলেন, আজ তো রায় হলো। এ রায়ের ফলে আমরা এতদিন পিতা হারানোর যে যন্ত্রণা নিয়ে কেঁদে ফিরেছি তার সমাপ্তি হলেও এখনও নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শংকায় আছি। মামলার পর থেকেই রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা হামলা-মামলা করে চলেছে আমাদের উপর। বারবার প্রশাসনের কাছে ধর্ণা দিয়েও নিজেদের নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করতে পারিনি। এখন যদি দ্রুত রায় কার্যকর না হয় তাহলে আবারো হামলা-মামলার শিকার হতে হবে। রাজাকার আমজাদ মোল্লা ও তার সহযোগিদের হাতে নিহত উত্তর চাঁদপুর গ্রামের মো. ময়েনউদ্দিন ওরফে ময়নার বড় ভাই মামলার অন্যতম সাক্ষী আলাউদ্দীন আলী বলেন, আল্লাহর হাজার শোকর যে আমরা এতদিন যে দাবি করে এসেছি তা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। আমজাদ মোল্লাসহ তার বাহিনীর সদস্যদের ফাঁসির রায় দিয়েছেন আদালত। আমরা এই রায়ে যারপরনাই খুশি। কিন্তু একই সাথে এই ভয়ে আছি মামলার পর থেকে যেভাবে হামলা-মামলার শিকার হয়ে আসছি তারই ধারাবাহিকতা আজো চলছে। এখনো হুমকি ধামকি দিচ্ছে রাজাকার বাহিনী। প্রশাসন যেন আমাদের পরিবারের নিরাপত্তায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তা না হলে হয়তো ভাই হত্যার বিচার কার্যকর হওয়ার আগেই রাজাকার বাহিনীর হাতে নিজেরও প্রাণ হারাতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here