এলজিইডি অফিস ঘুষের হাট নামে খ্যাত মনিরামপুর মহাসড়কে কনক্রিটের সড়ক নির্মানের ১০ মাসের মাথায় ফাটল, উপজেলার সকল নির্মনকৃর্ত রাস্তাগুলো বেহাল অবস্থা  দুদক তদন্ত করে সত্যতা মিলেছে

0
275
মোন্তাজ আলী, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি: সরকারী মাল দরিয়ায় ডাল এমন ঘটনা ঘটেছে মণিরামপুর উপজেলার নবনির্মানকৃত বিভিন্ন রাস্তগুলো। বছর ঘুরতে না ঘুরতে রাজারহাট-চুকনগর মহাসড়কের মনিরামপুর পৌরশহরে কনক্রিটের (রড-সিমেন্ট)সহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক নির্মান করা রাস্তগুলো  যানবাহনের চাপে সড়ক ভেঙ্গে চুরমার হয়ে বৃষ্টিতে বড় বড় গর্তে পরিনত হয়েছে। দু’পাশে পরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মান না করা, নিম্নমানের সামগ্রি দিয়ে নির্মানকাজ তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করা হয়েছে। রাস্তা দিয়ে ছোট বড় যানবহন চলাচলের ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। কনক্রিটের রাস্তার বড় বড় গর্ত গুলো রাতের আধাঁরে পিঁচ-খোয়া দিয়ে ঠিকাদাররা ভরাট করছে আবার বৃষ্টির পানিতে উঠে যাচ্ছে। অন্যদিকে উপজেলা এলজিইডি অফিস যেন ঘুষের হাট নামে খ্যাত হয়েছে। ঘুষ দিলেই ঠিকাদারী কাজ শেষ না করেও বিল উত্তোলন করা যায় বলে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুদক। অপরদিকে নিন্মমানের ইট-খোয়া ও বালি দিয়ে প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীন সড়ক নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ ব্যাপক অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘুষ দিলেই অনিয়ম নিয়ম আর না দিলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে নিয়মের বেড়াজালে ফেলে নাজেহাল করারও অভিযোগ রয়েছে। এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে সম্পূর্ন নিরব বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাযায়, রাজারহাট থেকে মনিরামপুর হয়ে চুকনগর পর্যন্ত প্রায় ৩৮ কি:মি: মহাসড়কটি প্রসস্তকরনের জন্য ২০২০-২০২১ অর্থবছরে সরকার প্রায় সাড়ে তিন’শ কোটি টাকা বরাদ্দ করে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধিনে মহাসড়কটি প্রসস্তকরনের জন্য চারজন ঠিকাদার নিযুক্ত করা হয়। কার্যাদেশ পাবার পর কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে গতবছর ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়। মনিরামপুর হাজরাকাটি থেকে চিনোটোলা পর্যন্ত কাজটি সম্পাদন করেন মেসার্স কপোতাক্ষ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। তবে অভিযোগ উঠেছে নিম্নমানের সামগ্রি দিয়ে সম্পন্নের মাত্র ১০ মাসের মাথার সড়কের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। তার ওপর মনিরামপুর পৌরশহরে ৭৮০ মিটার দৈর্র্ঘ্যরে সড়কটি প্রসস্তকরন করা হয়েছে কনক্রিটের(রড-সিমেন্ট)। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে সড়কের দু’পাশে পরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মান না করা, নিম্নমানের সামগ্রি দিয়ে তড়ি ঘড়ি করে নির্মানকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। অন্যদিকে যানবাহনের চাপে সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে বড় বড় গর্তে পরিনত হয়েছে। বিশেষ করে পূরবী সিনেমা হলের সামনে, থানা মোড়, ফলবাজার, কালিমন্দির, প্রেসক্লাবের সামনে, কুলটিয়া মোড়ের অবস্থা খুবই নাজুক। মহাসড়কে কুয়াদা বেগারিয়াতলা মধ্যে রাস্তা পিঁচ উঠে বড় বড় গর্ত পরিনত হয়েছে তা আবার পুটিন করে যাচ্ছে বার বার। অন্যদিকে উপজেলার এলজিইডি অফিস যেন ঘুষের হাট নামে খ্যাত হয়েছে। ঘুষ দিলেই ঠিকাদারী কাজ শেষ না করেও বিল উত্তোলন করা যায় বলে অভিযোগে প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুদক। উপজেলার মাহাতাবনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ নির্মাণে ৭৯ লাখ ৪৩ হাজার ৬১৪ টাকা চুক্তি ও ৮৩ লাখ ৬১ হাজার ৬৯৯ টাকা প্রাক্কলন মূল্যে জিসান বিল্ডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। যার নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার দিন ধার্য্য ছিল ২০২২ সালের ১৯ মে। অভিযোগ রয়েছে উপজেলা প্রকৌশলী বিদ্যুৎ কুমার দাস সময় বৃদ্ধি না করেই একই সালের ২২ জুন ওই নির্মাণ কাজের ভিত্তি ঢালাইয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জিসান বিল্ডার্সকে পত্র দেয়। ওই মাসে নির্মাণ কাজের অগ্রগতি ছিল মাত্র ১৫%। কিন্তু রহস্যজনক কারনে ভিত্তি ঢালাইয়ের ৪ দিন পর ওই নির্মাণ কাজের ৯০% বিল প্রদান করা হয়। অবাক ব্যাপার হচ্ছে ৯০% বিল প্রদানের ১৫ মাস অতিবাহিত হলেও আজও মাহাতাবনগর স্কুলের নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। বিলের বিপরীতে প্রকৌশল অফিস ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ৩৭ লাখ টাকা বিডি করে। কিন্তু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কাজের শুরুতেই প্রকৌশলীর সহযোগীতায় বিডির টাকা উত্তোলন করে নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় হতে ৯ টি প্যাকেজ কাজের দরপত্র আহবান করা হয়। যার ই-টেন্ডার নোটিশ: ০১/১৮-১৯। টেন্ডারে মের্সাস পারিজাত এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স হীরা কনস্ট্রাকশন যৌথভাবে অংশ নেয়। যার রেজি: নং-১৪৬৩ এবং তারিখ ১৮-০৫-২০১৯ ইং। যৌথ উদ্যোগের স্ট্যাম্পের কল নম্বর-২৬৮২৩১৮,২৬৮২৩১৯ ও ২৬৮২৩২০। এই দরপত্র বিজ্ঞপ্তির প্রায় তিন বছর পর উপজেলা খালবাটবিলা ও দূর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণে ২০২২ সালের ৩১ মে উপজেলা প্রকৌশলী র্কাযালয় হতে ০১টি প্যাকেজ কাজের দরপত্র আহবান করা হয়। এ নির্মাণ কাজের প্রাক্কলন মূল্য ১ কোটি ৫৯ লাখ ৯৪ হাজার ৭০৮ টাকা ও চুক্তি মূল্য ১ কোটি ৪৫ লাখ ২৪ হাজার ৩৯১ টাকা। যার ই-টেন্ডার নোটিশ: ০৭/২১-২২ এবং প্যাকেজ নম্বর-ডব্লিউ ১.০৩৮৯১ (আইডি নম্বর.৭০৫৬২৮)। টেন্ডারে মেসার্স পারিজাত এন্টারপ্রাইজ ও হীরা কনস্ট্রাকশন নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে টেন্ডারে অংশ নেয়। কিন্তু যৌথ উদ্যোগের এই স্ট্যাম্পটি নকল। যা ২০১৯ সালের ২৫ মে ই-দরপত্র বিজ্ঞপ্তির নম্বর-০১/১৮-১৯ এর বিপরীতে করা যৌথ উদ্যোগের স্ট্যাম্প। এটি স্ক্যানার মেশিনে স্ক্যান করে নতুনভাবে প্রিন্ট দিয়ে ই-দরপত্র বিজ্ঞপ্তি: ০৭/২১-২২-এ দাখিল করে। যার রেজি:নম্বর-১৪৬৩ এবং তারিখ-১৮-০৫-২০১৯ ইং। অভিযোগ রয়েছে উপজেলা প্রকৌশলী দুই লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে নকল কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও এই যৌথ উদ্যোগের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়। এ ব্যাপারে মেসার্স পারিজাত এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাটর উত্তম মিত্র বলেন, তার ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ২০১৯ সালের পর মেসার্স হীরা কনস্ট্রাকশন নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ উদ্যোগে আর কোন কাজে অংশ নেয়নি।
জেলার অন্যান্য উপজেলায় উন্নয়ন তহবিল ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) প্রকল্পের কাজ এলটিএম-এ (লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড) দরপত্র আহবান করা হলেও উপজেলা প্রকৌশলী এনওটিএম-এ (ন্যাশনাল ওপেন টেন্ডারিং মেথড) দরপত্র আহবান করেছেন। এতে কাজের মান খারাপ হয়েছে বলে অভিযোগ। এসব সুনির্দ্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা সমন্বিত দুদুক (দুর্নীতি দমন কমিশন) গত ২৪ সেপ্টেম্বর উপজেলা প্রকৌশল অফিসে অভিযান পরিচালনা করেন। এ ব্যাপারে জেলা সমন্বিত দুদক’র উপ-পরিচালক মোঃ আল-আমিন বলেন, অভিযানে প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। এদিকে মনিরামপুর উপজেলা উন্নয়ন প্রকল্প (জেএমপি), গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন প্রকল্প (ভিআরআরপি) ও বৃহত্তর খুলনা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (কেডিআরআইপি) -এর আওতায় প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মেসার্স বনান্তর নামের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে রাস্তা নির্মাণের কাজ করছে। জেএমপি-এর অধীন ৩ কোটি ১০ লাখ ২২ হাজার ৮৪০ টাকা ব্যয়ে উপজেলার গালদা মানিকতলা-দিঘিরপাড় বাজার রোড (২ হাজার ৮২ মিটার) ও পাড়ালা সাতগাতী-পাড়ালা রাস্তা নির্মাণ (৯৬০ মিটার) এবং একই প্রল্পের অধীন ২ কোটি ৩৫ লাখ ৮৪ হাজার ১৮০ টাকা ব্যয়ে মথুরাপুর মোল্লাপাড়া-মথুরাপুর রাস্তা (১৪৭৫ মিটার) ও পানিচ্ছত্র রাইস মিল-ঘিবা প্রাইমারী স্কুল রাস্তা নির্মাণ (৯৪০ মিটার), ভিআরআরপি-এর আওতায় ৮০ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৮ টাকা ব্যয়ে কাশিমপুর- বটতলা-রোহিতা ইউপি রাস্তা ও পলাশী রাজবাড়ী-এড়েন্দা রাস্তা এবং কেডিআরআইপি-আওতায় ১ কোটি ৬৮ লাখ ২ হাজার ৬০ টাকা ব্যয়ে খেদাপাড়া ইউপি কাশিপুর মান্দারতলা রাস্তা (২৩৯০ মিটার) নির্মাণ কাজ চলছে। এসব রাস্তা নির্মাণে নিন্মমানের ইটের খোয়া ও বালি ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। এসব ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার আবু সাঈদ বলেন, কোন ধরনের নিন্মমানের ইট-বালি ব্যবহার করা হয়নি।
এসব অনিয়ম-দুর্নীতি বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী বিদ্যুৎ কুমার দাস দুদক’র অভিযানের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, কোন ধরনের অনিয়ম হয়নি। আর একটা কাগজের জন্য ঠিকাদারকে বঞ্চিত করা যায় না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে মাহাতাবনগরের স্কুলের কাজ ১০/১২ দিনের মধ্যে শেষ হবে।
জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, দুদক’র অভিযানসহ সার্বিক বিষয় উপজেলা প্রকৌশলী ভাল বলতে পারবেন। তিনি এ ব্যাপারে আর মন্তব্য করতে চাননি।
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স কপোতাক্ষ এন্টারপ্রাইজের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মাসুদ রানা জানান, কনক্রিটে একটু সমস্যা থাকায় সড়কের কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। তবে এটা মেরামত করে দেওয়া হবে। অন্যদিকে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া জানান, যেহেতু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের জামানতের বিল এখনও পরিশোধ করা হয়নি। সেহেতু নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সঠিকভাকে মেরামত করে দিতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বাধ্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here