রানা আহম্মেদ অভি, ঝিনাইদহ : দুই বছর ধরে ঝিনাইদহের ছয়টি উপজেলাতে ক্লিনিক ও ডায়াগনেস্টিক সেন্টারগুলোর লাইসেন্স নবায়ন নেই। ডাক্তার-নার্স ছাড়াই চলছে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রমরমা বানিজ্য। অনেক ক্লিনিক লাইসেন্স ছাড়াই মাসের পর মাস ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এটাই যেন জেলার ক্লিনিক ও প্যাথলজি ব্যবসা পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা পর্যায়ের ক্লিনিকগুলোতে অহরহ অপচিকিৎসা চলছে। ডাক্তারের অবহেলায় প্রসূতির মৃত্যু ঘটছে বারবার।ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসার উন্নত পরিবেশ নেই।নেই সবসময় চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত নার্স। ১০ বেডের পরিবর্তে শয্যা বাড়িয়ে ৫০ থেকে ৬০ জন করে রোগী ভর্তি করা হয়। ছয়টি উপজেলার প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক চলে ডাক্তার নার্স বিহীন অবস্থায়। যেখানে একটি প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক চালাতে হলে সর্বক্ষণ ১জন এমবিবিএস ডাক্তার ও একজন ডিপ্লোমা নার্স থাকতে হবে। সেখানে উপজেলার ক্লিনিক গুলোর দুই একটিতে নার্স থাকলেও কোন ক্লিনিকে ডাক্তার নেই। এসব ক্লিনিকে ঘটছে অশুভ ঘটনা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নীতিমালা ভঙ্গ করার পরও এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনেস্টিক সেন্টার নতুন লাইসেন্স পাচ্ছে।পুরানো লাইসেন্স নবায়ন করছে। এ নিয়ে ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন ডাঃ শুভ্রা রাণী একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।তবে সেখানেও শুভঙ্করের ফাঁকি! ফলাফল এখনো দৃশ্যমান হয়নি। তবে ডাক্তারের বিরুদ্ধে ডাক্তার নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি কতটুকু শাস্তি নিশ্চিত করবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন অফিস থেকে তথ্য নিয়ে জানা গেছে, ঝিনাইদহের ৬ উপজেলায় মোট ক্লিনিক ও ডায়াগনেস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১৭০টি।এর মধ্যে ক্লিনিক রয়েছে ৮১টি। ওই সূত্রমতে, কোটচাঁদপুর উপজেলার একটি ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন আছে। বাকী ১৬৯টি ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন নেই। এছাড়া ৮৯টি ডায়াগনেস্টিক সেন্টারের কোনটার লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি।সবগুলোর লাইসেন্স নবায়ন পক্রিয়াধীন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গোপন সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন অফিসের নওশের আলী, নজরুল ইসলাম, ইসরাইল হোসেন ও নজরুল ইসলাম (২) ক্লিনিকের এই ফাইলগুলো দেখভাল করেন। অভিযোগ উঠেছে অর্থের বিনিময়ে তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে চিকিৎসার জন্য অনুপযুক্ত এ সব ক্লিনিকের কাগজপত্র ঠিক করে বহাল রাখার পক্ষে রিপোর্ট দেন। ক্লিনিকের ফাইল করলে ভাল উপার্জন হয় বলেও সিভিল সার্জন অফিসে কথিত আছে।
জানা গেছে, প্রাথমিক ভাবে একটি ক্লিনিকের অনুমোদন পেতে হলে লাইসেন্স থাকতে হবে।একজন সর্বক্ষনিক এমবি বিএস ডাক্তার ও ডিপ্লোমা নার্স, আয়া ,হাইডোলিক ডেবিল, ওটি লাইট, অক্সিসিজেন সিলিন্ডার, ছাগার মেশিন ও এনেস্থিয়া মেশিন, ডাক্তার থাকলে ১০ বেডের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু জেলার ছয়টি উপজেলার বেশির ভাগ ক্লিনিকে এগুলো না থাকলেও বহাল তবিয়তে চলে ক্লিনিক গুলো।সিভিল সার্জন কোন ক্ষমতাবলে ডাক্তার নার্স না থাকলেও তাদেরকে ক্লিনিক চালাতে সহযোগিতা করে এই নিয়ে জেলাবাসীর মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন সদর উপজেলার ডাকবাংলা, বৈডাঙ্গা, সাধুহাটী, বারোবাজার, কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর, শৈলকুপা,লাঙ্গলবান্দ বাজার, হরিণাকুন্ডু, মহেশপুরের নেপারমোড় ও খালিশপুরের ক্লিনিকগুলোতে সর্বক্ষন ডাক্তার থাকে না।ক্লিনিক মালিক, ছেলে, স্ত্রী ও মেয়েরাই স্বপরিবারে কোন কোন ক্লিনিকের স্টার্ফ সেজে কারবার চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অপারেশন থিয়েটার ও রোগীর শয্যা রুমে নোংরা পরিবেশ বিরাজ করে। নেই দক্ষ নার্স।
সরেজমিনে গিয়ে শৈলকুপা উপজেলার হাট ফাজিলপুর বাজারে লালন শাহ ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার দেখা মেলে নানা অনিয়ম।হাসপাতালে নেই কোন নার্স মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং নেই কোন ডাক্তার। নামে মাত্র একজন রিসিপশন ও আয়া দিয়ে চলছে রমরমা ব্যবসা।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা মেলে কোন রোগী নাই। রোগীর বেডে শুয়ে এক দম্পতি। তাদের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন আমরা স্বামী স্ত্রী। সনিয়া ও পারভেজ স্বামী স্ত্রীর পরিচয়ে হাসপাতালের বেডে রাত্রি যাপন করছেন।
এবিষয়ে হাসপাতালের মালিক মোঃ সাগর আহম্মেদ বলেন, ‘পারভেজ আমার আপন ভাগ্নে ওকে আমি আমার চায়ের দোকানের দায়িত্ব দিয়েছি।আর ভাগ্নে বউ সোনিয়াকে দ্বায়িত্ব দিয়েছি হাসপাতালের রিসিপশনের।সেই সূত্রে তারা আমার হাসপাতালের কক্ষে এক মাস যাবৎ রাত্রি যাপন করছে।’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,সাগর আহম্মেদ হাসপাতালে আড়ালে কি করছেন তা আমাদের সঠিক জানা নাই তবে এক নবদম্পতি দেখেছি দীর্ঘদিন ধরে রাত্রি যাপন করতে। সাগর সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীরা বলেন, ‘আমাদের জানামতে তিনি হাসপাতালের ব্যবসা ছাড়াও বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানো কাজ করেন ও ফার্মেসির ব্যবসাসহ একটি চায়ের দোকানও রয়েছে তার।’ স্থানীয়রা বলেন ‘পারভেজ সগরের আপন ভাগ্নে না। পারভেজের মাধ্যমে বিদেশে মানুষ পাঠানোর কাজ করেন সাগর।তার মূল ব্যবসা ক্লিনিকের আড়ালে আদম ব্যবসা।’ ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন ডাঃ শুভ্রা রাণী জানান, ‘জেলার কোন ক্লিনিকের এখন লাইসেন্স নেই। সবগুলো নবায়নের জন্য অপেক্ষমাণ। তিনি বলেন, এখন অনলাইনে সরাসরি আবেদন নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা থেকে যে সব ক্লিনিকের রিপোর্ট চাওয়া হচ্ছে আমরা সেগুলো প্রেরণ করছি।মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক ক্লিনিক বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’















