যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের অপসারনের দাবিতে আন্দোলন তীব্র হচ্ছে

0
301

নূর ইসলাম, যশোর থেকে : বহাল তবিয়তে চেয়ারে বসে আছেন যশোর শিক্ষা
বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মর্জিনা আক্তার। মহাদূর্নীতিবাজ ও মতলববাজ এই
চেয়ারম্যান ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন
বলে অভিযোগ কর্মকর্তা, কর্মচারী ও বোর্ড সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-
জনতা এবং দীর্ঘদিন ধরে নানা লাঞ্চনা বঞ্চনার শিকার বোর্ডের কর্মকর্তা-
কর্মচারী ও স্কুল কলেজের শিক্ষকরা অবিলম্বে এই অযোগ্য,দলবাজ চেয়ারম্যানকে
অপসারন করে একজন যোগ্য সৎ ও সুশিক্ষিত ব্যক্তিকে ঐতিহ্যবাহী যশোর শিক্ষা
বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
জাহাঙ্গীর নগর বিশ^বিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের নেতা
অধ্যাপক মর্জিনা আক্তার গত ৩০ মে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক
শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান পদে প্রেষনে নিযুক্ত হন। তার এই নিযুক্তিকে যশোর -৩
সদর আসনের এমপি কাজী নাবিল আহমেদ বিশেষ ভূমিকা পালন করেন বলে
জনশ্রুতি রয়েছে। দেশব্যাপী বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনও
মর্জিনা আক্তার তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে এই আন্দোলনকে বানচাল করার
জন্য নানা রকম উসকানীমূলক প্রচার প্রচারনা করতেন। ৫ আগষ্ট সরকারের পতন হলে
তিনি তাৎক্ষনিক গা ঢাকা দেন। এর পর যশোরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা
স্বাভাবিক হলে তিনি স্বপদে বহাল তবিয়তে অফিস করছেন। যা নিয়ে বোর্ডের
লাঞ্চিত বঞ্চিত কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ইতিমধ্যে
এসব কর্মকর্তা কর্মচারীরা চেয়ারম্যানের পদ থেকে মর্জিনা আক্তারকে অবিলম্বে
অপসারনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রনালয় সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন।
বোর্ড সংশ্লিষ্ট স্কুল ও কলেজ শিক্ষকবৃন্দ বলেন, সদ্য ক্ষমতাচ্যূত আওয়ামী লীগ
সরকারের আমলের দাপটশালী এ শিক্ষক নেতা অধ্যাপক মর্জিনা আক্তার যশোর সরকারি
মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ছিলেন। এরপর ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর
রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে সম্পূর্ণ বেআইনী ভাবে সিনিয়রদের সুপারসিড করে
তিনি যশোর সরকারি এমএম বিশ^বিদ্যালয় কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ
বাগিয়ে নেন। এরই মাঝে ২০২২ সালে এমএম কলেজের অধ্যক্ষ পদটি শুণ্য হলে মাত্র ৩
মাসের ব্যবধানে ওই বছরের ৮ মার্চ তিনি বিশেষ সম্পর্কের খ্যাতিরে এমপি কাজী
নাবিল আহমেদকে কাজে লাগিয়ে একই কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ আদায়
করে নেন। যা নিয়ে সে সময় যশোর সমরকারী এম এম কলেজের সাধারণ শিক্ষক
কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কলেজের শিক্ষক সমিতির
নেতৃবৃন্দ এই অবৈধ ও বেআইনী নিয়োগ প্রয়োগক্রিয়ার বিরোধীতা করায়
তাদের ওপর মর্জিনা আক্তার ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিয়ে শিক্ষক কর্মচারীদের বেধরক
মারপিট করান। এরপর চলতি বছরের ৩০ মে তিনি ফের কাজী নাবিল আহমেদ এর সঙ্গেবিশেষ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে যশোর শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে
নিয়োগ আদায় করে নেন শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে। শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ
বলছেন, গত ৩ বছরে মর্জিনা আক্তার রাজনৈতিক প্রভাব ও এমপি কাজী নাবিল
আহমেদকে ব্যবহার করে যে ভাবে প্রমোশন ও পদায়ন আদায় করেছেন তা দেশের
বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাসে বিরল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন
শিক্ষক বলেন, মর্জিনা আক্তার এম এম কলেজের উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন কালে
প্রতিষ্ঠানের কোটি টাকার দূর্নতি করেছেন। তিনি হিসাব শাখার কর্মচারী
কর্মকর্তাদের বদলী, সাসপেন্ডসহ নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে ভূয়া বিল ভাউচারের
মাধ্যমে প্রতি মাসে ৩/৪ লাখ টাকার বিল উত্তোলন করে নিয়েছেন। এছাড়া ছাত্র
কল্যান তহবিল, কলেজ উন্নয়ন তহবিল, লাইব্রেরী উন্নয়ন তহবিল, কেন্দ্রীয় ছাত্র
সংসদ তহবিল, কর্মচারী কল্যান তহবিলসহ কলেজের নানা রকম উন্নয়নের ফিরিস্থি
দিয়ে তিনি কোটি কোটি টাকার দূর্নীতি করেছেন। স্থানীয় এমপি কাজী
নাবিল আহমেদের সাথে বিশেষ সুসম্পর্ক থাকায় এবং ছাত্রলীগের ক্যাডারদের
নিজস্ব ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করার কারনে সে সময় ভয়ে কেউ মুখ খুলতে
সাহস পাননি। এছাড়া তিনি দীর্ঘ দিন কলেজের উপাধ্যক্ষ বা অধ্যক্ষের জন্য
নির্ধারিত সরকারী বাসভবনে বসবাস করলেও তিনি তার বেতন থেকে বাসাভাড়ার
অংশ কর্তক করেননি।
যশোর সরকারী এমএম কলেজের তৎকালীন সময়ে কর্মরত একাশিক শিক্ষক জানান,
সরকারি এমএম কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে তিনি কলেজে একচ্ছত্র
আধিপত্য বিস্তার করে। বিশেষ করে সে সময়ের সরকার দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের
নেতাকর্মীদের উস্কানি দিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে বিএনপিসহ ভিন্ন মতালম্বী
শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের কর্মী সমর্থকদের ওপর ষ্টিম
রোলার চালান। তিনি ঘোষনা দেন, কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কোন ছাত্র
সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। এমনকি এসব ছাত্রসংগঠনের
নেতাকর্মীদের তিনি ক্যাম্পাসে অবাঞ্চিত ঘোষনা করেন। এসময়ে বহিরাগত
সন্ত্রাসীদের হাতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কয়েক দফা হামলা-
নির্যাতনের শিকার হলেও কলেজ অধ্যক্ষের কাছে বিচার চেয়ে তারা কোনো বিচার
পাননি।
এ বিষয়ে যশোর সরকারি এমএম কলেজ ছাত্রদলের আহবায়ক শেখ হাসান ইমাম বলেন,
অধ্যাপক মর্জিনা আক্তার এমএম কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে
তিনি ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মতো আচরণ করতেন। তার আমলে কলেজে ছাত্রদলের
নেতাকর্মীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। প্রকাশ্যে বহিরাগত
সন্তাসীরা আমাদের ওপর কয়েক দফা হামলা করলেও তিনি কোনো প্রতিকার নেননি।
এমনকি তার আমলে আমরা কলেজে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের
শাহাদাতবার্ষিকীও পালন করতে পারেনি। শিক্ষকদের সামনে ছাত্রলীগরা আমাদের ওপর
বর্বর হামলা করলেও দলবাজ এই অধ্যক্ষ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এদিকে গণঅভূত্থানের পর শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের শিক্ষক
পরিষদের নেতা মর্জিনা আক্তারের যশোর শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানের মতো
গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে থাকা নিয়ে গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতার পাশাপাশি
শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিশেষকরে বিগত ১৬ বছরে যারা বোর্ডে অবহেলিত, উপেক্ষিত ছিলো এমন সব
কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার অপসারণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন।
বোর্ডের কর্মচারীদের একটি পক্ষের দাবি মর্জিনা আক্তার বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের
একজন সক্রিয় নেতা। শেখ হাসিনার পতনের পর তার মতো আওয়ামীবাজ একজন
বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন।
এজন্য তারা তার পদত্যাগের দাবি জানান। যদি মর্জিনা আক্তার স্বেচ্ছায়
চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ না করেন তবে ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে তার
বিরুদ্ধে দূর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষনা দেন বোর্ডের কর্মচারী
ইউনিয়নের নেতা পান্না।
এ বিষয়ে শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মর্জিনা আক্তারের সাথে
যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, “আমি তো বোর্ডেই অফিস করছ্ধিসঢ়; তার
পদত্যাগের বিষয়ে তিনি বলেন, না এ্িধসঢ়; পদ তেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার প্রশ্নই
আসে না। যেহেতু সরকার আমাকে এই পদে বসিয়েছেন, তাই সরকারই সিদ্ধান্ত
নেবেন আমি এই চেয়ারে থাকবো কি থাকবো না। শিক্ষক কর্মচারী-
কর্মকতৃাদের আন্দোলন সম্পর্কে তিনি বলেন, আন্দোলন করার অধিকার সবারই
আছে। আন্দোলনকারীদের দাবি যৌক্তিক কিনা সেটাই বিবেচ্য।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here